‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’– পুরনো সব জীর্ণতাকে পেছনে ফেলে ভোরের আকাশে উদিত হয়েছে নতুন বছরের রক্তিম সূর্য। ১৪৩২ এর বিদায়ের পর পহেলা বৈশাখ তথা বঙ্গাব্দ ১৪৩৩–এর প্রথম দিন। জাতি–ধর্ম–বর্ণ নির্বিশেষে আজ বাঙালি মেতে উঠবে তার প্রাণের উৎসবে।
বন্দরনগরী চট্টগ্রামের আকাশ–বাতাস আজ মুখরিত হবে বৈশাখী আবাহনে। ভোরের আলো ফুটতেই ডিসি হিল, সিআরবি’র শিরীষতলা আর পতেঙ্গা সৈকতে ঢল শুরু হবে হাজারো মানুষের। পরনে লাল–সাদা পোশাক আর হৃদয়ে নতুনের জয়গান নিয়ে বরণ করে নিবে নতুন এই বছরকে। হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই দিনটি জাতি, ধর্ম ও বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। দেশ–বিদেশে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি বাংলাদেশি একযোগে মেতে উঠবে বাংলা বর্ষবরণের আনন্দে। দিবসটি উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বার্তায় বাংলা নববর্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। আজ সরকারি ছুটি। দিবসটি উপলক্ষে সংবাদপত্রসমূহ বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। সরকারি এবং বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করবে। বাংলাদেশ বেতার আয়োজন করেছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা।
বর্ষবরণে ডিসি হিলে অনুষ্ঠিত হবে বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আজ সকাল ৮ টায় নগরীর সার্কিট হাউস প্রাঙ্গণ থেকে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে বের করা হবে শোভাযাত্রা। জেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠানে সহযোগীর ভূমিকায় থাকছে সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদ চট্টগ্রাম। নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে ডিসি হিলে গিয়ে শেষ হবে শোভযাত্রা। পরে সেখানে চলবে বর্ষবরণের দিনব্যাপী অনুষ্ঠান।

এদিকে সিআরবি শিরীষতলায় বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আয়োজনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় রয়েছে চট্টগ্রাম রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাব। চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার সৈয়দ আয়াজ মাবুদ বলেছেন, শোভযাত্রায় অংশ নেবে বিনয় বাঁশী শিল্পী গোষ্ঠীর ঢোলবাদক দল। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আসা শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন থিমে সেজে আসবেন। সঙ্গে থাকবেন কৃষক, জেলে, চা বাগানের কর্মী, খাল খনন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শ্রমিকরা। এর আগে গত সোমবার রাতে নগরীর সার্কিট হাউজ থেকে ডিসি হিল পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কে আলপনা আঁকা হয়েছে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে। বৈশাখে নগরীতে এত দীর্ঘ আলপনা এবারই প্রথম বলে জানান তিনি। অনুষ্ঠান চলবে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। বিকেলে চিশতি বাউল সংগীত পরিবেশন করবেন। জেলা শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে সকাল ৯টায় একাডেমির মুক্ত মঞ্চে শুরু হবে বর্ষবরণের আয়োজন। সিআরবির শিরিষতলায় সকাল ৭টা থেকে শুরু হবে বর্ষবরণের আয়োজন। জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদ চট্টগ্রাম বর্ষ বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করতে অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। সকাল সাড়ে ৭টায় এনায়েত বাজার মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে বেহালা বাদনের মধ্য দিয়ে পরিষদের বর্ষবরণ আয়োজন শুরু হবে। এছাড়া ‘নব নব পল্লবরাজি সব বন উপবনে, ওঠে বিকশিয়া দক্ষিণ পবনে সংগীত ওঠে বাজি’ শিরোনামে আলেখ্য পরিবেশত হবে সকালের অধিবেশনে। বিকেলে দ্বিতীয় অধিবেশনে সংগীত পরিবেশন করবে সুরধারা ও সঞ্চারী সংগীত একাডেমি এবং গীতি–নৃত্য আলেখ্য ‘চিত্রাঙ্গদা’ পরিবেশন করবেন অভ্যুদয় সংগীত অঙ্গন ও নৃত্যরূপ একাডেমির শিল্পীরা। অন্যদিকে বোধন আবৃত্তি পরিষদ জে এম সেন হল প্রাঙ্গণে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলবে এই আয়োজন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় : ‘এসো প্রাণের উৎসবে, জাগো নব আনন্দে’–এ প্রতিপাদ্যে নববর্ষ উদযাপন করবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বর্ষবরণে থাকছে ঐতিহ্যবাহী পুতুল নাচসহ নানা বর্ণাঢ্য আয়োজন। আজ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্ট থেকে জারুলতলা পর্যন্ত ‘বৈশাখী শোভাযাত্রার’ মধ্য দিয়ে শুরু হবে দিনের আয়োজন। আয়োজনে প্রধান অতিথি থাকবেন, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। সকাল ১১টা থেকে জারুলতলায় বৈশাখী মঞ্চে হবে আলোচনা সভা। দুপুর ১২টা থেকে বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম ঐতিহ্য পুতুল নাচ, বলী খেলা, কাবাডি খেলা ও বাউচি খেলা অনুষ্ঠিত হবে। দুপুর ২টা থেকে শুরু হবে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও সংগীতানুষ্ঠান। দিনব্যাপী আয়োজনের অংশ হিসেবে আরো থাকছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী জীবনধারার নানা উপস্থাপনা, যেমন নাগরদোলা, পালকি, গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি ও বায়োস্কোপ প্রদর্শনী। পাশাপাশি পুরো দিনজুড়ে চলবে বিশেষ উদ্যোক্তা মেলা।
উদীচী : বাংলা নববর্ষে উদীচী, জেলা সংসদের অনুষ্ঠান নন্দনকানন কাটাপাহাড় মোড়ে শুরু হবে সকাল ৮টায়। এতে সকলকে উপস্থিত থাকার জন্য সভাপতি জসীম চৌধুরী সবুজ ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট অসীম বিকাশ দাশ অনুরোধ জানিয়েছেন।
নরেন আবৃত্তি একাডেমি : নগরীর কাজীর দেউড়িস্থ সিজেকেএস মুক্ত মঞ্চে পহেলা বৈশাখ উদযাপন উপলক্ষে বর্ণাঢ্য আয়োজন করেছে নরেন আবৃত্তি একাডেমি। নতুন বছরের প্রথম দিনকে ঘিরে আয়োজনটি হয়ে উঠবে সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলবে দিনব্যাপী এই আয়োজন।
নগরীর সেন্ট প্ল্যাসিডস স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণেও বর্ষবরণের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে শোভাযাত্রা, প্রদীপ প্রজ্বালন, সমবেত সংগীত, একক গান, নৃত্য, যন্ত্র সংগীতসহ সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশ নেবেন বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা।













