প্রবাহ

একালে পাঁচদিনব্যাপী হজ্ব কার্যক্রম

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী | বুধবার , ২৪ এপ্রিল, ২০২৪ at ১০:৪১ পূর্বাহ্ণ

গত ২০২০ ও ২০২১ সালে বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ করোনা মহামারীর ভিতরও হজ্ব কার্যক্রম থেমে থাকেনি। অতঃপর সৌদি হজ্ব ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় হজ্ব কার্যক্রমকে আরও সুষ্ঠু সুন্দর করতে নিয়ন্ত্রণটা বাড়িয়ে দেয়। ফলে সৌদি নাগরিক মোয়াল্লেমগণের কর্মতৎপরতা থাকলেও হজ্ব ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়ের তৎপরতা আগের চেয়ে বেড়ে যায়। তেমনিভাবে বেড়ে যায় হজ্বের ব্যয়।

মৌলিকভাবে হজ্ব কার্যক্রম ৬ দিনব্যাপী। তথা জিলহজ্ব মাসের ৮ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত। নবী পাক (.) হজ্ব পালন করেছিলেন ৬ দিনব্যাপী। কিন্তু সাহাবাগণের মধ্যে অনেকে ১২ জিলহজ্ব তিন শয়তানকে পাথর মেরে মিনা ত্যাগ করেছিলেন বিধায় সৌদি সরকারের কাছেও ৫ দিনব্যাপী হজ্ব কার্যক্রম স্বীকৃত। তবে লাখ খানেক হাজী অতি পুণ্যের আশায় ১২ জিলহজ্ব দিবাগত রাত মিনায় থেকে যান মসজিদে খায়েফ বা তার নিকটতম স্থানে। যা জমরাত তথা শয়তান থেকে মাত্র ২/৩ শত মিটার দূরত্বে।

৫ দিনব্যাপী হজ্ব কার্যক্রমে ৪ দিন মিনা কেন্দ্রিক বলা যাবে। গত ২০২২ ও ২০২৩ সালে মিনায় হজ্বের ব্যবস্থাপনায় অধিকাংশ হাজীর অসন্তুষ্টির কথা জানা যাচ্ছে। যেমন হজ্বযাত্রী অনুপাতে মিনার তাঁবুতে আসন না থাকা, পাহাড়ের উপর তাঁবুর ব্যবস্থা করা; সময় মত খাবার দিতে অক্ষম হওয়া ইত্যাদি। মিনায় তাঁবুর ব্যবস্থাপনায় রয়েছে একাধিক স্তর। অপরদিকে জামরাত তথা শয়তানের যতই নিকটে অত তাঁবুর মান এ ক্যাটাগরি। এখানে প্রশস্ত আসন সেই অনুপাতে খাবার মান রয়েছে। সৌদিসহ উপসাগরীয় আরব দেশের নাগরিকগণ এবং যারা আর্থিকভাবে অতি সচ্ছল তারা এ ক্যাটাগরির তাঁবু নিয়ে থাকেন। এ ক্যাটাগরিতেও অব্যবস্থাপনা দুর্নাম শোনা গেছে। যেমন ঠিক সময়ে খাবার দিতে না পারা, খাবারের স্বল্পতা, আসন ব্যবস্থা সুন্দর না হওয়া ইত্যাদি। অতঃপর বি সি ক্যাটাগরি আমাদের বাংলাদেশের হাজীরা ঐদিকে থাকেন। পাহাড়ের উপরও বাংলাদেশীদের দেওয়া হয়েছিল।

মৌলিকভাবে আমরা বাংলাদেশীদের অবস্থান অনেকটা বি,সি অবহেলিত বলা যাবে। করোনার আগে অভিজ্ঞ অভ্যস্ত মোয়াল্লেমগণের নিয়ন্ত্রণে থাকত হজ্ব ব্যবস্থাপনা। মনে হয় হজ্ব ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় ঠিকাদারের মাধ্যমে অনেক কিছু ব্যবস্থা করতে চাচ্ছে।

ওআইসির মাধ্যমে সৌদি সমঝোতায় বিশ্বব্যাপী হাজারে একজন হজ্ব করবেন। সে মতে ২৬ লাখ বা কম বেশি মুসলিম নরনারী হজ্ব করবেন। বাংলাদেশী প্রায় ৪৪ হাজারসহ বিশ্বের অন্য কোন দেশে কোটা পূর্ণ হয় নাই। ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে ধনী দেশের নরনারীরা পরবর্তীতে কোটা নিয়ে নেয়।

