(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরার লেক বার্লি গ্রিফিনের পাড়ে হেলে দুলে হাঁটছিলাম। ফেরার তাড়া থাকলেও এমন নান্দনিকতা থেকে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছিলো না। প্রকৃতি মানুষকে যতটুকু মুগ্ধ করতে পারে এই লেক আমাদেরকে তার থেকে বেশি মুগ্ধ করেছে। লেকের মাঝখানে ক্যাপ্টেন কুক মেমোরিয়াল জেট থেকে পানির ফোয়ারা যেনো আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে। কী যে সুন্দর লাগছিলো!
লেকটি বিশাল, চারদিকে থৈ থৈ করছে পানি। আকাশের রঙ গায়ে মেখে লেকের পানি নীলাভ হয়ে রয়েছে। ইচ্ছে করছিলো সাঁতার কাটতে। গুগল থেকে লেকটির ব্যাপারে কিছু তথ্য খুঁজে নিলাম। লেকটির আয়তন সাড়ে ৬ বর্গকিলোমিটারের মতো। দৈর্ঘ্য প্রায় ১১ কিলোমিটার। লেকের সর্বোচ্চ প্রস্থ ১.২ কিলোমিটার, কোথাও কোথাও মাত্র কয়েকশ’ মিটার। লেকটির গভীরতা গড়ে প্রায় ৪ মিটার, তবে সর্বোচ্চ গভীরতা প্রায় ১৮ মিটার–মানে বেশ গভীর। লেকটিতে পুরো বছরই প্রায় ৩৩ মিলিয়ন ঘনমিটার করে পানি থাকে। লেকটিকে তিনটি অংশে বিভক্ত করে পর্যটকদের ভ্রমনে সুবিধা করা হয়েছে। ইস্ট বেসিন, সেন্ট্রাল বেসিন এবং ওয়েস্ট বেসিন। লেকটির উপর যোগাযোগ এবং সৌন্দর্যের জন্য কমনওয়েলথ এ্যাভিনিউ ব্রিজ এবং কিংস এ্যাভিনিউ ব্রিজ নামের দুইটি নান্দনিক ব্রিজও নির্মাণ করা হয়েছে।
সবকিছু দেখতে দেখতে আমার মনে হচ্ছিলো এই লেকটি ক্যানবেরার সৌন্দর্যের নান্দনিকতাকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং বিনোদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার যে লক্ষ্য নিয়ে ক্যানবেরার প্রাণকেন্দ্রে লেকটি গড়ে তোলা হয়েছিল তা শতভাগই সফল হয়েছে। টলটলে লেকের চারপাশে সাজানো শহরটি যেন লেকের পানিতে নিজেকে প্রতিফলিত করছে।
আরো কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর তারেক ভাই আমাদেরকে বললেন, চলেন, এবার অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্ট হাউস দেখতে যাই। আরে, আসলেই তো। অস্ট্রেলিয়ার রাজধানীতে ঘুরছি, অথচ পার্লামেন্ট হাউসই দেখা হয়নি। তারেক ভাই বললেন, বেশিক্ষণ লাগবে না, কাছেই। আমরা গাড়ি নিয়ে রওয়ানা হলাম।
দূর থেকেই চোখে পড়ল পার্লামেন্ট হাউস। খুবই নান্দনিক একটি স্থাপনা। মনে হচ্ছিলো পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে আয়েশ করছে। বিশাল স্টিলের পতাকাদণ্ডে উড়তে থাকা অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় পতাকা। রাজধানীর কেন্দ্রস্থল ক্যাপিটাল হিলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটি অস্ট্রেলিয়ার গণতন্ত্রের অন্যতম প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
পার্লামেন্ট হাউসের দিকে এগোতে এগোতে সবচেয়ে বিস্ময়কর যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো ভবনটি পাহাড়ের ওপর নির্মিত নয়, বরং পাহাড়ের ভেতরেই যেন মিশে আছে।
ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে জানতে পারলাম, বর্তমান পার্লামেন্ট হাউসটি ৯ মে ১৯৮৮ সালে উদ্বোধন করা হয়। এর আগে ১৯২৭ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত সংসদের কার্যক্রম পরিচালিত হতো পুরোনো পার্লামেন্ট হাউসে। ওটিও খুব কাছে বলে জানালেন তারেক ভাই।
অস্ট্রেলিয়ার নতুন এই পার্লামেন্ট হাউসটি ক্যানবেরার অন্যতম ট্যুরিস্ট স্পট। পার্লামেন্ট হাউজের স্থাপত্য নকশা ও নান্দনিকতা মুগ্ধ হওয়ার মতো। পার্লামেন্ট হাউজে কোন কড়াকড়ি নেই। নেই সৈন্য সামন্ত। যার ইচ্ছে ভিতরে ঢুকছে, যার ইচ্ছে বেরুচ্ছে। সামনে বিশাল সবুজ চত্বর। সেখানে পতপত করে উড়ছে পতাকা। এখানে ওখানে শিশু কিশোর এবং নারী পুরুষ নিজেদের মতো করে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সময় কাটাচ্ছে।
