আধুনিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারে সক্ষম করে মানবসম্পদ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বর্তমান সরকার মেধানির্ভর, আত্মবিশ্বাসী, সৃজনশীল ও দায়িত্ববান মানবসম্পদ গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে মেধাভিত্তিক, স্বচ্ছ, দক্ষ ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
গত শনিবার সকালে বিয়াম ফাউন্ডেশনের ট্রেনিং কাম ডরমিটরি ভবনের উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (বিয়াম) ১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করেছিল। এরপর ২০০২ সালের নভেম্বর মাসে এটি বিয়াম ফাউন্ডেশনে রূপান্তরিত হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিয়ামের প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত অগ্রযাত্রার দিন–তারিখগুলো প্রমাণ করে, দেশ ও জনগণের স্বার্থে বিএনপি সরকার বরাবরই একটি সুদক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনপ্রশাসন দেখতে চেয়েছে এবং ভবিষ্যতেও দেখতে চায়। সুতরাং আজ বিয়াম ফাউন্ডেশনের ট্রেনিং কাম ডরমিটরি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শুধু একটি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন নয়; বরং এটি প্রশাসনিক সক্ষমতার উন্নয়ন, প্রশাসনিক নেতৃত্ব গঠন এবং মানবসম্পদ বিকাশের একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের প্রতিফলন।’ তিনি বলেন, ‘বিয়াম দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। আজ যে ট্রেনিং কাম ডরমিটরি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হচ্ছে, তা ভবিষ্যতের প্রশাসনিক নেতৃত্ব গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই ভবন শুধু একটি অবকাঠামো নয়; এটি হয়ে উঠুক জ্ঞানচর্চা, নেতৃত্ব বিকাশ এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের একটি প্রাণবন্ত কেন্দ্র।’
আসলে সরকার সারাদেশের শিক্ষিত বেকারদের বেকারত্ব দূর করতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছে। দেশের জন্য মানব সম্পদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্পদকে কাজে লাগাতে না পারলে তা অভিশাপে পরিণত হয়। বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। দেশের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য এবং দেশের উন্নয়নে তাদের মেধাকে কাজে লাগাতে তাদেরকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, দক্ষ মানবসম্পদ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে এক নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। যখন কোনো দেশের বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা যায়, তখন তারা প্রাকৃতিক ও মূলধনী সম্পদের সঠিক ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়াতে পারে। যা বেকারত্ব দূর করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিকে টেকসই ও শক্তিশালী করে তোলে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে বস্তুগত সম্পদের চেয়ে মেধাসম্পদ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই অর্থনীতির প্রতিটি খাতের জন্য মেধাভিত্তিক মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক বিশ্বে মেধাভিত্তিক সম্পদ যাদের বেশি রয়েছে তারা কৃষি, শিল্প, ব্যবসা–বাণিজ্য, সেবাসহ সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে। যার কারণে অনেক শিল্পোন্নত দেশের কৃষি উৎপাদন কৃষিভিত্তিক দেশের তুলনায় বেশি হয়ে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ৩৭ শতাংশ অবদান রাখছে মেধাভিত্তিক সম্পদ। বর্তমানে চীন ও ভারত মেধাভিত্তিক সম্পদ গড়ে তোলার জন্য জাতীয় পর্যায়ে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। এক্ষেত্রে বেশ খানিকটা পিছিয়ে বাংলাদেশ। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক এবং যুগোপযোগী করা দরকার।
বিশ্লেষকরা জানান, দেশে মানবসম্পদের ৯০ শতাংশই এখনো কায়িক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। তাদের যদি মেধাভিত্তিক সম্পদে পরিণত করা যায়, তাহলে সত্যিকার টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। এজন্য প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত আমূল পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। শিক্ষার মূল লক্ষ্য হবে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। যদিও দেশে উচ্চশিক্ষার সঙ্গে সৃজনশীলতা বাড়ানোর কোনো সংযোগ নেই। যার কারণে উচ্চশিক্ষার হার বাড়লেও মেধাবী মানবসম্পদের পরিমাণ বাড়ছে না।
তাঁরা বলেন, বাংলাদেশে ডিজিটাল রূপান্তরে যাওয়ার পথে বড় বাধা ও কঠিন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে– আধুনিক প্রযুক্তি ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল তৈরি না হওয়া, শিক্ষাব্যবস্থাকে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ঢেলে সাজানোর অভাব, সঠিক দক্ষতা বা প্রশিক্ষণের অভাব, কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ এবং বেকারত্ব। এছাড়া মেধাভিত্তিক সম্পদ তৈরি ও শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ার প্রয়োজনীয়তাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে রয়েছে প্রচলিত ও বিদ্যমান আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। এসব চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে সরকারি–বেসরকারি খাতে সমন্বিত উদ্যোগ, বৈশ্বিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে ১৫–২০ বছরের জন্য কর্মকৌশল নির্ধারণ, কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু এবং একটি স্থায়ী আন্তঃমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স গঠনের ওপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। আসলে দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া কর্মসংস্থান সম্ভব নয়। টেকসই এবং অর্থনৈতিক উপকারীতামুখী কর্মসংস্থান দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া সম্ভব না।