হজ্ব যেহেতু বছরের নির্ধারিত সময়ে অতএব হজ্বের আগে সমস্ত হজ্বযাত্রী পবিত্র মক্কায় এসে জড়ো হওয়াটা স্বাভাবিক। তখন বিশ্বের পাশাপাশি বাংলাদেশের কাফেলা এজেন্সীরা রাত দিন কর্মতৎপর হবেন তাদের নিয়ন্ত্রিত হজ্বযাত্রীগণকে ৫ দিনব্যাপী সুন্দর সুষ্ঠুভাবে হজ্ব পালন করানোর জন্য। কাফেলা এজেন্সীরা প্রতিনিয়ত মোয়াল্লেমের সাথে সমন্বয় রেখে যাবে মিনা আরাফাতে তাঁবুর ব্যবস্থা ও বাসের ব্যবস্থা ঠিকভাবে হতে বা পেতে। হজ্বযাত্রীরাও ৭ জিলহজ্ব সকাল থেকে ৫ দিনব্যাপী হজ্ব পালনের জন্য অনেকটা মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন। সে লক্ষে ছোট ব্যাগে এহরামের কাপড়, টিস্যু, ঔষধপত্র, সাথে কিছু শুকনা খাবার। আগে পানি স্বল্পতা ছিল। এখন অনেকটা হাত বাড়ালেই বোতলের পানি পাওয়া যায়। তারপরও আধা লিটারের একটা দুইটা বোতল রাখা যেতে পারে। হজ্বযাত্রীগণ তাদের কাফেলা এজেন্সী দিক নির্দেশনায় হজ্বপালন করেন।

আমাদের মাজহাব মতে মিনায় অবস্থান করা সুন্নতে মোয়াক্বাদা। আরও সুন্নত ৮ জিলহজ্ব যোহর থেকে ৯ জিলহজ্ব ফজরের জামাত মিনায় পড়া। নবী পাক (.) তা করে ছিলেন।

প্রায় ২৬ লাখ নরনারী হজ্ব করতেছেন। অতএব শৃংখলা এবং হজ্বের সুষ্ঠু পরিচালনার সুবিধার্তে ৭ জিলহজ্ব দিবাগত রাত থেকে হজ্বযাত্রীগণকে পবিত্র মক্কা থেকে মিনায় নেয়া হচ্ছে। হজ্বের শৃংখলার স্বার্থে হজ্বযাত্রীগণকে তা মেনে নিতে হবে। ৮ জিলহজ্ব মিনায় অবস্থান করে ওয়াক্ত ওয়াক্ত নামাজ পড়া বাদে হজ্বের আর কোন আহকাম নেই।

৯ জিলহজ্ব সকালে মিনা থেকে আরাফাত রওনা হওয়া সুন্নত। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও হজ্বের শৃংখলার স্বার্থে ৮ জিলহজ্ব এশারের পর থেকে বাসের স্বল্পতা ও ভীড় এড়াতে হজ্বযাত্রীগণকে আরাফাত নেয়া শুরু করে দেয়।

৯ জিলহজ্ব সকালে আরাফাতে গোসল করতে পারাটা সুন্নত। আরাফাতে মাত্র ৮/১০ ঘণ্টা অবস্থানের ব্যাপার। হজ্বের তিন ফরজের মধ্যে আরাফাতে অবস্থান অন্যতম হলেও ৯ জিলহজ্ব আরাফাতে অবস্থানকেই হজ্ব বলা হয়। এ দিন মসজিদে নমেরায় ইমাম সাহেবের খুতবা এবং এক আজান দুই একামতে যোহর আসর জামাত কছর হিসেবে পরপর পড়াবেন। যা বিশ্বব্যাপী অসংখ্য টিভি চ্যানেলে রিলে হয়ে থাকে। তাঁবুতে এদিন যোহর ও আছর জামাত পড়ার ক্ষেত্রে মত পার্থক্য রয়ে গেছে। অনেকে কছর হিসেবে পরপর পড়ছে, অনেকে যোহরের টাইমে যোহর, আছরের টাইমে আছর পড়তেছে।

হজ্বের সফরে আরাফাতে দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়, বিশেষ করে দুপুর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। আরাফাত থেকে সূর্যাস্তের পরপর মুজদালেফায় রওনা হতে হবে মাগরিবের নামাজ না পড়ে। এক্ষেত্রে বাসে সিট পাওয়া কষ্টসাধ্য। সিট পেতে অনিশ্চয়তা বিধায় অনেকে সূর্যাস্তের ১/২ ঘণ্টা আগে বাসে উঠে বসে থাকেন।