ভেতরে প্রবেশ করে যেন এক বিশাল নগরীর মধ্যে ঢুকে পড়লাম। এই ভবনে ৪,৫০০–এরও বেশি কক্ষ রয়েছে এবং ব্যস্ত অধিবেশন চলাকালে প্রতিদিন ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ মানুষ এখানে কাজ করেন। ভবনটির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ প্রায় ৩০০ মিটার করে, আর মোট আয়তন প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার বর্গমিটার।
ভবনটির নকশা নির্বাচনের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ২৮টিরও বেশি দেশ থেকে ৩২৯টি নকশা জমা পড়েছিল। বিজয়ী নকশাটিই আজকের এই পার্লামেন্ট হাউস। নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৮১ সালে এবং শেষ হতে সময় লাগে প্রায় সাত বছর।
সংসদের দুই কক্ষ, সিনেট ও হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস। ঘুরে দেখার সময় অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের স্পর্শ অনুভব করলাম। ভবনের বিভিন্ন স্থানে দেশটির শিল্প ও সংস্কৃতির অসাধারণ নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে। বিশেষ করে গ্রেট হলের বিশাল ট্যাপেস্ট্রি দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
বিশাল হলরুম, শিল্পসমৃদ্ধ দেয়াল এবং নিখুঁত কাঠের কারুকাজ। শুধু অস্ট্রেলিয়ানই নয়, দুনিয়ার যে কোন দেশের মানুষ ওখানে গেলে পার্লামেন্ট হাউজের ভিতরে প্রবেশ করতে পারে, ঘুরতে পারে। আমার মনে হলো. গণতন্ত্রের প্রতি অস্ট্রেলিয়া যে কতটা শ্রদ্ধাশীল তা এই একটি উদারতার মাধ্যমে মানুষকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে।
ভবনের উপরের ঘাসে ঢাকা অংশে উঠে দাঁড়ালাম। সেখান থেকে পুরো ক্যানবেরা শহরকে এক নজরে দেখা যায়। দূরে পুরোনো পার্লামেন্ট হাউস, প্রশস্ত সড়ক আর সুপরিকল্পিত নগর বিন্যাস–সব মিলিয়ে এক অনন্য দৃশ্য। দূরে পাহাড়, মাঝখানে লেক আর সবুজে ঢাকা শহরটা যেনো একটি পোস্টকার্ড! একেবারে নিখুঁত, সুন্দর। আমার মনে হলো, এই ভবনের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু এর স্থাপত্যে নয়, বরং সেই ধারণায়, যেখানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্রটিও জনগণের নাগালের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। ইতিহাস, স্থাপত্য, শিল্পকলা ও গণতন্ত্র–সবকিছুর এক অপূর্ব মিলনস্থল যেন এই সংসদ ভবন।
রাজা বাদশাহর মতো ঘোরাঘুরি করলাম আমরা। পার্লামেন্টের মেম্বার না হয়েও সর্বত্র চষে বেড়ালাম। ছোটভাই রুবেল, লায়ন বিজয় শেখর দা এবং আমাকে সবকিছু ঘুরিয়ে দেখাতে দেখাতে তারেক ভাই বললেন, এতো কম সময় নিয়ে কেউ বেড়াতে আসে! আজ থাকেন, কাল সকালে আরো অনেককিছু দেখাবো।
বিনীতভাবে নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বললাম, থাকা সম্ভব হবে না। প্রোগ্রাম সেট করা। যা পারেন আজকের মধ্যেই দেখান।
তারেক ভাই আমাদের নিয়ে যাত্রা করলেন। অল্পক্ষণের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম অস্ট্রেলিয়ান ওয়ার মেমোরিয়ালে। তারেক ভাই বললেন, অস্ট্রেলিয়ানদের সবচেয়ে আবেগ এবং ভালোবাসার জায়গা হচ্ছে এই ওয়ার মেমোরিয়াল। এটি শুধু একটি জাদুঘর নয়, বরং যুদ্ধের ইতিহাস, ত্যাগ এবং স্মৃতির এক বিশাল সংগ্রহশালা।
মেমোরিয়ালটি অনেক সুন্দর স্থাপত্যে নির্মাণ করা। ভিতরে প্রবেশের পথটিও বেশ সুন্দর। আমরা ভেতরে প্রবেশ করতেই এক ধরনের নীরবতা অনুভূব করলাম। প্রবেশপথের দেয়ালে জীবনদানকারী সৈনিকদের উদ্দেশ্যে নানা কথা লিখে রাখা হয়েছে। সবগুলোই একজন নিখাদ দেশপ্রেমিকের প্রতি শ্রদ্ধা, নতুন প্রজন্মকে উজ্জীবিত করার বয়ান। একটি কথা মন ছুঁয়ে গেলো, ‘দেয়ার স্প্রিরিট আউয়ার হিস্ট্রি’–তাদের আত্মত্যাগ আমাদের ইতিহাস! যারা দেশের জন্য জীবন দেন, এইটুকু শ্রদ্ধা তাঁরা তো পেতেই পারেন!
