এটা একটা কথা হলো? যে পথ ধরে ছোটে পুণ্যার্থীরা পবিত্র নগরীর দিকে, এই রকম অনিরাপদ, সেই পথ! যতোই ভোকাট্টা ঘুড়ির মতো প্রশ্নটাকে সুতো কেটে, উড়তে উড়তে হারিয়ে যেতে দিতে চাই, হচ্ছে না তা। থেকেই যাচ্ছে দেখছি তা আমারই নাটাইয়ের সুতোতে আটকা! আর মারছে গোত্তা বারবার!
হাইওয়ে ফর্টি বা জেদ্দা মক্কা ডাইরেক্ট এই হাইওয়েতে নাকি অহরহই হয় ভয়াবহ সব দুর্ঘটনা! শিহাবের কাছ থেকে এ তথ্য জানার পর থেকেই, উপরের ঐ প্রশ্নটি, অল্প পানির গর্তে আটকা পড়া কই মাছের মতো খলবল করছে খলবল!
সামনের আধা কিলোমিটার খানেক দূরের, দুর্ঘটনাটি কতোটা ভয়াবহ তা তো জানি না। তবে বেশ দ্রুততার সাথেই, মানে মিনিট ১৫ / ২০ এর মধ্যে পুলিশের গাড়ি ও দশদিক সচকিত করে তীব্র গলায় সাইরেন বাজাতে বাজাতে এ্যাম্বুলেন্স এসে হাজির হতেই, প্রশংসা করেছিলাম সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ।
ফোঁড়ন কেটেছিল শিহাব তাতেই, “আরে এতো দুর্ঘটনা ঘটে এই রাস্তায় যে, সর্বক্ষণ ওরা তৈরি হয়ে বসেই থাকে, বুঝলে না!” উত্তরে ঐ বেমক্কা প্রশ্নটি গিলে ফেলে বললাম, হুম তাতে একদিকে যেমন দুর্ঘটনা আক্রান্তদের সুবিধা হয়, তেমনি হয় সুবিধা জ্যামে আটকে থাকা সকলেরও। হল এখন যেমন। মোটামুটি ৩০ মিনিটের মধ্যেই তো পেয়ে গেলাম মুক্তি।
“এরই মধ্যে আল হারামাইন এঙপ্রেস ট্রেন লাইনের কাজও শুরু হয়ে গেছে, কিন্তু। ইলেক্ট্রিক ঐ ট্রেনে, জেদ্দা এয়ারপোর্ট থেকে মাত্র ৪০/৪৫ মিনিটে নাকি যাওয়া যাবে মক্কা। মদিনা যেতে লাগবে খুব জোর দেড় ঘণ্টা!” বলতে যাচ্ছিলাম, এতদিন করেনি কেন এটা এই ব্যাটারা? টাকা পয়সার তো অভাব নাই এদের। এছাড়া হজ ওমরা করতে আসা লোকদের থেকেও তো হয় অনেক কামাই। থামালাম নিজেকে জোর ব্রেক চেপে। বরং বললাম, শোন শিহাব, কথাবার্তা বলে মনোযোগ নষ্ট করার দরকার নাই। তুমিই তো বললে, এই হাইওয়ে খুবই দুর্ঘটনাপ্রবন। তুমি ভাই গাড়িই চালাও একমনে। কিছুতেই ১০০ এর বেশী তুলো না স্পিড, ভাইটি।
সাথে সাথে গাড়ির সিডিতে বেজে উঠলো আরবি সঙ্গীত। ভাবলাম, বলি যে পবিত্র নগরীর পথে এরকম গান বাজানোটা কি ঠিক হচ্ছে? পরক্ষণেই মনে হল, নিশ্চয় এ হয়তো আরবি হামদ, নাত জাতীয় কিছু।
“ঐ যে, ঐ যে, বাহ ওওয়াবাত মক্কা“ মিনিট পচিশ কি ত্রিশ চুপচাপ গাড়ি চালানোর পর শিহাব এ কথা বলে উঠতেই, নজরে পড়লো আবছাভাবে দূরে রাস্তার এ মাথা ঐ মাথা জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা, স্ট্রাকচারটি। আমাদের দেশের বড় বাঁশের মাথার দিকের বেশ কিছু নীচে আচ্ছামতো দড়ি দিয়ে বেঁধে, দুই বাঁশ কে রাস্তার দুই পাশে খাড়া করে দিলে যেমন দেখা যাবে, ওরকমই মনে হচ্ছে ওইটিকে। হুম বুঝলাম ওখান থেকেই শুরু হয়েছে হারাম পয়েন্ট।
