সাম্প্রতিক বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় নগরে ব্যাপক ক্ষয়–ক্ষতি হয়েছে। এ ক্ষতির তালিকায় আছে সড়ক, বসতঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কারসহ অন্যান্য অবকাঠামো সংস্কারে প্রয়োজন ৩৫৮ কোটি টাকা। কিন্তু এত টাকা ব্যয় করার আর্থিক সক্ষমতা নেই চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক)। এ অবস্থায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে ২৬০ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ চেয়েছে চসিক। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে ২৫০ কোটি টাকা এবং দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে চাওয়া হয় ১০ কোটি টাকা।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, আর্থিক সহায়তা চেয়ে গতকাল মন্ত্রণালয় দুটিতে পৃথক পত্র দিয়েছেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। বিষয়টি আজাদীকে নিশ্চিত করে তিনি বলেন, বৃষ্টিতে প্রায় ১৯৭ কিলোমিটার সড়ক নষ্ট হয়েছে। এগুলো মেরামত করতে প্রয়োজন ৩৪৭ কোটি ৮২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। আবার অনেক জায়গায় বসতঘরসহ অন্যান্য ক্ষতি হয়েছে। সেগুলো সংস্কারেও অর্থ প্রয়োজন। বাস্তবতা হচ্ছে সিটি কর্পোরেশন আর্থিকভাবে অতটা সক্ষম না। তাই মন্ত্রণালয়ে ডিও দিয়েছি। স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু’র সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তারা সহযোগিতার বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন।
যে কারণে প্রয়োজন ২৫০ কোটি টাকা: স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর কাছে দেয়া পত্রে বলা হয়, সামপ্রতিক বর্ষাকালে চট্টগ্রামে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। অতিবৃষ্টির ফলে নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পত্রে চট্টগ্রাম বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী এবং বন্দর নগরী হওয়ায় প্রতিদিন শহরের ব্যস্ততম সড়কসমূহে চট্টগ্রাম বন্দরের ভারী যানবাহনসহ বিভিন্ন সেবা সরবরাহমূলক সংস্থার গাড়ি চলাচল করে থাকে উল্লেখ করে বলা হয়, কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় নগরীর সড়ক অবকাঠামো অনেকটা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। জলাবদ্ধতার কারণে সড়কজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দ। ফলে নগরীর বিভিন্ন সড়কে জনসাধারণের চলাচলে ভোগান্তি সৃষ্টি হচ্ছে এবং জরুরি পণ্য সরবরাহ, চিকিৎসা সেবাসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
পত্রে বলা হয়, নগরের বিভিন্ন খালের পাশে নিরাপত্তা বেষ্টনীর অপ্রতুলতা থাকায় জলাবদ্ধতার ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। এমতাবস্থায় নগরীর ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও অবকাঠামো মেরামতসহ ঝুঁকিপূর্ণ স্থানসমূহে নিরাপত্তা বেষ্টনী স্থাপন করা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে।
পত্রে বলা হয়, সামপ্রতিক অতিবর্ষণে চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের পরিমাণ ১৯৭ কিলোমিটার। যা সংস্কারে আনুমানিক ব্যয় হবে ৩৪৭ কোটি ৮২ কোটি টাকা। বর্তমান দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে বর্ণিত মেরামত কাজ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় মেয়র চট্টগ্রাম মহানগরের ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন সড়ক ও অবকাঠামোসহ জরুরি ভিত্তিতে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণসহ নগরে বিভিন্ন খাল ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তা বেষ্টনী স্থাপন করার লক্ষ্যে চসিকের অনুকূলে বিশেষ থোক বরাদ্দ হিসেবে ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদানের জন্য অনুরোধ জানানো হয়।
পত্রে বলা হয়, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন স্থানীয় সরকারের একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নগরবাসীদের নাগরিক সুযোগ সুবিধা প্রদানকল্পে যাবতীয় সেবামূলক কার্যক্রম প্রদান করে থাকে। নগরীর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ছাড়াও বিভিন্ন খাল নালা–নর্দমা খনন, পুনঃখনন, সড়ক সমূহের সংস্কার ও উন্নয়ন, সড়ক বাতির ব্যবস্থা ও মানসম্মত স্বাস্থ্য ও শিক্ষা কার্যক্রম নিশ্চিতকল্পে প্রতি বছর সিটি কর্পোরেশনকে নিজস্ব তহবিল হতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়।
উল্লেখ্য, গত ৫ জুলাই থেকে শুরু বর্ষণ। এরপর ৬ জুলাই খেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত একটনা ভারী বৃষ্টি হয়। এছাড়া পরবর্তী দুইদিন ১১ ও ১২ জুলাইও এ বর্ষণ অব্যাহত ছিল। সবমিলিয়ে টানা প্রায় ৮দিন বৃষ্টি হয় নগরে। এতেই ক্ষত বিক্ষত হয় নগরের সড়ক।
ক্ষতিগ্রস্ত বসতঘর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মেরামতে ১০ কোটি টাকা : এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে দেয়া পত্রে মেয়র বলেন, ভারী বর্ষণে টানা ছয় দিনের জন্য পানিবন্দি হয়ে পড়ে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের মানুষ। কিছু পাহাড়ি এলাকা ছাড়া বন্দরনগরীর দুই–তৃতীয়াংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। মহানগরীর ২৪টি ওয়ার্ডের প্রায় ৫০ শতাংশ এলাকা জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে। এতে ২ হাজারের অধিক বসতঘর, ৫০টি’র বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অনেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বসতঘর হারা অসহায় ব্যক্তিরা মানবেতর জীবনযাপন করছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে পাঠদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। কোমর সমান পানি হওয়ায় রেয়াজুদ্দিন বাজারসহ বেশকিছু মার্কেটের দোকান ও গুদাম পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
মেয়র বলেন, মহানগরে অতি বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নিজস্ব উদ্যোগে ত্রাণ সহায়তা বিতরণ করে যাচ্ছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের চাহিদার তুলনায় তা অত্যন্ত নগন্য। ক্ষতিগ্রস্ত বসতঘর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ পুনঃনির্মাণসহ সংস্কারের জন্য ১০ কোটি টাকাসহ ৩০০ বান টিনের প্রয়োজন রয়েছে যা বর্তমান দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে জোগান দেওয়া সম্ভব নয়। পত্রে মেয়র চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় অতি ভারী বর্ষণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের সহায়তার জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় হতে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তাসহ টিন বরাদ্দ প্রদানের অনুরোধ জানান।











