আনোয়ারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিল ধারণের ঠাঁই নেই

গরমে রোগীদের নাভিশ্বাস বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও জনবল সংকটে প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছেন না রোগীরা

এম.নুরুল ইসলাম, আনোয়ারা | শনিবার , ১৮ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:৫৩ পূর্বাহ্ণ

আনোয়ারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত বেড ও জনবল সংকটের কারণে সেবা গ্রহীতাদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিন হাসপাতালের আউটডোর, জরুরি বিভাগ কিংবা বেডে কোথাও যেন রোগীদের তিল ধারণের ঠাঁই নেই। বর্তমানে ডায়রিয়া, জ্বরসর্দি, পেট ব্যথাসহ নানান উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছেন রোগীরা। ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে প্রতিদিন ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণ রোগী ভর্তি হচ্ছেন।

অন্যদিকে হাসপাতালে জনবল সংকটসহ পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা না থাকায় গলাকাটা দামে রোগীরা বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিক বা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। উপজেলার ৫ লাখেরও বেশি মানুষের চিকিৎসা সেবার একমাত্র ভরসাস্থল এই হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় উন্নীতকরণের দাবি এলাকাবাসীর।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে প্রতিদিন হাজারেরও অধিক রোগীর চাপ তীব্র গরমে সামলাতে ডাক্তার নার্সদের হিমশিম খেতে হয়। বর্তমানে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে রোগীরা গরমে অতিষ্ঠ। হাসপাতালে জেনারেটর থাকলেও লোডশেডিংয়ের সময় চালু করা হয় না। তাছাড়া পর্যাপ্ত ডাক্তার ও জনবল সংকটের কারণে প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত করতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। যার ফলে প্রত্যাশিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অধিকাংশ রোগী। ৫০ শয্যার এ হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় দ্রুত উন্নীতকরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা না গেলে এই অঞ্চলের জনসংখ্যার বৃদ্ধির চাপ অনুযায়ী প্রত্যাশিত চিকিৎসা সেবা কখনো দেওয়া সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন তারা। বর্তমানে আনোয়ারা হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় উন্নীতকরণের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম স্বাস্থ্য মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগে ডিও লেটার প্রেরণ করেছেন বলে জানা গেছে।

বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংকট, জনবল সংকট ও নানান সমস্যায় জর্জরিত হয়ে এই হাসপাতালটি নিজেই যেন অনেকটা রোগী।

আনোয়ারা উপজেলার ১১ ইউনিয়ন ছাড়াও পার্শবর্তী কর্ণফুলী, বাঁশখালী, সাতকানিয়া ও চন্দনাইশ উপজেলার একাংশের মানুষের চিকিৎসায় ভরসাস্থল হচ্ছে আনোয়ারা হাসপাতাল। শুধু তাই নয় অবস্থান ও ভৌগলিক সুবিধার কারণে এখানে বরাবরই রোগীর ভিড় থাকে বেশি। আগত রোগীদের মধ্যে অধিকাংশ ডায়রিয়া, জ্বর, সর্দি, আর চর্ম রোগে আক্রান্ত।

হাসপাতাল সূত্রে আরও জানা গেছে, হাসপাতালে ৮জন মেডিকেল অফিসারের পদের মধ্যে ৫ জন্য অফিসার কর্মরত আছেন। বাকি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন জুনিয়র কনসালটেন্ট পদে ডাক্তার নেই।