ততোক্ষণে গাড়ি আরো এগিয়ে যাওয়ায়, হারাম পয়েন্টের গেইটটি পরিষ্কার নজরে আসলো। সাথে সাথেই ভেসে উঠলো দৃশ্যটি চোখের সামনে বহুকাল আগে অনেকবার দেখা সেই দৃশ্যটি হলো আমার নানুর। দিনের নানান অবসরে, ঘরের এককোনায় যে নামাজ ঘর ছিল, সেখানে লম্বা ঘোমটা টেনে, কাঠের রেহালের উপর কোরানশরিফ রেখে নিচু গলায় গুন গুন তেলাওয়াত করতেন নানু যেরকম দুলে দুলে, দেখলাম তাই। আসলে কাছাকাছি এসে গেইটিকে, বিশাল এক রেহালের উপর রাখা পবিত্র কোরানের ভাস্কর্যই মনে হয়েছিল তো।
হুম, শহরে ঢুকেই পড়েছি জ্যামে। ডানে বাঁয়ে তাকাতেই দেখি, প্রতিযোগিতা করে আকাশের দিকে মাথা উঁচু করে থাকা স্কাইস্ক্র্যাপার সহ নানান আকারের দালানেরা আছে চোখের সামনে বাঁধা হয়ে। পড়ছে না চোখে, দিগন্তেত ওপাশে আকাশে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কাফ্রি পাহারাদারদের মতো, পাথুরে পর্বতগুলো। ফুটপাতে লোকজনের উপস্থিতি সুপ্রচুর। দালানের ছায়ায় জায়গায় জায়গায় পসরা নিয়ে বসেছে হকারেরা।
ব্যস্তসমস্ত আধুনিক মেট্রোপলিটন শহর মক্কার, এই চেহারা দেখে টের পেলাম নিজের অবচেতন মূর্খতাও এসময়। মগজে হারেম শরিফ চত্বরের যে ছবি আছে আঁকা, সেটি হালনাগাদ হলেও, মক্কার বাকী অংশ রয়ে গেছে আদি আমলে।
টিভি মারফত অন্যসময় না হলেও হজ্জের সময়তো লোকে লোকারণ্য হারেম প্রাঙ্গণ দেখেছি বহুবারই। কিন্তু মক্কা শহরের ছবি বা ভিডিও কখনো দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না। ফলে সেই অংশটা আটকে আছে বালক বেলায় বইয়ে পড়া চিত্রকল্পেই। দিগন্ত বিস্তৃত খটখটে সেই মরুতে চড়ছে উটেরা, দুম্বারা। ইতি উতি এদিকে ঐদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে খেজুর পাতার ছাউনি দেয়া পাথুরে ঘর, তাঁবু।
সচেতন ও অবচেতন মনের এ কোন খেয়াল বুঝতে পারছি না। উট দুম্বার বদলে চারিদিকে এতো গাড়ি, আর খেজুর পাতার ঘর বা তাবুর জায়গায় স্কাইস্ক্র্যাপার দেখে ভির্মিই খেয়ে গেলাম।
এদিকে, শিহাবের গাড়ি চালানোর ভঙ্গি বলছে নীরবে, ভালই চেনে সে মক্কার পথঘাট। বেশ কবারই কান্নি খেয়ে, গোত্তা মেরে মূল রাস্তা ছেড়ে নানান গলিতে ঢুকে এগুনোর কারণে, পৌঁছে গেলাম তাই গন্তব্য হোটেল লে মেরিডিয়ানে টাওয়ারে, তুলনামূলক দ্রুতই। চেক ইন করতে গিয়ে পেলাম দেখা ইহরামশোভিত হাশিশের। আমাদের অপেক্ষায় আছে সে। এছাড়া দাম্মাম থেকে আরো দুই তিন জন ডাক্তার এখনো এসে পৌছায় নি। কিছুটা উদ্বিগ্ন সে তাই। চেকইন করতে করতে, হাশিশের সাথের আলাপচারিতায় বুঝলাম, হোটেলেই ইফতার করার নিয়ত তাদের। একদম ঢিল ছোড়া দূরত্বে হারেম শরিফের প্রাঙ্গণেই যেহেতু হোটেল টা, সেহেতু হারেম প্রাঙ্গণের ভিড়ে গিয়ে কাজ নাই। যাবে সে এশার নামাজ পড়তে। ফজরের নামাজের পর পরই সবাই করবে ওমরাহ এমনই পরিকল্পনা তার।
