সরকার এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) যৌথ বিনিয়োগে প্রস্তাবিত ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপন প্রকল্পের টেন্ডার আহ্বান হচ্ছে আগামী মাসে। বিদেশি ঋণের জন্য অপেক্ষা করে গত ১৫ বছরে প্রকল্পটির ব্যয় তিন গুণের বেশি বেড়ে যাওয়ার পর সরকার ও বিপিসি যৌথ অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের আধুনিকায়ন ও সমপ্রসারণের জন্য ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে ৩৫ হাজার কোটি টাকা (৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা)। এর মধ্যে সরকার ২১ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা এবং বিপিসি নিজস্ব তহবিল থেকে ১৪ হাজার ১৮৭ কোটি টাকার যোগান দেবে। প্রকল্পটি ইতোমধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) অনুমোদন করেছে। গতকাল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ইআরএল পরিদর্শন শেষে আগামী মাসে টেন্ডার আহ্বানের কথা জানিয়েছেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শুধু জ্বালানি তেল পরিশোধন কিংবা আর্থিক সাশ্রয় নয়, এই প্রকল্প দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে। নতুন রিফাইনারির ডিজাইনে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ক্রুডই নয়, অন্যান্য দেশের ক্রুডও পরিশোধন করার ব্যবস্থা থাকবে।
সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশে বছরে ৭০ লাখ টনের বেশি জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর সামান্য অংশ পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে বিপিসির। দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টনের মতো ক্রুড অয়েল পরিশোধন করতে পারে। এই ক্রুডের পুরোটাই আমদানি করতে হয় সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য ১৫ লাখ টন ক্রুড আমদানি করা হলেও বাকি ৫৫ লাখ টনের বেশি তেল পরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করতে হয়। পরিশোধিত তেলের দাম ক্রুড অয়েলের তুলনায় অনেক বেশি। দেশের পরিশোধন সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করতে বাধ্য হয় সরকার। এজন্য প্রতিবছর কোটি কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। ক্রুড হিসেবে আমদানি করে দেশে পরিশোধন করা গেলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতো। কিন্তু ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব না হওয়ায় দেশে ক্রুড অয়েল আমদানি বাড়ানো যাচ্ছে না।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ১৯৬৮ সালে নির্মিত ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০১০ সালে গ্রহণ করা হয় ইস্টার্ন রিফাইনারি দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণ প্রকল্প। বছরে ৩০ লাখ টন জ্বালানি তেল পরিশোধনের ক্ষমতাসম্পন্ন ইস্টার্ন রিফাইনারি–২ নামে নতুন একটি রিফাইনারি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ওই সময় প্রকল্পটির ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৩ হাজার কোটি টাকা। পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারির ২শ একর জায়গার এক পাশে ৭০ একর জায়গায় দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৫ বছর ধরে ঢিমেতালে চলা প্রকল্পটির ব্যয় ইতোমধ্যে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা ছুঁয়েছে। অবশ্য পরবর্তীতে সংশোধিত প্রকল্পে ব্যয় সাড়ে ৩৫ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।
প্রকল্পটি নিয়ে অনেকদিন ধরে আলোচনা চলছে। নানাভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করে আসছিল বিপিসি। তারা সরকার থেকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণসুবিধা নিয়ে প্রকল্পটি করতে চেয়েছিল। পরবর্তীতে এই প্রকল্পের সাথে যুক্ত হয় দেশের আলোচিত শিল্পগ্রুপ এস আলম। তারা প্রকল্পটিতে অর্থায়নের প্রস্তাব দেয়। ‘ইনস্টলেশন অব ইআরএল ইউনিট–২’ শীর্ষক প্রকল্পটি ইআরএল এবং এস আলম গ্রুপের সাথে এমওইউ স্বাক্ষর করা হয়। এস আলম গ্রুপের পক্ষ থেকে ৩০ লাখ টনের পরিবর্তে ৫০ লাখ টন ক্রুড পরিশোধন ধারণক্ষমতা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এস আলম গ্রুপের সাথে যৌথভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারি নির্মাণের ব্যাপারে নানা প্রক্রিয়া চালানো হয়। প্রকল্পের ডিপিপি প্রস্তুত করে দেওয়া হয় মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় থেকে ফাইল পাঠানো হয় প্রধানমন্ত্রীর দফতরে। ওখান থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার আগেই কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে সৃষ্ট ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতন হলে ইস্টার্ন রিফাইনারি দ্বিতীয় ইউনিটের সকল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। সরকার এস আলমের সাথে করা চুক্তি বাতিল করে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের আধুনিকায়ন ও সমপ্রসারণ (ইআরএল–২)’ নামের এই প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাব পাঠাতে বলে। যা অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন থেকে প্রকল্পটি নিয়ে বেশ কিছু অবজারভেশন দেয়। সেগুলো পুনরায় সংশোধন করা হয়। এতে প্রকল্প ব্যয় ৪৩ হাজার কোটি টাকা থেকে কমে ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি ১৪ লাখ টাকায় নেমে আসে। এর মধ্যে সরকার ২১ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা এবং বিপিসি নিজস্ব তহবিল থেকে ১৪ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা যোগান দেয়ার আশ্বাস দেয় এবং একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন করে। প্রকল্পটি ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের আধুনিকায়ন ও সমপ্রসারণে নতুন ২০টি প্রসেসিং ইউনিট স্থাপন করা হবে। এতে ইউরো–৫ মানের জ্বালানি তেল উৎপাদিত হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত হওয়ার পর প্রকল্পটি নিয়ে আবারো অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। কিন্তু গতকাল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ইআরএল পরিদর্শন করতে এসে নতুন আশার কথা শুনিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আগামী মাসের মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় ইউনিটের (ইআরএল–২) জন্য দরপত্র আহ্বান করা হবে। ২০২৯ সালের শুরুর দিকে এর পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, এটি চালু হলে দেশের অভ্যন্তরে অপরিশোধিত তেল শোধনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং জ্বালানি আমদানির উৎসগুলোতেও বৈচিত্র্য আসবে।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই সমপ্রসারণের ফলে বাংলাদেশ আরও বেশি সংখ্যক দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করতে পারবে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও আঞ্চলিক সংকটের ঝুঁকি মোকাবিলা করা সহজ হবে।
উল্লেখ্য, ইস্টার্ন রিফাইনারি আমদানিকৃত ক্রুড অয়েল পরিশোধন করে পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল, বিটুমিন, এলপিজি, জেট ফুয়েলসহ ১৭ ধরনের পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট উৎপাদন করে।














