হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত ঘোষণা, নিয়ন্ত্রণ ছাড়েনি ইরান

যুদ্ধবিরতির মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অনুমোদন, মার্কিন অবরোধ বহাল । ইরানের সব ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে নেবে : ট্রাম্প

আজাদী ডেস্ক | শনিবার , ১৮ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:৫১ পূর্বাহ্ণ

যুদ্ধবিরতির মধ্যেই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে উন্মুক্ত রাখার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। তবে একই সঙ্গে প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ইঙ্গিতও স্পষ্ট করেছে তেহরান। গতকাল দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান, চলমান যুদ্ধবিরতির অবশিষ্ট সময়ের জন্য প্রণালিটি সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখা হবে।

তিনি বলেন, লেবাননে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং ইরানের বন্দর ও সমুদ্র সংক্রান্ত কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত রুট অনুযায়ী জাহাজ চলাচল অব্যাহত থাকবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত তেল পরিবহন পথটি কার্যত বন্ধ করে দেয় ইরান। এর জবাবে চলতি সপ্তাহের শুরুতে হরমুজ প্রণালিতে নৌঅবরোধের ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্রও। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, যার মেয়াদ ২২ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা। বিশ্বের মোট জ্বালানি পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে হওয়ায়, এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রভাব ফেলছে।

ইরানের ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশালে তিনি লেখেন, ইরান তাদের প্রণালি এখন সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করেছে। ধন্যবাদ! তবে পরবর্তী পোস্টে তিনি স্পষ্ট করেন, হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত থাকলেও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৌঅবরোধ ‘পুরোপুরি বহাল’ থাকবে। তিনি দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তির বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে এবং আমরা চুক্তির খুব কাছাকাছি। তিনি লেখেন, ইরান সম্মত হয়েছে যে তারা আর কখনো হরমুজ প্রণালি বন্ধ করবে না এবং এটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে না। তিনি আরও লেখেন, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইরান পারস্য উপসাগরে পুঁতে রাখা মাইন অপসারণ করেছে বা অপসারণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

একই সঙ্গে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে নেবে। তিনি এটিকে ‘পারমাণবিক ধূলিকণা’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এ প্রক্রিয়ায় কোনো অর্থ লেনদেন হবে না এবং লেবাননকে এতে যুক্ত করা হবে না। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি ইরান। ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধার করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যেতে তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটন একযোগে কাজ করবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল শুক্রবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, আমরা একসঙ্গে এটি (ইউরেনিয়াম) সংগ্রহ করতে যাচ্ছি। আমরা ইরানের সঙ্গে মিলে ধীরে ধীরে কাজটি করব। বড় যন্ত্রপাতি নিয়ে সেখানে খনন শুরু করব এবং ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসব।

এদিকে ইরান প্রণালি উন্মুক্ত ঘোষণা করলেও বাস্তবে তা পুরোপুরি অবাধ নয়। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেশটির এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা জানান, কেবল বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অনুমতি পাবে। সামরিক জাহাজ চলাচল নিষিদ্ধ থাকবে। সব জাহাজকে নির্ধারিত রুট অনুসরণ করতে হবে। এছাড়া ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌ শাখা থেকে পূর্বানুমতি নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজও পারাপারের অনুমতি পাবে, তবে সামরিক জাহাজ নয়।

ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, মাইন অপসারণ কার্যক্রম শুরু করতে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ডেস্ট্রয়ার ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে পারস্য উপসাগরে অবস্থান করছে। এর পরপরই আইআরজিসি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানায়, অনুমতি ছাড়া কোনো সামরিক জাহাজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করলে ‘কঠোর ব্যবস্থা’ নেওয়া হবে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগেই বলেন, জাহাজ চলাচলে ইরানের নির্ধারিত রুট অনুসরণ বাধ্যতামূলক। ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ অব্যাহত থাকলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতেই রয়েছে, প্রয়োজন অনুযায়ী আমরা শিথিলতা দেখাব।

এদিকে, ইরান হরমুজ প্রণালি সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত ঘোষণা করার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম নাটকীয়ভাবে কমেছে; চাঙ্গা হয়ে উঠেছে শেয়ার বাজার। এ ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম ব্যারেল প্রতি ৯ শতাংশ কমে ৯০ ডলারে নেমে এসেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের দাম ১০ শতাংশ কমে ব্যারেল প্রতি ৮১.৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। যদিও এ দাম যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের চেয়ে বেশি, তারপরও এটা গত মার্চের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় অনেক কম। সে সময় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল। প্রণালি উন্মুক্ত হওয়ার খবরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পুঁজিবাজারেও চাঙ্গাভাব দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি দরের শেয়ারগুলোর দাম এই খবরে আরও বেড়েছে। ইউরোপের ‘স্টঙ ৬০০’ সূচক ১.৩ শতাংশ এবং এসঅ্যান্ডপি ফিউচার ০.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপ্রতিবন্ধী ভাইপোকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ গেল চাচার, আহত ১০
পরবর্তী নিবন্ধআনোয়ারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিল ধারণের ঠাঁই নেই