আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি ও সামগ্রিক শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করবে

আনোয়ারায় সিইআইজেড প্রকল্প বাস্তবায়ন

| সোমবার , ২২ জুন, ২০২৬ at ৫:৪১ পূর্বাহ্ণ

আনোয়ারায় গড়ে উঠছে বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ বিনিয়োগের বিশাল ‘কৌশলগত হাব’। উদ্বোধনের ১০ বছর পর অবশেষে প্রতীক্ষিত কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে আনোয়ারায় প্রস্তাবিত ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল (সিইআইজেড) প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। গত ১৬ জুন মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় শতভাগ পরিবেশবান্ধব ও প্রকল্পের নকশায় টেকসই জ্বালানি সমাধান অন্তর্ভুক্ত করার শর্তে ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চলের জন্য সহায়ক অবকাঠামো প্রকল্প’ অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে দেশের প্রথম ফ্রি ট্রেড জোন (এফটিজেড) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই জোড়া উদ্যোগে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সরবরাহ চেইন এবং আঞ্চলিক লজিস্টিকস কেন্দ্র হিসেবে নতুন উচ্চতায় পৌঁছবে। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফরের প্রাক্কালে এই অনুমোদনকে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

আজাদীতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে শিল্প বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে আনোয়ারায় নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। সিইআইজেডে বৃহৎ পরিসরে দেশিবিদেশি বিনিয়োগে মাইলফলক হবে এ প্রকল্প। এর ফলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে একটি আধুনিক শিল্প ও লজিস্টিক কেন্দ্র গড়ে উঠবে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ জোনে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং কমপক্ষে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৬১ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) সুযোগ তৈরির পাশাপাশি আনোয়ারার শিল্প, বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। পাশাপাশি কর্ণফুলী টানেলে গাড়ি চলাচল বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে টানেলে গতি ফিরবে। প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ বছর মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে।

২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ধারাবাহিকতায় কর্ণফুলী টানেল সড়কের কালাবিবির দিঘি মোড়ের কাছে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘিরে শিল্পুবাণিজ্যে ব্যাপক আশার সঞ্চার করলেও উদ্বোধনের ১০ বছরে নানা কারণে প্রকল্পটি আলোর মুখ না দেখায় এটির ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা তৈরি হয়। একনেকে প্রকল্প অনুমোদনের মধ্য দিয়ে এ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে আনোয়ারায় শিল্প সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার হলো। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট ‘চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড)’ গড়ে তোলার কাজটি আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া হয় চীন সরকারের মনোনীত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিআরবিসিকে। এ বিষয়ে একনেকের বৈঠকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির (ডিপিএম) মাধ্যমে সিআরবিসির সঙ্গে চুক্তির জন্য বেজার একটি প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। চীনা প্রতিষ্ঠানটি ৭৮৪ একর জমিতে জিটুজি (দুই দেশের সরকারি পর্যায়) ভিত্তিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করার কথা রয়েছে। জোনটি সম্পূর্ণরূপে চীনের উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দকৃত। এই অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলে কেমিক্যাল, অটোমোবাইল অ্যাসেম্বলি, গার্মেন্টস ও ওষুধ কারখানা গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক পত্রিকান্তরে বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের জন্য সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পটি যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশে বড় বড় বিনিয়োগ করতে আরো বেশি আগ্রহী হবে, যা দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আমদানিরপ্তানি বৃদ্ধি ও সামগ্রিক শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্মসূচির ভবিষ্যৎ মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে। প্রথমত, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন সম্পন্ন করা; দ্বিতীয়ত, শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং তৃতীয়ত, বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুমোদন ও সেবা প্রক্রিয়া আরো সহজ ও দ্রুত করা।

ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো অর্থনৈতিক অঞ্চলভিত্তিক শিল্পায়নে এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। সেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে শুধু প্রকল্প অনুমোদনের সীমায় না থেকে বাস্তব বিনিয়োগ ও উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে