ভারী বর্ষণের সাথে জোয়ারের পানি, নগরে আবারও জলাবদ্ধতা

আজাদী প্রতিবেদন | মঙ্গলবার , ১৮ আগস্ট, ২০২৬ at ৯:২৫ পূর্বাহ্ণ

অতি ভারী বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে আবারও জলাবদ্ধতা হয়েছে নগরে। গতকাল সোমবার সকাল থেকেই জলমগ্ন হয়ে পড়ে শহরের নিম্নাঞ্চল। হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যায় বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলি। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন পথচারীরা। বিশেষ করে সকালে কর্মস্থলে যাওয়া লোকজন, স্কুলকলেজের শিক্ষার্থী ও জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষের দুর্ভোগ ছিল সীমাহীন।

পানি ঢুকে যায় নিচু এলাকার বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে। রেয়াজুদ্দিন বাজারের কয়েকটি মার্কেটের দোকানে পানি ঢুকে কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। পানি ঢুকে মালামাল নষ্ট হয়েছে চকবাজার চক সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ীদেরও। অক্সিজেন সংলগ্ন এলাকায় ডুবে যায় রেললাইন। এতে ষোলশহরে আটকে যায় বিশ্ববিদ্যালয়গামী দুটি শাটল ট্রেন। সবমিলিয়ে এক মাসের ব্যবধানে আবার জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ পোহাতে হয় নগরবাসীকে।অতি ভারী বর্ষণের সঙ্গে জোয়ারের প্রভাব : উত্তরপশ্চিম বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ এবং মৌসুমি বায়ুর প্রবল সক্রিয়তার কারণেই আকস্মিক অতি ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে নগরে। গত রোববার দিবাগত রাত থেকেই শুরু হয় বৃষ্টি। রাতভর থেমে থেমে বৃষ্টি হলেও ভোররাতে একটানা বৃষ্টি হয়েছে।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস গতকাল সোমবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৬ ঘণ্টায় নগরে ১৩৭ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস। এছাড়া বিকেল ৩টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১৯৭ দশমিক ২ মিলিমিটার ও সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড হয় ১৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত। ২৪ ঘণ্টায় ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলে সেটাকে অতি ভারী বর্ষণ বলা হয়। ওই হিসেবে গতকাল অতি ভারী বৃষ্টি হয়েছে নগরে।

এদিকে বৃষ্টির পাশাপাশি জোয়ার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। গতকাল সকাল ১০টা ৬ মিনিটে জোয়ার আসে কর্ণফুলী নদীতে। এর আগে ভাটা শুরু হয় দিবাগত রাত ৩টা ২৩ মিনিটে। যখন ভাটা শুরু হয় তখন জোয়ারের উচ্চতা থাকে সর্বোচ্চ। অর্থাৎ ভোর রাতে যখন বৃষ্টি শুরু হয় তখন জোয়ারের পানির লেবেল ছিল সর্বোচ্চ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারী বর্ষণ ও উচ্চ জোয়ার একই সময়ে হওয়ায় নগরের পানি নিষ্কাশনের মাধ্যম খালগুলো কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। জোয়ারের তীব্র চাপের কারণে নগরের ভেতরের পানি নামতে না পেরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সচিব মো. আশরাফুল আমিন আজাদীকে বলেন, টানা চার ঘণ্টা ভারী বৃষ্টি হয়েছে। তখন আবার জোয়ার ছিল। ফলে পানি নামতে পারেনি। বৃষ্টি বন্ধ হওয়ার সাথে পানি নেমে যায়।

জলমগ্ন এলাকা ও জনজীবনে স্থবিরতা : সরেজমিন পরিদর্শন ও স্থানীয়দের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, আগ্রাবাদ হাজীপাড়া, আগ্রাবাদের বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনি এলাকা, হালিশহর, কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ, মুরাদপুর, চকবাজার, কাপাসগোলা, বাদুরতলা, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, পাঠানটুলী, কাপাসগোলা, প্রবর্তক মোড়, শুলকবহর, দক্ষিণ নালাপাড়া ও জামালখান, উত্তর কাট্টলি, আইস ফ্যাক্টরি রোড, বাকলিয়ার বিভিন্ন অংশ, তিনপুলের মাথা ও মেহেদীবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। কাতালগঞ্জ ও পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার প্রাায় প্রতিটি সড়কে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। বিভিন্ন ভবনের নিচতলার পার্কিং ও বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে আসবাবপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কাতালগঞ্জ এলাকার এক বাসিন্দা সজীব ক্ষোভ প্রকাশ করে আজাদীকে বলেন, বাসার নিচতলায় হাঁটু পানি, আর বাইরের রাস্তায় কোমরপানি। একটু বৃষ্টি হলেই আমরা গৃহবন্দি হয়ে পড়ি। কয়েক হাজার কোটি টাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ চললেও আমাদের দুর্ভোগের শেষ হচ্ছে না।

জামালখান এলাকার বাসিন্দা সাঈদ বলেন, গত তিনচার বছর ধরে খালনালায় কাজ চলছে, কাজ শেষ হয় না। আজ কয়েক ঘণ্টার ভারি বৃষ্টিতে নালা উপচে পানি মূল সড়কে চলে আসে। জামালখান সড়কে জমে যায় হাঁটুসমান পানি।

শিক্ষা ও যাতায়াত সংকট : পানির কারণে বিভিন্ন এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উপস্থিতি ছিল কম। পাঁচলাইশে কয়েকটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের প্রবেশপথ পানিতে তলিয়ে গেছে। জলমগ্ন হয়ে পড়ে আগ্রাবাদ বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়। জলাবদ্ধতার কারণে গতকাল স্কুলটি বন্ধ রাখে কর্তৃপক্ষ। এদিকে সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় সকালে গণপরিবহন চলাচল প্রায় থমকে দাঁড়ায়। পথচারীরা জানিয়েছেন, গণপরিবহন না পেয়ে বৃষ্টি ও পানির মধ্যে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয় অনেককে। আবার সচল থাকা রিকশাগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি ভাড়া আদায় করার অভিযোগ করেছেন তারা।

গতকাল সকালে আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় দেখা গেছে, ইঞ্জিনে পানি ঢুকে যাওয়ায় সড়কে আটকা পড়ে সিএনজিচালিত টেক্সি ও একটি প্রাইভেট কার। রিকশা ও টেক্সিচালকরা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন পানির অজুহাতে।

মনজু নামে বেসরকারি এক চাকরিজীবী বলেন, কাতালগঞ্জে আমার বাসা। রাস্তায় কোমরসমান পানি, হেঁটে যাওয়া সম্ভব না। বাধ্য হয়ে রিকশা নিয়েছি। বাসা থেকে চকবাজার পর্যন্ত ভাড়া নিয়েছে ১০০ টাকা। যা স্বাভাবিক সময়ে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা নেয়।

বাণিজ্যিক ক্ষতি : চকবাজারের চক সুপার মার্কেটের নিচতলার বিভিন্ন দোকানপাটে পানি ঢুকে যায়। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। রেয়াজুদ্দিন বাজারের বিভিন্ন মার্কেটের বিভিন্ন দোকানপাট ও গুদামে পানি ঢুকে গেছে। এতে কাপড়, জুতা, কসমেটিকস, মোবাইলসহ বিভিন্ন দোকানের মালামাল নষ্ট হয়। রেয়াজুদ্দিন বাজারের গোলাম রসুল মার্কেট, নালা হকার মার্কেট, বাহার লেইন, রেয়াজুদ্দিন বাজারের পশ্চিম গলি, আর এস রোড, রায় শপিং ও তামাকুমুণ্ডি লেইনের কয়েকশ দোকানে পানি ঢুকে গেছে। ব্যবসায়ী নেতা সৈয়দ মোহাম্মদ মিজানুর রহমান আজাদীকে বলেন, এনায়েত বাজার, ডিসি হিল, ফলের আড়ত গলির পানি রেয়াজুদ্দিন বাজারে দিকে নেমে আসে। এতে দ্রুত দোকানপাটে পানি ঢুকে যায়। সকালে যখন পানি উঠে তখন ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন না। খবর পেয়ে তারা দোকানে আসতে আসতে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে।

আটকা পড়ে শাটল ট্রেন : নগরের অক্সিজেন সংলগ্ন রেললাইন তলিয়ে যাওয়ায় (প্রায় ৮ ইঞ্চি পানি) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়গামী দুটি শাটল ট্রেন ষোলশহর স্টেশনে আটকে পড়ে। সকাল ৭টা ১৫ মিনিট ও ৭টা ৪০ মিনিটে বটতলী স্টেশন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে ছেড়ে আসে ট্রেন দুটি।

পূর্বাভাস ও সতর্কতা : আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তায় বলা হয়, বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলপশ্চিমবঙ্গ উপকূল ও তৎসংলগ্ন উত্তর পশ্চিম বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থানরত নিম্নচাপের প্রভাবে গতকাল সোমবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে। ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের কারণে এসব এলাকার কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতাসহ চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও ভূমিধ্বস হতে পারে।

অপর এক সতর্কবার্তায় বলা হয়, উত্তর পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপটি ঘণীভূত হয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলপশ্চিমবঙ্গ উপকূল ও তৎসংলগ্ন উত্তরপশ্চিম বঙ্গোপসাগর এলাকায় মৌসুমি নিম্নচাপ আকারে অবস্থান করছে। এটি আরো উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে। এর প্রভাবে সমুদ্র বন্দরসমূহ, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার উপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারসমূহকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপুলিশ ক্লিয়ারেন্সের ‘দুর্ধর্ষ’ এক জাল গল্প
পরবর্তী নিবন্ধবোয়ালখালীতে হাক্কানী পেপার মিলের ওয়েস্টেজ গোডাউনে আগুন