চসিকের নিজের ঘরেই চোর!

বিদ্যুতের পোল চুরি করেন চসিকের বৈদ্যুতিক সহকারী শিমুল ভৌমিক, ১৬ দিন পর ভয়ে ফেরত দেন । তদন্ত প্রতিবেদন জমা, ৬টি পর্যবেক্ষণ, নেওয়া হবে বিভাগীয় ব্যবস্থা

মোরশেদ তালুকদার | মঙ্গলবার , ২৫ আগস্ট, ২০২৬ at ৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ

নগরের বায়েজিদ বোস্তামী সড়ক থেকে গায়েব হয়ে যায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) চারটি বৈদ্যুতিক পোল। ঘটনার ১৪ দিন পর এটিকে ‘চুরি’ উল্লেখ করে থানায় জিডি ও তদন্ত কমিটি গঠন করে চসিক। কিন্তু সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করতে বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল, যা দেখে চক্ষু চড়কগাছ চসিক প্রশাসনের। কারণ কোনো বহিরাগত পেশাদার চোর বা অপরাধী চক্র নয়, চুরির আসল নায়ক চসিকের বিদ্যুৎ উপবিভাগের বৈদ্যুতিক সহকারী শিমুল ভৌমিক। নিজের পদবি ব্যবহার করে রাতের আঁধারে শ্রমিক লাগিয়ে পোলগুলো সরিয়ে নেন তিনি। নিজের ঘরেই চোর দেখে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের অবস্থা এখন ‘সর্ষের ভেতরের ভূত’ ধরার মতো।

জানা গেছে, বায়েজিদ বোস্তামী ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন স্টারশিপ ব্রিজ এলাকায় পোল চুরির বিষয়টি নজরে এলে গত ৩০ জুলাই বায়েজিদ বোস্তামী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করে চসিক। এরপর ১৩ আগস্ট আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে কুলসুমকে আহ্বায়ক ও নির্বাহী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) মুহাম্মদ শাফকাত বিন আমিনকে সদস্য সচিব করে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্য হলেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ শাহরিয়ার মুক্তার। গতকাল সোমবার কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে চুরির সঙ্গে শিমুল ভৌমিকের জড়িত থাকার বিষয়টি উঠে আসে। প্রতিবেদনে ৬টি পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়। এ বিষয়ে চসিকের সচিব মো. আশরাফুল আমিন আজাদীকে বলেন, অভিযুক্ত শিমুল ভৌমিকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

লোভে চুরি, ভয়ে ফেরত : তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থলের পার্শ্ববর্তী একটি কারখানার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখতে পায়, ১৬ জুলাই সন্ধ্যা ৭টা ২২ থেকে ৭টা ৩৯ মিনিট পর্যন্ত সময়ে শিমুল ভৌমিকের উপস্থিতিতে ৪৫ জন লোক পোলগুলো সরিয়ে নিচ্ছে।

এদিকে তদন্ত কমিটিকে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক লিখিত বক্তব্যে শিমুল ভৌমিক জানান, তিনি বায়েজিদ বোস্তামী সড়ক হয়ে যাতায়াত করেন। পোলগুলো বহুদিন ধরে স্টারশিপ ব্রিজের পাশে পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। লোভের বশবর্তী হয়ে পাশেই চলমান একটি ব্রিজের শ্রমিক দিয়ে চারটি পোল লোকচক্ষুর আড়ালে কিছুটা দূরে সরিয়ে রাখেন।

এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি তাদের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, শিমুল নিজ পরিচয় ব্যবহার করে নির্মাণাধীন ব্রিজের শ্রমিকের মাধ্যমে চারটি পোল পূর্বে রক্ষিত স্থান হতে অন্য স্থানে সরিয়ে নেন। পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোল চুরির বিষয়টি আলোচিত হলে তিনি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। এরপর প্রায় ১৬ দিন পর ২ আগস্ট দামপাড়া চসিক বিদ্যুৎ অফিসে পোলগুলো জমা দিয়ে যান এবং ২ নং অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) ফখরুল ইসলামকে অবহিত করেন। তবে এ নির্বাহী প্রকৌশলী অন্য অঞ্চলের দায়িত্ব পালন করায় পোল চুরির বিষয়ে অবগত ছিলেন না। তাই তিনি পোলগুলো শিমুল ভৌমিক থেকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেন।

এদিকে সার্বিক বিষয়ে তদন্ত কমিটি মন্তব্য করে, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নিয়মিত নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা মেরামতের কাজ করে থাকে। কাজ চলাকালীন মূল্যবান সম্পদ সর্বসাধারণের ব্যবহার্য স্থানে না রেখে সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন নিকটবর্তী কোনো দপ্তরে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এই ধরনের সম্পদ সাময়িকভাবে সর্বসাধারণের ব্যবহার্য স্থানে রাখার প্রয়োজন হলে তা নির্দিষ্ট কর্মচারীর হেফাজতে রাখা এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেতে পারে। নির্মাণ কিংবা রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিয়োজিত কর্মচারীদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং একই সাথে নিজস্ব সম্পদ রক্ষায় সিটি কর্পোরেশনের কর্মচারীদের আরো আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন বলে কমিটির নিকট প্রতীয়মান হয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধহাই কোর্টে অধ্যক্ষসহ দুজনের ফাঁসি বহাল, ৪ জনের যাবজ্জীবন
পরবর্তী নিবন্ধএসএসসির সূচি প্রকাশ, শুরু ১৪ মার্চ