একটি পাহাড় কাটার শব্দ খুব বেশি দূর যায় না। মেশিন চলে, মাটি সরে, গাছ পড়ে তারপর আবার শহরের কোলাহলে সব ঢেকে যায়। যে মানুষটি পাহাড়ের পাশে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখে, তার কাছেও ঘটনাটি হয়তো আর দশটি নির্মাণকাজের মতোই মনে হয়। কিন্তু পাহাড়ের ক্ষত কখনো শুধু পাহাড়ের গায়ে থাকে না। তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পানি প্রবাহে, মাটির স্থিতিশীলতায়, নগরের পরিবেশে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন ও নিরাপত্তায়। তাই চট্টগ্রামের পাহাড় নিয়ে প্রশ্নটি এখন আর কেবল ‘পাহাড় কাটা হচ্ছে কেন’ এখানেই শেষ নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি উন্নয়নের নামে ধীরে ধীরে একটি শহরের প্রাকৃতিক নিরাপত্তাব্যবস্থাই সরিয়ে ফেলছি? চট্টগ্রামের পরিচয় তার পাহাড়, সমুদ্র, নদী ও সমতলের সম্মিলিত ভূপ্রকৃতিতে। কিন্তু শহর যত বড় হয়েছে, জমির চাহিদা যত বেড়েছে, ততই পাহাড়কে দেখা হয়েছে সহজলভ্য জমি হিসেবে। একটি পাহাড় মানে কারও কাছে সৌন্দর্য, কারও কাছে পরিবেশ, আবার কারও কাছে সম্ভাব্য প্লট। এখানেই সংঘাতের শুরু। ২০২৪ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যের বরাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে গত পাঁচ দশকে চট্টগ্রামে অন্তত ৩০টি আবাসন প্রকল্প পাহাড় সমতল করার কথা বলা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে একটি গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে শহরের প্রায় ২০০ পাহাড়ের মধ্যে প্রায় ১২০টি হারিয়ে যাওয়ার তথ্যও উঠে আসে। পাহাড়ের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন উৎসে পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় নিয়ে সংশয় কম চট্টগ্রামের ভূপ্রকৃতি বদলেছে। আর এখানেই আমাদের আত্মসমালোচনার প্রয়োজন। একটি শহরের পাহাড় কমে যাচ্ছে এটি কি উন্নয়নের সাফল্য, নাকি পরিকল্পনার ব্যর্থতা? পাহাড় হারায় একটু একটু করে পাহাড় ধ্বংসের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো এটি সাধারণত দৃশ্যমান কোনো বিস্ফোরণের মতো ঘটে না। প্রথমে কয়েক হাত মাটি কাটা হয়। তারপর রাস্তা। তারপর গাছ। তারপর দেয়াল। তারপর বাড়ি। তারপর আরেকটি বাড়ি। একসময় মানুষ ভুলেই যায় সেখানে পাহাড় ছিল। অর্থাৎ পাহাড় হারানোর গল্প শুরু হয় পাহাড় হারানোর অনেক আগেই। এই কারণে পাহাড় রক্ষার নীতিও হওয়া উচিত ভিন্ন। পাহাড় সম্পূর্ণ কেটে ফেলার পর অভিযান চালিয়ে লাভ কম। তখন ক্ষতি হয়ে গেছে। প্রয়োজন হলো পাহাড়ের শরীরে প্রথম পরিবর্তনটি শনাক্ত করা। প্রশ্ন হওয়া উচিত কোন পাহাড়ের উচ্চতা কমছে? কোন ঢাল বদলাচ্ছে? কোথায় গাছ সরছে? কোথায় নতুন রাস্তা তৈরি হচ্ছে? কোথায় ভূমির ব্যবহার বদলাচ্ছে? আমরা যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সময়মতো না খুঁজি, তাহলে একদিন শুধু পুরোনো মানচিত্রে পাহাড় খুঁজে পাওয়া যাবে। আইন আছে, কিন্তু পাহাড় কি আইনের সুরক্ষা