তৃতীয় শ্রেণীর ৮৪টি পদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রধান সহকারী কাম হিসাব রক্ষক, ক্যাশিয়ার, অফিস সহকারী তিন পদের মধ্যে ২ টি পদ শূন্য, সহকারী নার্স পদে ১জনও নেই, সহকারী ডেন্টাল সার্জন ১ জন, ইউনিয়ন সাব সেন্টার সহকারী সার্জন ২ জন, উপসহকারী মেডিকেল অফিসার ২ পদের মধ্যে ২টিই শূন্য, মেডিকেল টেকনোলজি এক্সরে ১টি পদ শূন্য, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ল্যাব ৩ পদে ২ জন নেই, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ইপিআই ১ পদ শূন্য, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ফিজিও পদ শূন্য, যক্ষা ও কুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ সহকারী পদে কেউ নেই, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শকের ১টি পদ শূন্য, স্বাস্থ্য সহকারীর ৪৫ পদের মধ্যে ৮টি শূন্য, ড্রাইভার পদ শূন্য, জুনিয়র মেকানিক জুনিয়র, মেকানিক পদসহ ৮৪ টি পদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদসহ ২৬ পদে কোনো সেবা দেওয়ার লোক নেই।

চতুর্থ শ্রেণীর ২৩ পদের মধ্যে কুক দুইটি, নিরাপত্তা প্রহরী ২ পদ শূন্য, আয়া দুইপদে আছে ১ জন, ওয়ার্ড বয় ৩ পদের মধ্যে ১ পদ শূন্য, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পাঁচ পদের মধ্যে দুটি পদ শূন্য, অফিস সহায়ক চারটি পদের মধ্যে ৪টি শূন্য, গার্ডেনার পদ শূন্যসহ ১২ পদে কোনো জনবল নেই বলে জানা গেছে।

হাসপাতালে ভর্তি এক শিশু রোগী মা বলেন, তিন দিন ধরে হাসপাতালে শ্বাস কষ্ট জ্বর নিয়ে আমার ছেলেকে ভর্তি করেছি। বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে গরমে আমরা অতিষ্ট শ্বাস কষ্ট বেড়ে গেলে মুখে নেবুলাইজার ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ থাকে না। হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে হয়।

উপজেলার হাইলধর ইউনিয়নের গুজারা গ্রামের বাসিন্দা বৈশাখী সরকার (৩৫) বলেন, আমার দেড় বছর বয়সী ছেলে ঋত্বিক সরকার কে শ্বাসকষ্ট রোগ নিয়ে দুইদিন ধরে হাসপাতালে আছি। হাসপাতালে কর্তব্যরত সেবিকা জন্নাতুল নাইম (২৮) বলেন, হাসপাতালে বেডের সংখ্যা ৫০ হলেও শুক্রবার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ৯৩ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। তাদের মধ্যে অধিকাংশ ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, জ্বর সর্দি।

স্থানীয় বাসিন্দা আবু তাহের বলেন, রোগীর চাপ এত বেশি আউটডোরে প্রতিদিন সকালে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করে টিকেট নিতে হয়। বিশেষজ্ঞ কোনো চিকিৎসক না থাকায় প্রত্যাশিত চিকিৎসা নিতে পারি না। হাসপাতালে তেমন কোনো ওষুধও সাপ্লাই নেই।

আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার মাহাতাব উদ্দিন চৌধুরী বলেন, বর্তমানে ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে ধারণ ক্ষতার চেয়ে দ্বিগুণ রোগী ভর্তি হচ্ছে। প্রতিদিন জরুরি বিভাগ ও আউট ডোরে ১ হাজার থেকে ১২/১৩শ রোগীর চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। গত কযেক মাসে এত রোগীর চাপ বেড়ে প্রতি মাসে গড়ে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার পর্যন্ত রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আমি যোগদানের পর থেকে আমার সর্বোচ্চ চেষ্টায় রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছি। এ হাসপাতালে আনোয়ারা ছাড়াও বিভিন্ন উপজেলার রোগীরা চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। বর্তমানে লোডশেডিংয়ে অতিষ্ট রোগীরা। হাসপাতালে জেনারেটর থাকলেও তেলের বরাদ্দ না থাকায় সেটা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া চালু করা যাচ্ছে না। তাছাড়া হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও জনবল সংকটের কারণে পর্যাপ্ত সেবা দেওয়া অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না।

পূর্ববর্তী নিবন্ধহরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত ঘোষণা, নিয়ন্ত্রণ ছাড়েনি ইরান
পরবর্তী নিবন্ধহারে ওয়ানডে সিরিজ শুরু বাংলাদেশের