কক্সবাজারের টেকনাফে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে তিনজনের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের উত্তর শীলখালী এলাকার গহিন পাহাড় থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন, টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শীলখালী গ্রামের নুরুল কবিরের ছেলে মুজিবুর রহমান (৩৫), রুহুল আমিনের ছেলে আমিনুল ইসলাম রবি (২০) এবং মৃত নুরুল ইসলামের ছেলে নুরুল বশর ওরফে কালানি (২৫)।
পুলিশ জানায়, উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে একজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। গুরুতর আহত অবস্থায় অপর দুজনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়। নিহতদের মুখমণ্ডল ও শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, নিহতরা ডাকাত। তারা অপহরণ ও মানবপাচারের জড়িত ছিল। দু’জন প্রকাশ্যে মানবপাচার ও অপহরণে জড়িত ছিলেন। বিষয়টি এলাকায় প্রকাশ্য থাকলেও ভয়ের কারণে কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলতেন না। পুলিশ বলছে, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ভাগ–বাটোয়ারার দ্বন্দ্ব বা অপহরণ সংক্রান্ত বিরোধের জেরে তাদের হত্যা করা হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, মঙ্গলবার সকাল ৮টার দিকে শাহেনা আক্তার নামের এক নারী তার স্বামী নুরুল বশর ওরফে কালানির খোঁজে বের হয়ে পাহাড়ের ভেতরে রক্তাক্ত অবস্থায় তিনজনকে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে স্থানীয়দের মাধ্যমে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। ঘটনাস্থল নিহতদের বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। উদ্ধারকালে দা, লাঠি ও ছুরি পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
ঘটনার রহস্য যেখানে : স্থানীয় একাধিক লোকজন দাবি করছেন, গত ১৮ এপ্রিল নিহত ডাকাত মুজিবুর রহমানের স্ত্রী রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে কৌশলে ৫ জন রোহিঙ্গাকে ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে বাহারছড়ার পাহাড়ের পাদদেশে নিয়ে আসেন। সেখানে আগে থেকেই ওঁত পেতে থাকা অপহরণকারী ‘মোর্শেদ গ্রুপ’–এর সদস্যরা তাদের হাত–পা বেঁধে গহীন পাহাড়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এসময় ৫ জনের মধ্যে একজন কৌশলে পালিয়ে গিয়ে গ্রামের একটি মসজিদে আশ্রয় নিলেও বাকিদের অস্ত্র ঠেকিয়ে পাহাড়ে তুলে নিয়ে যায় মুজিব ও মোর্শেদ। পরদিন ১৯ এপ্রিল, মুজিবের স্ত্রী একইভাবে আরও ৩ জন রোহিঙ্গাকে কৌশলে অপহরণের উদ্দেশ্যে একই স্থানে নিয়ে আসে। ২০ এপ্রিল দিনগত সারারাত অপহৃতদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালায় চার অপহরণকারী– মুজিব, নূরুল বশর, মোর্শেদ ও রবি আলম। অপহৃতদের কাছে কাছে মোটা অংকের মুক্তিপণ দাবি করা হয়। নির্যাতনের এক পর্যায়ে ফজরের আজানের পর অপহরণকারী মুজিব, নূরুল বশর ও রবি আলম ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। ঠিক তখনই সুযোগ কাজে লাগায় অপহৃতরা। ভাগ্যক্রমে এক ভুক্তভোগী তার হাতের বাঁধন খুলে ফেলতে সক্ষম হন। নিজের এবং সঙ্গীদের জীবন বাঁচাতে তিনি ঘুমন্ত তিন অপহরণকারীর মাথায় ভারী বস্তু দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এরপর দ্রুত তারা পাহাড় ত্যাগ করেন। তবে এসব তথ্য সম্পর্কে নিশ্চিত নয় পুলিশ।
নিহত আমিনুল ইসলাম রবির বাবা রুহুল আমিন বলেন, রাতে মুজিব আমার ছেলেকে ডেকে নিয়ে যায়। সকালে পাহাড়ে লাশ পড়ে থাকার খবর পেয়ে গিয়ে ছেলেকে রক্তাক্ত অবস্থায় পাই। বাহারছড়া ইউপি চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন খোকন বলেন, মরদেহগুলোর শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাত এবং মাথায় জখমের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অপহরণ ও মানবপাচার সংক্রান্ত কারণে এ ঘটনা ঘটতে পারে।
এ ব্যাপারে টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, নিহতদের বিরুদ্ধে এসব কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তবে তদন্তের মাধ্যমে সবকিছু যাচাই করা হচ্ছে। অনেকে অনেক কথা বলছে; সব সামনে রেখে তদন্ত করা হচ্ছে।














