জুলাই আন্দোলনের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ মামলার অপর তিন আসামিকে দেওয়া হয়েছে আমৃত্যু কারাদণ্ড। গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২ এ রায় ঘোষণা করে। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন– বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিতরা হলেন– কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, জেলা সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং সাবেক সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতা। দণ্ডিত চারজনই পলাতক রয়েছেন। খবর বিডিনিউজের।
রায়ে এক নম্বর অভিযোগে হানিফকে মৃত্যুদণ্ড এবং ২ ও ৩ নম্বর অভিযোগে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মামলার অপর তিন আসামিকে ১ নম্বর অভিযোগে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২ ও ৩ নম্বর অভিযোগে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অন্য ৪ ও ৫ নম্বর অভিযোগে চার আসামিকেই দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দণ্ডিতদের স্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করে তা বিক্রির মাধ্যমে পাওয়া অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থার মাধ্যমে গণঅভ্যুত্থানের হতাহতদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিতে বলা হয়েছে রায়ে।
রায় ঘোষণার পর ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম বলেন, আদালত এই রায়কে অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে মনে করেছেন এবং আমরা জুলাই শহীদদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছি। আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও বিলিবণ্টন প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, আসামিদের স্থাবর–অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্তের সুস্পষ্ট আদেশ হয়েছে। এটি জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থার মাধ্যমে বিক্রি করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে বিলিবণ্টন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রায় প্রকাশের পর আমরা সরকারের কাছে চিঠি লিখব, যাতে এই সম্পত্তিগুলো আয়ত্তে নিয়ে বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়। এক প্রশ্নের জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, কার সম্পত্তি কোথায় আছে, সেটা সরকার খুঁজে বের করে দেখবে।
আসামিরা বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, মামলার শুনানির সময় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, তারা দেশের বাইরে রয়েছেন। তাদের গ্রেপ্তার ও ফিরিয়ে আনার জন্য যাবতীয় আইনি প্রক্রিয়া বজায় রাখা হবে।
গত বছরের ২ নভেম্বর হানিফসহ চারজনের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল–২। প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, হানিফের নির্দেশনায় অন্যরা পরিকল্পনা করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়ায় আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, বাবলু ফরাজী ও ইউসুফ শেখকে হত্যা করেন।
দ্বিতীয় অভিযোগে ২০২৪ সালের ২৭ জুলাইয়ের সভার সময় ও পরবর্তী সময়ে কুষ্টিয়া শহর এবং আশপাশের এলাকায় নিরস্ত্র শিক্ষার্থী ও বেসামরিক ব্যক্তিদের ওপর শারীরিক হামলা, নির্যাতন, নিষ্ঠুর ও অবমাননাকর আচরণ, বেআইনি আটক এবং আহতদের চিকিৎসা না দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়।
তৃতীয় অভিযোগে ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী ও কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের ‘বিএনপি’, ‘জামায়াত’, ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করে আসামিদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন চালানোর অভিযোগ আনা হয়। হত্যা, নির্যাতন, বেআইনি আটক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক ও পদ্ধতিগত হামলারও অভিযোগ আনা হয়। চতুর্থ অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে ষড়যন্ত্র ও সহায়তার। এতে অভিযোগ করা হয়, তৎকালীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের নীতি বাস্তবায়নে জেনেশুনে ষড়যন্ত্র ও সহায়তা করেন। পঞ্চম অভিযোগটি অভিন্ন পরিকল্পনা ও অপরাধমূলক সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার। এতে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় নিরস্ত্র শিক্ষার্থী ও বেসামরিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ এবং সংশ্লিষ্ট ১৪–দলীয় জোটের ব্যাপক ও পদ্ধতিগত হামলা একটি অভিন্ন নীতির অংশ ছিল। ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জেনেশুনে ও ইচ্ছাকৃতভাবে অবদান রাখার অভিযোগ আনা হয়।












