ইচ্ছে করে ধরিয়ে দেয় আগুন, জ্বলে পাহাড়ের পর পাহাড়

জীবজন্তু, পশু-পাখি ও গাছপালার ক্ষতি । ঝুঁকিতে থাকে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন । নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা চান সংশ্লিষ্টরা

কাজী মোশাররফ হোসেন, কাপ্তাই | বৃহস্পতিবার , ২ এপ্রিল, ২০২৬ at ১০:৪৯ পূর্বাহ্ণ

এখন শুষ্ক মৌসুম। বৃষ্টিপাত না হওয়ায় এই মৌসুমে পাহাড়ের অনেক গাছপালা শুকিয়ে যায়। অসংখ্য গাছের শুকনো পাতা পাহাড়ে যত্রতত্র ঝরে পড়ে থাকে। ঝরে পড়া এই পাতাগুলো এতটাই শুকনো যে সামান্য বাতাসে এক স্থান থেকে অন্যত্র উড়ে যায়। আবার কোনো কারণে একটু আগুনের ছোঁয়া পেলে পাতাগুলো মুহূর্তে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। মহলবিশেষ হীন উদ্দেশ্যে পাহাড়ে জমে থাকা ঝরে পড়া শুকনো পাতায় ইচ্ছে করে আগুন ধরিয়ে দেয়। আর মুহূর্তে আগুনের লেলিহান শিখা এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের ভয়াবহতা এতটাই তীব্র থাকে যে ছড়িয়ে পড়া আগুন কোনো অবস্থাতেই নিয়স্ত্রণে আনা সম্ভব হয় না। একটি শুকনো পাতা থেকে আগুন আরেকটি শুকনো পাতায় মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে একরের পর একর পাহাড় জ্বলতে থাকে।

গত ৩১ মার্চ বিকালে কাপ্তাইরাঙ্গামাটি সড়কের সাপছড়ি এলাকায় পাহাড়ে বিশাল এলাকায় আগুন জ্বলতে দেখা যায়। আগুন লাগানো স্থানের পাশে বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইন ছিল। যেকোনো মুহূর্তে আগুন বৈদ্যুতিক লাইন স্পর্শ করারও আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। এই পরিস্থিতিকে ভয়াবহ আখ্যা দিয়েছেন স্থানীয় সাধারণ জনগণ।

পাহাড়ে এভাবে আগুন লাগানোকে জীবজন্তু, পশুপাখি, গাছপালাসহ পরিবেশ এবং প্রতিবেশের জন্য ক্ষতিকারক বলে মন্তব্য করেছেন কাপ্তাই পাল্প উড বাগান বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা অসিত রঞ্জন পাল।

তিনি বলেন, শুষ্ক মৌসুমে কাঠফাটা রোদের কারণে এমনিতে পাহাড় উত্তপ্ত থাকে। এর মধ্যে আগুনের ছোঁয়া পাওয়ায় এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। যতক্ষণ পর্যন্ত আগুন শুকনো পাতার সংস্পর্শ না পাবে ততক্ষণ পর্যন্ত আগুন জ্বলতেই থাকবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের প্রাক্তন ডিএফও তপন কুমার পাল বলেন, আগুনের কারণে পাহাড়ের যে কী পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। আগুন লাগানো না হলে পড়ে থাকা শুকনো পাতাগুলো বৃষ্টির পানিতে পচে এক ধরনের জৈব সার উৎপন্ন করত। পচন ধরা পাতার নিচে বিভিন্ন কীটপতঙ্গ জন্ম নিত। হরেক রকমের পাখপাখালি এসব কীট পতঙ্গ খেতে পাহাড়ের গাছে গাছে বিচরণ করত। পাহাড়ের আনাচেকানাচে অনেক ধরনের জীবজন্তুও ঘুরে বেড়াতে পারত। আবার প্রাকৃতিক জঙ্গলে মোড়ানো থাকত পাহাড়ের অনেক গভীর বনাঞ্চল। এসব কিছু নিয়েই ছিল পাহাড়ের পরিবেশ ও প্রতিবেশ। কিন্তু আগুন লাগানোর ফলে পরিবেশপ্রতিবেশ সব ধংস হয়ে যাচ্ছে।

কাপ্তাই রেঞ্জ কর্মকর্তা ওমর ফারুক স্বাধীন বলেন, অনেক পাহাড়ের উপর দিয়ে বৈদ্যুতিক খুঁটিতে তার টাঙানো রয়েছে। আগুন এসব বৈদ্যুতিক তারেরও অনেক ক্ষতি করে থাকে। কাজেই পাহাড়ে যাতে কোনো অবস্থাতেই কেউ আগুন লাগাতে না পারে সেজন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

লিচুবাগান বিদ্যুৎ অফিসের আবাসিক প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন পাহাড়ের উপর দিয়ে অথবা পাহাড়ের ঢাল দিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের অসংখ্য পিলার বসানো রয়েছে। প্রতিটি পিলারের উপর দিয়ে ইনস্যুলেটর করা বৈদ্যুতিক তার রয়েছে। আগুনের তাপে বৈদ্যুতিক তারের ইনস্যুলেটর পুড়ে গলে নিচে পড়ে যায়। এর ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। জীবনহানিরও আশঙ্কা থাকে। তাই জাতীয় স্বার্থে শুষ্ক মৌসুমে পাহাড়ে যাতে কেউ কোনোভাবে আগুন ধরাতে না পারে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তিনি যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপুকুর থেকে বৃদ্ধার লাশ উদ্ধার
পরবর্তী নিবন্ধডিসি গোল্ডকাপ ফুটবলে কাপ্তাই উপজেলার জয়