কক্সবাজারের চকরিয়ায় মাতামুহুরী নদী, বিভিন্ন ছড়াখাল থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, সংরক্ষিত বনের পাহাড় সাবাড়সহ নানা কায়দায় পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। একইসাথে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে দখল করে নেওয়া হচ্ছে সংরক্ষিত বনভূমির সমতল, টিলা শ্রেণির জায়গাও।
সরেজমিন দেখা গেছে, দখলে নেওয়ার পর সেখানে রাতারাতি গড়ে তোলা হচ্ছে অবৈধ বসতবাড়িও। কোথাও কোথাও বনবিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা–কর্মচারীদের ম্যানেজ করে আবার ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা প্রভাব খাটিয়ে এই দখলদারিত্ব চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বনবিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, গত দুইমাস ধরে সংরক্ষিত বনের জায়গার ওপর দখলদারদের চোখ রাঙানি চলছে। যেখানেই এই অপতৎপরতা চালানো হচ্ছে, সেখানেই সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে নির্মিত অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়ে পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে সংরক্ষিত বনভূমি। এরপরও থামানো যাচ্ছে না সংরক্ষিত বনভূমির দখলদারিত্ব। সরজমিন ঘুরে এবং খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের পাঁচটি বনবিট কার্যালয় তথা মানিকপুর, কাকারা, নলবিলা, ফাঁসিয়াখালী ও ডুলাহাজারা বনবিটের নিয়ন্ত্রণাধীন সংরক্ষিত বনের ভেতর সমতল ও টিলা শ্রেণির বনভূমির ওপর দখলদারিত্ব চালানো হচ্ছে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী দুর্বৃত্তরা এসব বনবিটের জায়গা দখলে নিয়ে প্লট আকারে মৌখিকভাবে বিক্রি করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। আর সেখানে রক্ষিত বনের গাছপালা উজাড়ের পর রাতারাতি গড়ে তোলা হচ্ছে অবৈধ বসতি, মুরগীর ফার্মসহ বিভিন্ন স্থাপনা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের একাধিক সচেতন বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন, ফাঁসিয়াখালী বনবিটের উচিতার বিল মৌজায় গত দুইমাস ধরে দখলদারিত্ব চলছে বনভূমিতে। ওই বিটের নিয়ন্ত্রণাধীন সংরক্ষিত বনভূমি রক্ষাসহ দেখভাল করার জন্য বিট কর্মকর্তা এবং বেশকিছু কর্মচারী (ফরেস্ট গার্ড) থাকলেও তারা কুম্ভকর্ণের ভূমিকায় অবতীণ রয়েছেন। প্রভাবশালী দখলদারদের সঙ্গে সখ্যতা থাকা এবং মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে অনেক ক্ষেত্রে বনবিভাগের কর্মকর্তারা সংরক্ষিত বনভূমির দখল ঠেকাতে তেমন তৎপর থাকেন না। আবার কোথাও কোথাও বনবিভাগের কর্মকর্তা–কর্মচারীরা অবৈধ দখল ঠেকাতে গেলে হামলাসহ জান–মাল (অস্ত্রসহ সরকারি সম্পত্তি) হারানোর ভয় থাকায় দেখেও চুপচাপ থাকছেন। এক্ষেত্রে বনবিভাগের লোকজনের বর্তমান পরিস্থিতি হচ্ছে, ‘পা ভাঙা মুরগি যেমন শিয়ালের কাছে অসহায়, তেমনি অবস্থায় রয়েছেন বনকর্মীরা’।
ফাঁসিয়াখালী বনবিট কর্মকর্তা খসরুল আমিন দৈনিক আজাদীকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে প্রভাবশালী ও উচ্ছৃক্সখল শ্রেণির দখলবাজরা বিটের উচিতারবিল মৌজার উচিতারবিল, ফইত্যার ঘোনা, নয়াপাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে সংরক্ষিত বনভূমির টিলা ও সমতল শ্রেণির বিপুল পরিমাণ জায়গা দখলে নিয়ে সেখানে রাতারাতি গড়ে তোলা হয়েছিল অবৈধ বসতিসহ বিভিন্ন স্থাপনা। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের লিখিতভাবে অবহিত করার পর নির্দেশনা মোতাবেক পুলিশের সহায়তা নিয়ে বনবিভাগের কর্মকর্তা–কর্মচারীরা সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় বনের জায়গা থেকে বসতিসহ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে দিয়ে দখল পুনরুদ্ধার করা হয় তিন একরের বনভূমি।
কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের পাঁচটি বিটের মধ্যে তিনটি বিটের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভাষ্য হচ্ছে– আমাদের পক্ষ থেকে সরকারের বনভূমিসহ বনজসম্পদ রক্ষায় প্রতিনিয়ত সচেষ্ট রয়েছি। কোথাও বনভূমি দখল করে অবৈধ বসতি স্থাপন করা হচ্ছে খবর পেলেই অভিযান চালানো হচ্ছে। এমনকি বনভূমির অবৈধ দখলবাজ বা স্থাপনা নির্মাণকারীর নাম–ঠিকানা সংগ্রহ করে তাদের বিরুদ্ধে বন আইনে মামলা রুজু করা হচ্ছে। তবে জনবল স্বল্পতারও সুযোগ নিচ্ছে অবৈধ দখলদারেরা। এক্ষেত্রে সরকারি দলের সিনিয়র নেতাদের এই বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। যোগ করেন তারা।
ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাদেকুর রহমান দৈনিক আজাদীকে বলেন, সংরক্ষিত বনভূমির ওপর দখলবাজদের লোলুপ দৃষ্টি বেড়ে যাওয়াসহ তাদের চোখ রাঙানিতে অতীষ্ট বনবিভাগ। এজন্য সকল বিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে প্রতিনিয়ত তাগাদা দেওয়া হয় সংরক্ষিত বনের জমির দখল ঠেকাতে। পাশাপাশি কোথাও বনভূমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা হলে উপজেলা প্রশাসন এবং পুলিশের সহায়তা নিয়ে সাঁড়াশি অভিযান জোরদার করা হয়।
এ ব্যাপারে কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের বিভাগীয় বনকর্মকর্তা (ডিএফও) মো. মারুফ হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, বনজসম্পদ রক্ষাসহ সংরক্ষিত বনভূমির দখল ঠেকাতে বনকর্মী এবং সিপিজি দলের সদস্যদের নিয়োজিত করা হয়েছে। তারা প্রতিনিয়ত টহল ব্যবস্থা জোরদার করেছে। যত বড় প্রভাবশালী বা প্রতাপশালী দখলবাজ হোক কাউকে ছাড় না দিতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে অধস্তন কর্মকর্তাসহ বিট কর্মকর্তাদের।