মুজদালেফায় কাফেলা এজেন্সী বা মোয়াল্লেমের কোন ব্যবস্থা নেই বললেই চলে এ ক্যাটাগরি বা ভি.আই.পি হাজীরা বাদে।

এখানে এশারের ওয়াক্তে এক আজান দুই একামতে মাগরিব ও এশারের নামাজ পরপর পরবেন। শয়তানকে মারার জন্য ৪৯ টি পাথর সংগ্রহ করে নিবেন। বিশ্রামে এবাদতে রাত কাটবেন। ফজরের নামাজ পড়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। অতঃপর মিনায় গমন করে বড় শয়তানকে পরপর ৭টি পাথর নিক্ষেপ করবেন। দমে শুকরিয়া তথা হজ্বের কোরবানী করা, মাথার চুল ফেলা, এরপর পবিত্র মক্কায় গিয়ে ফরজ তাওয়াফ করা। অতঃপর হজ্বের ওয়াজিব সায়ী করে মিনায় ফিরে আসা। ১১ জিলহজ্ব যোহরের পর থেকে প্রথমে ছোট তারপর মেজ, তারপর বড় শয়তানের প্রতি ৭টি করে ২১ টি পাথর নিক্ষেপ করে মিনায় রাত্রিযাপন করা।

১২ জিলহজ্ব দুপুরের পর ১১ জিলহজ্বের অনুরূপ তিন শয়তানের প্রতি ২১ টি পাথর মেরে মিনা ত্যাগ করা। এই হল ৫দিনব্যাপী হজ্ব কার্যক্রমের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। তবে আরাফাত থেকে মুজদালেফা অতঃপর মিনায় এসে হজ্বের আহকাম পালন, পবিত্র মক্কা গিয়ে তাওয়াফ সায়ী করে আবার মিনায় ফিরে আসা বর্তমানকালেও কষ্টসাধ্য। অবস্থাভেদে এ ক্যাটাগরি বা ভি.আই.পি হাজীরা এ কষ্টসাধ্য থেকে মুক্ত নয় বলা যাবে।

হজ্বযাত্রী মহান আল্লাহ পাকের আমন্ত্রিত মেহমান। আল্লাহ পাকের উপর ভরশা রাখতে হবে, রাখতে হবে সাহস।

হানাফী মাজহাব মতে হজ্বের ৩ ফরজ, ৬ ওয়াজিব। এক. হজ্বের উদ্দেশ্যে এহরাম পরিধান করা দুই. আরাফাতে অবস্থান করা তিন. ১০১২ জিলহজ্বের মধ্যে পবিত্র কাবা শরীফ তাওয়াফ করা হজ্বের ফরজ।

৬ ওয়াজিব হল। এক. ৯ জিলহজ্ব দিবাগত রাত মুজদালেফায় অবস্থান করা দুই. তিন দিনব্যাপী মিনায় শয়তানকে পাথর মারা তিন. ক্বেরাণ ও তামত্তো হাজীর ক্ষেত্রে দমে শুকরিয়া করা চার. মাথার চুল ফেলানো পাঁচ. সাফামারওয়া সায়ী করা ছয়. হজ্বের পর পবিত্র মক্কা ত্যাগ করতে খানায়ে কাবা তাওয়াফ করা (সাধারণ কাপড়ে সায়ীবিহীন)

হজ্ব ও ওমরাহ বিষয়ে আরও জানতে ২৭ এপ্রিল শনিবার সকাল ৯ টা থেকে চট্টগ্রাম মহানগরীর স্টেশন রোডে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের হোটেল সৈকতে হজ্ব প্রশিক্ষণে উপস্থিত থাকতে পারলে ভাল হয়। প্রশিক্ষণ বিষয়ে আরও জানতে ০১৭১৩১১৫৬০১ নাম্বারে যোগাযোগ করতে পারেন। এ প্রশিক্ষণের আয়োজক হজ্বযাত্রী কল্যাণ পরিষদ কোন কাফেলা/এজেন্সী নয়। পরিষদের সদস্যরা সম্পূর্ণ আল্লাহর ওয়াস্তে এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করে আসছেন।

মহান আল্লাহ পাক হজ্বযাত্রীগণের হজ্ব কবুল করুক। আমিন।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনারী : যে তিমিরে ছিলো, সে তিমিরেই রয়ে গেছে
পরবর্তী নিবন্ধজাদুকর