হোটেলে ইফতার করার ব্যাপারে দেয়া হাশিশের যুক্তি পছন্দ হলো না। আসলে এসব তো যুক্তির বিষয় না। যুক্তি টানতে গেলেই লাগে এসবে ঝামেলা। জারী হতে শুরু করে নানান ফতোয়া। লাগে ফতোয়ায় ফতোয়ায় টক্কর। আর সেসব টক্করের ফলাফল যে কী হতে পারে, সেই খোলাফায়ে রাশেদিনের আমল থেকেই দিচ্ছে সাক্ষী তার ইতিহাস। বর্তমানের কথা থাকুক তোলাই।
বললাম তাই, দেখো আমি প্রথম এসেছি। অতএব ভিড়ভাট্টা হোক আর যাই হোক, হারেম প্রাঙ্গণেই করবো ইফতার। যাবো কিভাবে কোনদিকে তুমি বরং সেটা বল। আর পারলে বল নবী করিম (দঃ) বাড়িটা কোথায়? কাল তো সময় পাবো না, আজই মাগরিব পরে দেখতে যাবো।
আমাদের কথার মধ্যে ঢুকে পড়ল এ সময় রিসেপশনের লোক। জানালো ১৫ মিনিট পরেই যাবে হোটেলের সাটেল, হারেম প্রাঙ্গণে ড্রপ দিতে। অবশ্য হেঁটে গেলেও ওখানে পৌঁছুতে লাগবে বড় জোর মিনিট দশেক। হোটেলের সামনে দিয়ে সোজা গড়িয়ে যাওয়া রাস্তা ধরে কিছুটা এগুলেই, পাওয়া যাবে ছোট্ট একটা টানেল। ঐ টানেলের ওপাশেই হারেম শরিফের কিং আবদুল আজিজ গেইট। কিন্তু নবিজির (দঃ) বাড়ির ব্যাপারে কোন হদিস দিতে পারল না রিসেপশনের লোক না হাশিশ!
মিনিট তিরিশেক পরেই ইফতার। অতএব আলোচনা মুলতবি করে, দিলাম রওয়ানা দ্রুত রুমের উদ্দেশ্যে। বোঝা যাচ্ছে, যাচ্ছি আমি একাই এ সন্ধ্যায় হারেম প্রাঙ্গণে ইফতার করতে। আরো বহুবার মক্কায় আসার কারণে, শিহাব বা হাশিশ কারোই এ নিয়ে নাই কোন বাড়তি উত্তেজনা। তবে একটা ব্যাপার বুঝলাম না মোটেও। কেউই এরা কেন নবিজির বাড়ির খোঁজ দিতে পারল না? সেই যে ছোটবেলায় পড়েছিলাম কাফের বুড়ির কাহিনী, যে বুড়ি হযরত মুহম্মদ (দঃ) যে পথে যেতেন হেঁটে কাবায়, সেই পথে পুতে রাখতেন কাঁটা। সেই গল্প অনুযায়ী বাড়িটি তো কাছে ধারেই হওয়ার কথা।
রুমে এসে দ্রুত গোসল অজু শেষে, প্রথমে ভেবেছিলাম পাসপোর্ট মানিব্যাগ এমনকি ফোনও রুমে রেখে, অল্প কিছু রিয়াল নিয়েই যাবো হারেম প্রাঙ্গণে। শুনেছি পরকালের জন্য ছোওয়াব সংগ্রহের আশায় ঘোরা পুণ্যার্থীদের ভিড়ে, নানান জনের পকেট সাফা করে নিজেদের ইহকালের সঞ্চয় বাড়ানোর লোকেরও অভাব নাই ওখানে।
নাহ শেষ পর্যন্ত ফোনটা নিয়েই নিলাম। এই জিনিস ব্যবহার শুরু করার পর থেকে, এটি ছাড়া চলে না দেখি এক মুহূর্তও। বিশেষত নতুন জায়গায় গেলে, আর সাথে ফোন না থাকলে আজকাল মনে হয় পড়েছি অকুল পাথারে!