পাচ্ছে? বাংলাদেশে পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে আইন আছে। ইঁরষফরহম ঈড়হংঃৎঁপঃরড়হ অপঃ, ১৯৫২–এর ৩ঈ ধারায় অনুমোদন ছাড়া পাহাড় কাটা বা সমতল করার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনেও পাহাড় ও টিলা কাটার বিষয়ে বিধিনিষেধ আছে। অর্থাৎ সমস্যাটি আইনশূন্যতার নয়। তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা সম্ভবত আইন আর বাস্তবতার মধ্যকার দূরত্বে। ২০২৬ সালে চট্টগ্রামের জামালখানের ‘জয় পাহাড়ে’ প্রায় ৯ হাজার ৬০০ ঘনফুট পাহাড়ি মাটি অপসারণের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্মাণকাজের প্রয়োজনে পাহাড়ের ঢালে রিটেইনিং ওয়াল তৈরির জন্য মাটি কাটা হয়েছিল। সেপ্টেম্বরে খুলশীর রূপসী হাউজিং সোসাইটি এলাকায় পাহাড় কাটার অভিযোগে মামলাও হয়েছে। সেখানে কাটা মাটির পরিমাণ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অমিল দেখা গেছে কোথাও প্রায় ২০ হাজার, কোথাও প্রায় ৪০ হাজার ঘনফুট। এই অমিলও ছোট বিষয় নয়। কারণ পরিবেশ রক্ষায় পরিমাপের নির্ভুলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কত মাটি কাটা হয়েছে, কীভাবে মাপা হয়েছে, কোথা থেকে কাটা হয়েছে এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ক্ষতির প্রকৃতি। কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো জরিমানা দিয়ে কি পাহাড়ের ক্ষত পূরণ হয়? একটি পাহাড় কেটে ১০ লাখ টাকা জরিমানা দিলে পাহাড়টি কি আগের অবস্থায় ফিরে আসে? একটি ঢাল কেটে মামলা হলে ঢালের স্থিতিশীলতা কি ফিরে আসে? একটি গাছ কেটে পরে আরেকটি গাছ লাগালে একই পরিবেশগত ভূমিকা কি সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে পাহাড় রক্ষার নীতিতে শুধু জরিমানা ও মামলা যথেষ্ট হতে পারে না। পাহাড় কাটার পর যে বিপদ আসে তা হল পাহাড়ের সঙ্গে বৃষ্টির সম্পর্ক সরাসরি। ঢাল বদলে গেলে, গাছপালা কমে গেলে এবং পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হলে ঝুঁকি বাড়ে। চট্টগ্রামের অতীতের ভূমিধসের আলোচনায় পাহাড় কাটা, বন উজাড়, অপরিকল্পিত বসতি এবং ভারী বৃষ্টিকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তাই পাহাড় কাটা আসলে ভবিষ্যতের একটি বিপদকে আমন্ত্রণ জানানো। আজ যে মাটি সরানো হলো, কাল সেই মাটি বৃষ্টির সঙ্গে নেমে আসতে পারে। আজ যে পানি চলাচলের পথ বন্ধ হলো, কাল সেটি জলাবদ্ধতার কারণ হতে পারে। আজ যে ঢাল দুর্বল হলো, কাল সেটিই ভূমিধসের উৎস হতে পারে। অর্থাৎ পাহাড় ধ্বংসের ক্ষতি সবসময় তাৎক্ষণিক নয়। অনেক ক্ষতি সময় নিয়ে প্রকাশ পায়। এ কারণেই পাহাড় রক্ষার অর্থ কেবল পাহাড়ের সৌন্দর্য রক্ষা নয়। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষদের নিয়ে আমাদের আলোচনায় একটি বিপজ্জনক সরলীকরণ আছে। বলা হয় তারা পাহাড় দখল করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তারা সেখানে গেল কেন? নগরে সস্তা আবাসনের অভাব কি নেই? জমির দাম কি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে? শহরে কাজের সুযোগ কি কেবল পরিকল্পিত আবাসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? নিরাপদ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা কি আছে? অতএব পাহাড়ের পাশে বসবাসকারী দরিদ্র মানুষকে সরিয়ে দিলেই পাহাড় রক্ষা হবে এ ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। মানুষকে নিরাপদ আবাসন না দিলে সে অন্য কোনো ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় যাবে। পাহাড় রক্ষা করতে হলে তাই একই সঙ্গে মানুষকেও রক্ষা করতে হবে। প্রয়োজন ঝুঁকি মানচিত্র, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, পরিকল্পিত পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি আবাসন নীতি। চট্টগ্রামের পাহাড় নিয়ে আলোচনায় জঙ্গল সলিমপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ২০২৬ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে সেখানে পাহাড়, বনভূমি, বসতি, রাস্তা ও বাণিজ্যিক স্থাপনার বিস্তার নিয়ে নানা তথ্য উঠে এসেছে। কিন্তু এখানেও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। সংবাদে অভিযোগ প্রকাশিত হওয়া আর আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। সুতরাং পাহাড় রক্ষার আন্দোলনকে শক্তিশালী করতে হলে অভিযোগের চেয়ে প্রমাণকে বড় করতে হবে। কার জমি? জমির শ্রেণি কী? অনুমোদন কী? পরিবেশগত ছাড়পত্র আছে কি? অনুমোদিত সীমা কত? বাস্তবে পরিবর্তন কত? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া পাহাড় নিয়ে যে কোনো বিতর্ক সহজেই আবেগের বিতর্কে পরিণত হতে পারে। চট্টগ্রামের প্রতিটি পাহাড়ের একটি ডিজিটাল রেকর্ড থাকা উচিত। কোথায় পাহাড়? তার উচ্চতা কত? আয়তন কত? জমির মালিকানা কী? কোন অংশ ঝুঁকিপূর্ণ? কোন অংশ সংরক্ষণযোগ্য? দশ বছর আগে তার অবস্থা কী ছিল? আজ তার অবস্থা কী? এই তথ্যগুলো এক জায়গায় থাকলে পাহাড় কাটার ঘটনা ঘটার পর তদন্ত করার পরিবর্তে পরিবর্তন ঘটার সময়ই সতর্ক হওয়া সম্ভব। পুরোনো মৌজা ম্যাপ, ভূমির রেকর্ড, স্যাটেলাইট ছবি ও বর্তমান ভূপ্রকৃতির তুলনা করে একটি প্রকাশ্য ‘আগে ও এখন’ মানচিত্র তৈরি করা যেতে পারে। প্রতিটি পাহাড়ের জন্য তৈরি হতে পারে একটি পরিবর্তনের টাইমলাইন। এটি কোনো বিলাসিতা নয়। চট্টগ্রামের মতো পাহাড়–সমুদ্র–নদীঘেরা নগরের জন্য এটি নগর নিরাপত্তার মৌলিক অবকাঠামো হওয়া উচিত। পাহাড় কাটার সময় আমরা পাহাড়ের দিকে তাকাই। কিন্তু কাটা মাটি কোথায় যায় এই প্রশ্নটি প্রায় অনুপস্থিত। নিচু জমি ভরাট হয়? কোনো আবাসন প্রকল্পে যায়? রাস্তা নির্মাণে ব্যবহৃত হয়? বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হয়? এই প্রশ্নের উত্তর ছাড়া পাহাড় কাটার অর্থনৈতিক চক্র বোঝা অসম্ভব। কারণ পাহাড় কাটা যদি কোনো অর্থনৈতিক লাভের অংশ হয়, তাহলে শুধু পাহাড়ে গিয়ে অভিযান চালিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। সেই অর্থনৈতিক চেইনও বুঝতে হবে। আমাদের উন্নয়নের সংজ্ঞা বদলাতে হবে। আমরা উন্নয়নকে খুব সহজে কংক্রিট দিয়ে মাপি। নতুন রাস্তা হয়েছে উন্নয়ন। নতুন ভবন হয়েছে উন্নয়ন। নতুন আবাসন হয়েছে উন্নয়ন। কিন্তু একটি পাহাড় হারিয়েছে এটিও কি উন্নয়নের হিসাবের অংশ? উন্নয়ন যদি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা কমিয়ে দেয়, তাহলে সেই উন্নয়নের হিসাব নতুন করে করা প্রয়োজন। চট্টগ্রামের প্রয়োজন এমন উন্নয়ন, যা শহরকে বড় করবে কিন্তু পাহাড়কে শত্রু বানাবে না। এখন সিদ্ধান্তের সময় ২০২৬ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় পাহাড় ও টিলার বর্তমান অবস্থা মূল্যায়নের জন্য বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠনের সিদ্ধান্তের কথা এসেছে। ঝুঁকিপূর্ণ বসতি শনাক্তকরণ ও পাহাড়কাটা বন্ধে অভিযান জোরদারের কথাও সামনে এসেছে। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো এই উদ্যোগ যেন আরেকটি কমিটির ফাইল হয়ে না থাকে। তার ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। মানুষকে জানতে দিতে হবে চট্টগ্রামে কত পাহাড় আছে, কত পাহাড় হারিয়েছে, কত পাহাড় ঝুঁকিতে এবং কোথায় কী ধরনের ভূমি ব্যবহার অনুমোদিত। কারণ যে পাহাড়ের তথ্য রাষ্ট্রের কাছে নেই, সেই পাহাড়কে রাষ্ট্র কীভাবে রক্ষা করবে? এখন আর শুধু পাহাড় কাটার পর অভিযান নয়। প্রয়োজন পাহাড় কাটার আগেই শনাক্তকরণ। প্রয়োজন পাহাড়ের ডিজিটাল মানচিত্র। প্রয়োজন ভূমি ব্যবহারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ। প্রয়োজন মামলা থেকে রায় পর্যন্ত নজরদারি। প্রয়োজন ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের নিরাপদ পুনর্বাসন। আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন উন্নয়ন সম্পর্কে আমাদের চিন্তার পরিবর্তন। কারণ একটি পাহাড় শুধু কয়েক হাজার ঘনফুট মাটি নয়। একটি পাহাড় একটি শহরের প্রাকৃতিক ঢাল। পানি ব্যবস্থাপনার অংশ। জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়। নগরের ভূপ্রকৃতির অংশ। এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষের জীবন রক্ষার প্রাকৃতিক দেয়াল। তাই প্রশ্নটি এখন আর কেবল পাহাড় কাটা হচ্ছে কেন? প্রশ্ন হলো আমরা কি এমন একটি শহর তৈরি করছি, যেখানে ভবন থাকবে কিন্তু পাহাড় থাকবে না; রাস্তা থাকবে কিন্তু প্রাকৃতিক পানি চলাচলের পথ থাকবে না; জমির দাম বাড়বে কিন্তু মানুষের নিরাপত্তা কমবে? চট্টগ্রামের পাহাড় হয়তো একদিনে হারিয়ে যাবে না। একটু একটু করে হারাবে। একটি গাছ, একটি ঢাল, একটি রাস্তা, একটি প্লট, একটি ভবন। তারপর একদিন পুরোনো কোনো ছবিতে আমরা পাহাড়টিকে খুঁজব। সেদিন হয়তো বুঝব পাহাড়টি সেদিন হারায়নি। তার মৃত্যু শুরু হয়েছিল সেই দিন, যেদিন আমরা প্রথম মেশিনের শব্দ শুনেও তাকে শুধু ‘নির্মাণকাজের শব্দ’ ভেবেছিলাম। সুতরাং চট্টগ্রামের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন পাহাড়কাটা বন্ধ হবে, নাকি পাহাড় হত্যার পর আমরা শুধু তার শোকসভা করব?
লেখক: আইনজীবী, কলামিস্ট ও মানবাধিকারকর্মী।