বিভিন্ন যুদ্ধে জীবন দেয়া অস্ট্রেলিয়ার সৈনিকদের নাম ব্রোঞ্জের ফলকে খোদাই করা। দেয়াল জুড়ে কেবল নাম আর নাম। যাদের সকলেই বিভিন্ন যুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে জীবন দিয়েছেন। ‘রোল অব অনার’ নামের ওই দেয়ালটিতে হাজার হাজার কৃত্রিম লাল পপি ফুল ঝুলছে। একটি জায়গায় দেখলাম যুদ্ধের ব্যবহৃত বিমান ও ট্যাংক, পুরনো চিঠি এবং আলোকচিত্র। যা দেখে অনেক দর্শনার্থীকে আবেগাপ্লুত হতেও দেখা গেলো। হয়তো তাদের আত্মীয়। কারো বাবা, কারো পুত্র, কারোবা স্বামী। দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। হয়তো আজ তাঁর জন্মদিন, বা অন্য কোন বিশেষ দিনে আত্মীয়রা স্মরণ করতে এসেছেন।
দেয়ালটিতে এক লাখের বেশি সৈনিকের নাম রয়েছে। নিহত সৈনিকদের স্মরণে ব্যবহৃত পপি ফুল এক অনন্য শ্রদ্ধার প্রতীক। লাল পপি ফুল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও কমনওয়েলথ দেশগুলোতে স্মরণ ও শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
তারেক ভাই জানালেন, দর্শনার্থীরা তাঁদের আত্মীয়স্বজন বা কোনো সৈনিকের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নামের পাশে লাল পপি ফুল গুঁজে দেন। যা স্মরণ, আত্মত্যাগ ও শ্রদ্ধার প্রতীক।
মেমোরিয়ালের বিভিন্ন গ্যালারিতে যুদ্ধের ইতিহাস, সৈনিকদের অভিজ্ঞতা এবং সামরিক অভিযানের ওপর ডকুমেন্টারি ও মাল্টিমিডিয়া ভিডিও প্রদর্শন করা হয়। পুরো দেয়ালজুড়ে যেনো টিভি চলছে। বড় পর্দায় যুদ্ধক্ষেত্রের ফুটেজ, সাক্ষাৎকার এবং ইন্টারঅ্যাকটিভ ভিডিও উপস্থাপন করা হয়। যা দর্শনার্থীদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বুঝতে সাহায্য করে। একেবারে নিখাদ যুদ্ধক্ষেত্রের আবহ।
খবর নিয়ে জানা গেলো, প্রতিদিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে লাস্ট পোস্ট সিরমিন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে একজন শহীদ সৈনিকের জীবনের গল্প উপস্থাপন করা হয়। ওখানে ওই সৈনিকের পরিবারের সদস্যদের বিশেষ মর্যাদায় বসানো হয়। অনুষ্ঠানটি সরাসরি অনলাইনেও সমপ্রচার করা হয়। অস্বাভাবিক নীরবতায় অত্যন্ত সম্মানের সাথে ওই সৈনিকের জীবনের গল্প শুনেন দর্শকেরা। বিকেলে ওয়ার মেমোরিয়াল দেখতে আসায় এই ধরনের একটি অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ হয়ে গেলো। যেখানে ইতিহাসকে ধারণ এবং সম্মান জানানো হচ্ছিলো। (চলবে)।
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।