বেশ দ্রুতই সেরেছি সব। সাটেলের সিটে বসে, মোবাইলের পর্দায় চোখ যেতেই বোঝা গেল আছে হাতে আরো মিনিট তিনেক। এ মুহূর্তে হারেম যাত্রী সব মিলিয়ে হবে দশ বারো জন। আরো কেউ উঠবে কী না কে জানে? বাসে উঠার আগে, হোটেলকে বলে ছোট একটা ইফতার প্যাকেট ধরিয়ে দিয়েছে হাতে। ভালই হল। নেমেই আর ইফতার খোঁজার হাঙ্গামা থাকলো না।
বাহ, বেশ দ্রুতই সাটেল থেমেছে এসে হারেম এলাকায়। বাস থেকে বেরিয়ে মনে হল, কোন একটা বেইজ মেন্টের পার্কিং এরিয়াতে নামলাম। সামনের লোকজনদের পিছু পিছু থেকে হেঁটে উপরে উঠেই পেলাম টের, মরুর ডুবু ডুবু মার্তণ্ডের হল্কা। বুঝতে পারছি না রিয়াদের চেয়ে বেশী ধার কি না মক্কার রোদের।
বাঁয়ে চোখে ঘোরাতেই চোখে পড়লো নির্মাণাধীন বিখ্যাত আব্রাজ আল বাইত টাওয়ার। হারেম শরিফ চত্বরের গায়ে গা লাগিয়ে সাত সাতটি বিশাল স্কাইস্ক্র্যাপারসমৃদ্ধ মেগা হোটেল প্রজেক্টটি শেষ হতে লাগবে নাকি আর বছর তিন কি চার। প্রতিটি টাওয়ারের মাথায় দেখা যাচ্ছে হলদে রঙ্গয়ের বিশাল বিশাল ক্রেন। মাস কয়েক ভয়াবহ আগুন লেগেছিল এই প্রজেক্টে।তখনই জেনেছিলাম এ বিষয়ে খবরের কাগজ মারফত। সে আগুনে কেউ আহত বা নিহত হয়েছে এমন কিছু অবশ্য ছিল না খবরে। অবশ্য এখানকার খবর তো হয় ততটুকুই, যতটুকু চান রাজা।
তখনই জেনেছিলাম বিন লাদেন গ্রুপ করছে এই মেগা প্রজেক্টের কাজ। অবশ্য মক্কা এলাকার হারেম শরিফ সহ সব কাজই নাকি করে ঐ গ্রুপ। নিশ্চয় অত্যন্ত ক্ষমতাবান গ্রুপ এরা। ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিশ্চয় আছে এদের রাজপরিবারে সাথে। হায় রে এদেরই কি না এক লাদেন, আছে কি না আফগানিস্তানের কোন না কোন পর্বতের গুহায়! যার সাগরেদ কি না এই তো সেদিন করলো হামলা, উপ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে!
নাহ, যেমন গরম হবে ভেবেছিলাম তেমন তো গরম না হারেম চত্বরের মেঝে। পা তো ফেলা যাচ্ছে। শুনেছি, মেঝের এই সাদা মার্বেল পাথর আনা হয়েছে গ্রীসের থাসুস দ্বীপ থেকে। চমৎকার সাদা এই পাথর গুলোর নাকি সূর্যের আলো প্রতিসরণ করার আছে প্রাকৃতিক ক্ষমতা। ফলে মরু রোদের তাপ বসাতে পারে না কামড় এতে। উল্টো সেই তাপ থাসুস পাথর উগড়ে দেয় বাতাসে। তা না হলে পা ফেলা যেত কি না, এই মেঝেতে কে জানে? লোকেলোকারণ্য গোটা চত্বর। বেশিরভাগই আছেন ইফতারের অপেক্ষায়। তবে কেউ কেউ দেখছি নামাজও পড়ছেন। ঐ যে ঐদিকটায় কিছুটা ফাঁকা দেখতে পাচ্ছি। যাই তো এখন ঐদিকে। দেখি তো গিয়ে বসার মতো একটু জায়গা করা যায় কী না। ভাবতে ভাবতে ভিড়ের ফাঁক ফোঁকর গলে এগুলাম ঐদিকে।
লখক : ভ্রমণসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক।














