চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে গত এক দশকে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, স্লুইচগেট নির্মাণ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ নানামুখী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নগরীর জলাবদ্ধতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর। কিন্তু নগরীর অধিকাংশ খালের তলদেশ আবারও পলিথিন, প্লাস্টিক, গৃহস্থালি বর্জ্য, নির্মাণসামগ্রী, পাহাড়ের মাটি, বালি এবং পলিতে ভরে যাচ্ছে। ফলে খালগুলোর গভীরতা ও পানিধারণ ক্ষমতা দ্রুত কমে ভারী বৃষ্টিতে নতুন করে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে একনেকে অনুমোদিত ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় নগরীর প্রধান খালগুলো পুনঃখনন ও সংস্কার করা হয়। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ছিল প্রায় ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা, পরে যা বৃদ্ধি পেয়ে ৯ হাজার ৫২৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। প্রকল্পের মেয়াদও একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
এই প্রকল্পের আওতায় নগরীর ৩৬টির বেশি খাল ও উপ–খালে ব্যাপক খননকাজ সম্পন্ন হয়েছে। খালের তলদেশ থেকে লাখ লাখ ঘনমিটার মাটি অপসারণ করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই প্রকল্পের আওতায় খাল থেকে ভাঙা খাট–পালং, তোষকসহ এমন কোনো পণ্য নেই যা অপসারণ করা হয়নি। খাল খননের পাশাপাশি অনেক স্থানে খালের প্রশস্ততাও বাড়ানো হয়েছে। খালের পাড়ে নির্মাণ করা হয়েছে রাস্তা। কিন্তু ইতোমধ্যে বহু খালে আবারও বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য, পলি ও মাটি জমে গভীরতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। সরেজমিনে একাধিক খালে জমে যাওয়া মাটিতে আগাছা জন্মাতে দেখা গেছে। অথচ বছরখানেক আগে এসব খাল থেকে মাটি, বালি ও বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাল ভরাট হওয়ার প্রধান কারণ প্রকৌশলগত নয়, সামাজিক। খালকে বর্জ্য ফেলার স্থানে পরিণত করে উন্মুক্ত ডাস্টবিন বানানোর প্রবণতাই খালগুলোকে মেরে ফেলছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়ি, বাজার, হোটেল, দোকানপাট এবং ছোট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য সরাসরি খালে ফেলা হচ্ছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল, কাপড়, কাঠ, খাবারের উচ্ছিষ্ট ও অন্যান্য আবর্জনা খালে জমা হচ্ছে। খালের পানিপ্রবাহ ধীর হয়ে গেলে এসব বর্জ্য তলদেশে আটকে থেকে ধীরে ধীরে পলি জমার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে। বহুতল ভবন নির্মাণের সময় অনেক স্থানে পাইলিংয়ের মাটি, বালি, ইটের খোয়া, সিমেন্টের অবশিষ্টাংশ বিভিন্ন নালা হয়ে সরাসরি খালে পড়ে। এসব উপাদান দ্রুত খালের গভীরতা কমিয়ে দেয়।
নগরীর অনেক পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে, অনেক পাহাড় কাটা হচ্ছে। অবৈধভাবে পাহাড় কাটার কারণে বর্ষাকালে বিপুল পরিমাণ মাটি খালে এসে পড়ে। বিশেষ করে চাক্তাই, মহেশখাল, মির্জাখাল, নয়া খাল ও অন্যান্য খালে পাহাড় কাটা মাটি ও বালি জমে খালের গভীরতা দ্রুত কমিয়ে দিচ্ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, জনগণ এখনো খালকে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ কিংবা চলন্ত জলাধার হিসেবে বিবেচনা না করে অনেক ক্ষেত্রে ‘ময়লার ভাগাড়’ বা উন্মুক্ত ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে কোটি কোটি টাকা খরচ করেও খননের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না।
তারা বলেন, খালের মূল কাজ হলো বৃষ্টির পানি দ্রুত কর্ণফুলী নদী ও সাগরে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু যখন খালের গভীরতা কমে যায় তখন পানির প্রবাহ ধীর হয়ে যায়। অতিবৃষ্টিতে পানিপ্রবাহ কমে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। শুধু জলাবদ্ধতা নয়, খালের পানিপ্রবাহ কমে বা বন্ধ হয়ে গেলে মশা ও রোগজীবাণুর বিস্তার বাড়ে। নগরজীবন নানাভাবে ব্যাহত হয়। প্রকৌশলীরা বলছেন, খালের গভীরতা এক মিটার কমে গেলে তার পানিধারণ ক্ষমতা কয়েক গুণ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে।
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরবাসীর মনমানসিকতা যেভাবে তৈরি হয়েছে তাতে শুধু খাল খনন করে সুফল পাওয়া কঠিন হবে। খালের জন্য স্থায়ী ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, প্রতি বছর প্রাক–বর্ষা মৌসুমে খাল ড্রেজিং, খালে বর্জ্য ফেললে কঠোর জরিমানা, বাজার ও আবাসিক এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার, খালের দুই পাড়ে সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে ‘খাল রক্ষা কমিটি’ গঠন, পাহাড় কাটা ও মাটি ফেলা বন্ধে কঠোর নজরদারি দরকার।
তারা বলেন, চট্টগ্রাম এমন একটি শহর যেখানে পাহাড়, নদী এবং সমুদ্র রয়েছে। এমন শহরে জলাবদ্ধতার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। নগরীর খালগুলো প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার প্রাণ। হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের পর খালগুলো নতুন জীবন পেয়েছে। কিন্তু জনসচেতনতার অভাব, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতির কারণে সেই অর্জন হুমকির মুখে পড়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি আশিক ইমরান দৈনিক আজাদীকে বলেন, নগরীর খালগুলো নগরবাসীরও সম্পদ। নগরজীবনের জন্যই খালগুলোকে রক্ষা করা জরুরি। জনসচেতনতা তৈরি না হলে খালগুলোকে রক্ষা করা কঠিন। খালের গভীরতা ও পানিধারণ ক্ষমতা রক্ষা করা না গেলে জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যয় হওয়া বিপুল অর্থের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তিনি বলেন, পরিস্থিতি এভাবে চললে বছর কয়েকের মধ্যে চট্টগ্রামকে আবারও জলাবদ্ধতার দুঃসহ চিত্রের মুখোমুখি হতে হবে।











