প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের কাজে জড়িত দুর্নীতিবাজদের ছাড় নেই। তিনি বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো কাজে দুর্নীতি হয়ে থাকলে তা তদন্ত করে আইন অনুযায়ী দোষীদের অবশ্যই বিচার করা হবে। চট্টগ্রাম বন্দর রাষ্ট্রের ও জনগণের সম্পদ, তাই রাষ্ট্রীয় সম্পদের যেকোনো অপচয় রোধ এবং দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে তাঁর সরকার সর্বদা সচেষ্ট থাকবে।
গতকাল বুধবার বিকেলে জাতীয় সংসদে ঢাকা পাঁচ আসন থেকে নির্বাচিত সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেনের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে মোহাম্মদ কামাল হোসনের প্রশ্ন ছিলো– জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং কাস্টমস হাউস চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার স্ক্যানার মেশিন ক্রয় এবং অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিগত ২০১৮ সালে চারটি স্ক্যানার মেশিন ক্রয় এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করে। এই টেন্ডারে ব্যাপক দুর্নীতি হয়, মামলা হয় এবং এই অভিযোগ এখনো চলমান। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে কিনা না?
এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরটি দেশের সম্পদ। এটি একটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ, জনগণের সম্পদ। এখানে কোন কাজ করতে গিয়ে যদি দুর্নীতি হয়ে থাকে, সেটি যখনই হয়ে থাকুক না কেন অবশ্যই দেশের আইন অনুযায়ী যারা এর জন্য দায়ী তাদের বিচার অবশ্যই হবে। তিনি বলেন, একই সঙ্গে আমাদের সরকারের (বিএনপি) প্রচেষ্টা থাকবে যেকোন জায়গায় রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় যেন না হয়, এ লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমিকভাবে মুক্ত একটি পরিবেশ গড়ে তোলা। খবর বাসস ও বিডিনিউজের।
চট্টগ্রাম–১৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনাল চালু হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে শুভ সূচনা হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরওয়ার নিজামের প্রশ্ন ছিল, বে টার্মিনাল এবং চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিকরণ করার জন্য সরকার কি পদক্ষেপ নিচ্ছে। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বে টার্মিনাল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা আমরা নিয়েছি। বে টার্মিনালটা চালু হলে অবশ্যই এর একটা উপকারিতা সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি এবং দেশ পাবে। বে টার্মিনাল চালু হলে বড় আকারের মাদার ভেসেল সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়তে পারবে। এখন নাব্যতার জন্য অনেক সময় বড় জাহাজ আসতে পারে না। যখন বড় জাহাজগুলো আসবে, এর ফলে স্বাভাবিকভাবে পরিবহন ব্যয় বা খরচ অনেক কমে আসবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে নতুন টার্মিনাল স্থাপনসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তন্মধ্যে, পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) নির্মাণ ও অপারেশন চালু, লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণ এবং বন্দরের নাব্যতা রক্ষায় নিয়মিত ক্যাপিটাল ও মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম ডিজিটাইলেজশনের অংশ হিসেবে যে সকল কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে তা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনলাইন পোর্ট কমিউনিটি সিস্টেম, ই–ডেলিভারি অর্ডার, ই–পেমেন্ট ও অটোমেশন কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক আইএসপিএস কোড অনুযায়ী আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। তিনি বলেন, বন্দর ব্যবহারকারীগণ কর্তৃক দ্রুত ও সহজে বন্দরের মাশুলাদি পরিশোধের জন্য অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম চালু করা হয়েছে। বন্দরে যানবাহন প্রবেশ সহজতর করার জন্য ই–গেইট পাস চালু করা হয়েছে। পেপারলেস পোর্ট বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সিপিএ স্কাই, পোর্ট সিংগেল উইনডো চালু করা হয়েছে।
বন্দরের সামগ্রিক কার্যক্রমে অটোমেশন বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ইক্যুইপমেন্ট সংকট কমাতে ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে নিম্নোক্ত ৭টি কন্টেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং ইক্যুইপমেন্ট সংগ্রহের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এছাড়াও ৩টি ৫ টন ফর্কলিফট সংগ্রহের নিমিত্তে সরবরাহকারীর অনুকূলে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছে। ২টি খালি কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ফর্কলিফট ও ২টি ১০ টন ফর্কলিফট এর প্রাপ্ত দরপত্র মূল্যায়ন চলছে।
এদিকে একাত্তরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে প্রকৃত শহীদ এবং মুক্তিযোদ্ধার সঠিক তালিকা প্রণয়ন যাদের দায়িত্ব ছিল, তারা সেটাকে রাজনীতিকীকরণ করেছে বলে সংসদে প্রশ্নোত্তরে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পিরোজপুর–৩ আসনের সরকারি দলের সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমীন দুলালের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রথমে আমি বলেছি, দেশ স্বাধীনের পরে তাদের দায়িত্ব ছিল সঠিকভাবে শহীদদের ও মুক্তিযোদ্ধাদের একটি তালিকা প্রণয়ন করা। তারা সেটিকে রাজনৈতিকভাবে উপস্থাপন করেছে, তারা সেটা নিরপেক্ষভাবে সঠিকভাবে করেনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এরই মধ্যে, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় তারা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি মতন করে গঠন করেছে। যেখানে আমরা চেষ্টা করব সঠিক যারা মুক্তিযোদ্ধা, সঠিক যারা শহীদ, তাদেরকে চিহ্নিত করা জন্য।
একাত্তরের শহীদ ও গণহত্যার শিকারদের সঠিক তালিকা প্রণয়নের পরিকল্পনা সরকারের আছে কিনা রুহুল আমীন দুলালের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তার দলের নির্বাচনি অঙ্গীকার মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যাগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের গবেষকদের নিয়ে বিশেষজ্ঞ সভা আয়োজন, বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তার ভিত্তিতে কার্যক্রম গ্রহণ। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে গণহত্যার শিকার ও সকল শহীদের একটি নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য তালিকা প্রণয়ন এবং তাদের আত্মত্যাগের যথাযথ স্বীকৃতি ও মর্যাদা প্রদান সম্ভব হবে।











