আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসির শেষ ম্যাচ। বুয়েনেস আইরেসের এস্তোনিয়া মনুমেন্টালে থাকা দর্শকেরা ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তী, অন্যতম সেরা খেলোয়াড়কে বিদায় জানালেন। আবেগ, আতশবাজি, আলোর জাদু, সমবেত হাততালি–মেসির সামনে রাতটাকে স্মরণীয় করে রাখলেন সমর্থকেরা। উপরি পাওনা মেসির পা থেকে একটি গোল এবং দুটি অ্যাসিস্ট। দেশের জার্সিতে শেষ ম্যাচেও মেসি সেই কাজটিই করলেন, যা এত বছর ধরে করে এসেছেন। এতে যেন তার ক্লান্তি নেই।
মেসির শেষ ম্যাচের সাক্ষী থাকতে ৮৫ হাজার দর্শক ভিড় করেছিলেন স্টেডিয়ামে। ছিলেন অ্যাঞ্জেল দি মারিয়া, নিকোলাস ওটামেন্ডিরা। প্রাক্তন ফরাসি ফুটবলার ডেভিড ত্রেজেগুয়েকেও দেখা যায়। ম্যাচ শুরুর আগেই সম্মান জানানো হয়। ১০ নম্বর লেখা আর্জেন্টিনার একটি বিরাট জার্সি টাঙানো হয় স্টেডিয়ামে। লেখা ছিল, ‘ধন্যবাদ’।
স্টেডিয়ামের প্রায় প্রতিটি দর্শকের গায়ে ছিল আর্জেন্টিনার জার্সি। পিছনে লেখা মেসির নাম। এরপর মাঠে ঢোকেন মেসি। সঙ্গে সঙ্গে আতশবাজির রোশনাই শুরু হয়ে যায়। মেসির তিন ছেলে থিয়াগো, মাতে, সিরো, স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো, মা সেলিয়া হাজির ছিলেন স্টেডিয়ামে। আর্জেন্টিনার জাতীয় সঙ্গীতের সময় মেসির চোখ ভিজে যায়। ক্যামেরায় ধরা পড়ে তার কান্না। দর্শকাসনে থাকা স্ত্রী, মায়ের চোখেও জল। এমনকি কোচ লিওনেল স্কালোনি, ওটামেন্ডি, এঞ্জো ফের্নান্দেজরাও কাঁদতে শুরু করেন। টসের আগে প্রতিপক্ষ বেনিনের তরফে একটি স্মারক উপহার দেওয়া হয় মেসিকে। অ্যামাজন জঙ্গলের আদলে তৈরি ভাস্কর্যের সঙ্গে ছিল একটি চিঠিও। শুরু হয় ম্যাচ। মেসির পায়ে প্রথম বার বল যেতেই স্টেডিয়াম গর্জে ওঠে। মেসি বল ধরেই সতীর্থকে পাস দেন। বিদায়ী ম্যাচে অকারণে নজর কাড়ার চেষ্টা করেননি। আগের মতোই মাঠে ঘুরে বেড়িয়েছেন, ফাঁকা জায়গায় দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন, পাস নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
সাত মিনিটের মাথায় বঙের বাইরে সতীর্থের সঙ্গে পাস খেলে শট নেন মেসি। কোনও রকমে বাঁচিয়ে দেন বেনিনের গোলকিপার। তিন মিনিট পর আবার গর্জে ওঠে স্টেডিয়াম। ঠিক ১০ মিনিটের মাথায় ফুটবল, দর্শক এবং সাপোর্ট স্টাফেরা মেসির কীর্তির জন্য হাততালি দিয়ে সম্মান জানান। ম্যাচ কিছুক্ষণ বন্ধ থাকে। আবার আতশবাজির রোশনাই দেখা যায়। মেসি হাসিমুখে সেই সম্মান গ্রহণ করেন।
আর্জেন্টিনা ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করলেও বেনিন রক্ষণ জমাট রেখেছিল। ফলে প্রথমার্ধে কোনও গোল হয়নি। বিরতির পরেই গোল করে আর্জেন্টিনা। মেসির পাস থেকে দলকে এগিয়ে দেন ওটামেন্ডি, যিনি নিজেও মেসির মতোই বিশ্বকাপের পর অবসর নিয়েছেন। তারও এটি শেষ ম্যাচ ছিল। কিছুক্ষণ পরেই তাকে তুলে নেওয়া হয়। এরপর ফ্রিকিক থেকে গোলের সুযোগ এসেছিল মেসির কাছে। তবে শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। দ্বিতীয় গোলের জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। ডানপ্রান্তে বল পেয়েছিলেন নিকো পাজ। ভেতরে ঢুকে বাঁকানো শটে গোল করেন। এ রকম গোল দেশের জার্সিতে বহু বার করেছেন মেসি নিজেই।
আসল মুহূর্তটি আসে ৬৯ মিনিটে। বঙের বাইরে ফাউল করেন বেনিনের অগাস্টিন এনদিয়ায়ে। পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। সতীর্থেরা ঘিরে ধরেন মেসিকে। যেন তাকে রক্ষা করছেন শট নেওয়ার আগে। মেসি বল মাটিতে বসান। স্টেডিয়াম তখন রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষায়। কারণ মেসির পেনাল্টি নষ্ট করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। শেষ ম্যাচে মেসি অবশ্য ভুল করেননি। জোরালো শট কোনাকুনি আছড়ে পড়ে জালে। গোটা স্টেডিয়াম চেঁচাতে থাকে। মেসিকে ঘিরে লাফাতে থাকেন সতীর্থেরা।
মেসির খেলার তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। দ্বিতীয় গোলেরও সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। নিকো গঞ্জালেসের পাস থেকে কাছ থেকে গোল করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে ফিনিশিং ঠিকঠাক হয়নি। মেসির আরও একটি শট বিপক্ষ গোলকিপারের গায়ে লেগে পোস্টে লাগে। এ বার সময় এগোচ্ছিল দ্রুত। সমর্থকরা গান গাইতে শুরু করে দিয়েছিলেন। আর একটি সুযোগ আসে ম্যাচের একদম শেষের দিকে। শেষ বাঁশি বাজার ঠিক আগে ফ্রিকিক পায় আর্জেন্টিনা। গোলের থেকে ২১ মিটার দূরে। তবে মেসির শট বারের উপর দিয়ে বেরিয়ে যায়। সেই সঙ্গে শেষ হয় ২১ বছরের এক সফল অধ্যায়।
ম্যাচ শেষে মেসি বললেন, ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই জার্সি রক্ষা করতে পারা আমার জন্য বিশাল গর্বের বিষয়। আমরা এবং আমি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গেছি, কিন্তু কখনও লড়াই থামাইনি, কখনেও এখানে থাকা বন্ধ করিনি। আর এখানে না আসাটা ভীষণ কষ্টদায়ক হবে। আমি শপথ করে বলছি, সারা জীবন খেলতে চাই। কারণ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলা একজন মানুষের জীবনে ঘটতে পারা সবচেয়ে সুন্দর বিষয়। সবশেষে মেসি বললেন, আমি কৃতজ্ঞতা, গর্ব ও শান্তি নিয়ে বিদায় নিচ্ছি। সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ।












