দেশের প্রথম বিদেশি অপারেটর দিয়ে পরিচালিত পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনালের উৎপাদনের বন্ধ্যাত্ব ঘুচাতে অবশেষে যুক্ত হচ্ছে জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানামার জন্য ৪টি অত্যাধুনিক কী গ্যান্ট্রি ক্রেন। প্রায় ৩৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে চীন থেকে ক্রেনগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে। আজ সন্ধ্যায় চীন থেকে আমদানিকৃত চারটি কী গ্যান্ট্রি ক্রেন নিয়ে একটি জাহাজ পিসিটিতে নোঙর করবে। এই চারটি ক্রেন সংযোজন হলে পিসিটির জাহাজ এবং কন্টেনার হ্যান্ডলিং বহুগুনে বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া এতোদিন তারা কোন গিয়ারলেস ভ্যাসেল হ্যান্ডলিং করতে পারেনি। জাহাজের ক্রেন দিয়েই কন্টেনার হ্যান্ডলিং করেছে। চারটি ক্রেন সংযোজনের পর যে কোন ধরণের জাহাজেই তারা কন্টেনার ওঠানামা করাতে পারবে।
সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কন্টেনার টার্মিনাল হিসেবে বিবেচিত হয় পিসিটি। চিটাগাং ড্রাইডক লিমিটেডের পাশ থেকে বোট ক্লাব পর্যন্ত আগেকার বিমানবন্দর সড়কের বাঁকগুলো সোজা করে উদ্ধার করা নদী পাড়ের ৩২ একর জায়গার উপর পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়। এই টার্মিনালের তিনটি জেটিতে চট্টগ্রাম বন্দরের এযাবতকালের সবচেয়ে ‘বড়’ জাহাজগুলোকে অনায়াসে বার্থিং দেয়ার সুযোগ রয়েছে। বাড়তি গভীরতার পাশাপাশি চ্যানেলে কোন বাঁক না থাকায় পিসিটি বড় জাহাজ ভিড়ানোর সুবিধা পাবে। এই টার্মিনালে ২০০ মিটারের বেশি দৈর্ঘ্যের এবং ১০ মিটারের বেশি ড্রাফটের জাহাজ ভিড়ানোর আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল নির্মাণকালে। বঙ্গোপসাগরের মোহনা থেকে এনসিটি, সিসিটির দূরত্ব যেখানে ১৪–১৫ কিলোমিটার সেখানে পিসিটির দূরত্ব মাত্র ৬ কিলোমিটার। যা চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান টার্মিনালগুলোর তুলনায় পিসিটিকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ১ হাজার ২৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে টার্মিনালটির নির্মাণকাজ শুরু করে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নকশা অনুযায়ী সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের তত্ত্বাবধানে দেশিয় প্রতিষ্ঠান ই–ইঞ্জিনিয়ারিং এটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে। ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে নির্মাণকাজ শেষ হলেও নানা কারণে পিসিটি চালু হয়নি। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ২২ বছরের জন্য পিসিটি পরিচালনার দায়িত্ব পায় সৌদি আরবের রাজপরিবারের মালিকানাধীন রেড সী গেটওয়ে লিমিটেড। রেড সী গেইটওয়েই দেশের কোন কন্টেনার টার্মিনালে প্রথম বিদেশি অপারেটর।
এই টার্মিনালে তিনটি কন্টেনার বা খোলা পণ্যবাহী জাহাজ এবং একটি তেলের জাহাজ ভেড়ানোর ডলফিন জেটি রয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ জেটি, ইয়ার্ডসহ বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে তুললেও কন্টেনার হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্টস স্থাপন করেনি। বিদেশি অপারেটর প্রতিষ্ঠানটি পিসিটি আধুনিকায়ন, গ্যান্ট্রি ক্রেন সংগ্রহ এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নে ১৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের কথা। চুক্তির শুরুতে কনসেশন ফি হিসেবে ১৮.৩ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে বন্দরকে। ইতোমধ্যে তারা ২৫ মিলিয়ন ডলারের ১৪টি রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন স্থাপন করেছে। ২২ বছর মেয়াদি চুক্তির ২ বছর ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে। কিন্তু কী গ্যান্ট্রি ক্রেন না থাকায় টার্মিনালটি বন্দরের অন্য টার্মিনালগুলোর মতো কন্টেনার ও জাহাজ হ্যান্ডলিং করতে পারছিল না। কী গ্যান্ট্রি ক্রেন না থাকায় ক্রেনবিহীন বা গিয়ারলেস ভ্যাসেল হ্যান্ডলিং করতে পারছিল না। তারা শুধু মায়ের্সক লাইনের গিয়ার্ড ভ্যাসেল (ক্রেন আছে এমন জাহাজ) হ্যান্ডলিং করছিল। ফলে তাদের কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ে প্রত্যাশা ছুঁতে পারছিল না।
বন্দর সূত্র জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে গত মে মাস পর্যন্ত পাঁচ মাসে পিসিটিতে মোট কন্টেনার হ্যান্ডলিং করেছে ১ লাখ ৪৩ হাজার টিইইউএস। এরমধ্যে ৩১ শতাংশই খালি কন্টেনার। ৫০ শতাংশ আমদানি কন্টেনার। ১৯ শতাংশ রপ্তানি কন্টেনার। এই টার্মিনালে মাসে গড়ে ১২টির মতো কন্টেনার জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে। এতে গড়ে ২৮ হাজার ৭১১ টিইইউএস কন্টেনার উঠানামা হয়। যা পিটিসির প্রত্যাশিত সক্ষমতা থেকে অনেক কম।
বন্দর সূত্র জানিয়েছে, পিসিটির কন্টেনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বছরে ৫ লাখ টিইইউএস। এটি করতে হলে পিসিটিতে মাসে গড়ে ৪১ হাজার ৬৬৬ একক কন্টেনার হ্যান্ডলিং করতে হবে।
পিসিটি অবস্থানগত দিক থেকে বেশ এগিয়ে রয়েছে। জাহাজ বার্থিংয়ের ক্ষেত্রেও তারা বন্দরের নিয়ম অনুসরণ করে না। বন্দরের সাথে সম্পাদিত কনসেশন চুক্তির সুবাদে নিজেদের মতো করে আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে জাহাজ বার্থিং দিয়ে থাকে। নানা ধরণের সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও শুধুমাত্র কী গ্যান্ট্রি ক্রেনের অভাবে পিসিটি কন্টেনার ও জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে বন্দরের অন্যান্য টার্মিনালগুলোর তুলনায় পিছিয়ে থাকে।
অবশেষে সেই বন্ধ্যাত্ব ঘুচাতে পিসিটিতে চারটি হাইটেক কী গ্যান্ট্রি ক্রেন স্থাপন করা হচ্ছে। চীনের সানি মেরিন হেভি ইন্ডাষ্ট্রি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে তারা ক্রেনগুলো বানানোর অর্ডার করে। চারটি ক্রেন কিনতে প্রায় ৩০ মিলিয়ন (৩ কোটি) ডলার বা প্রায় ৩৭০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় ৬টা নাগাদ এমভি লান হাই হং ইয়ুন নামের একটি জাহাজ চারটি ক্রেন নিয়ে পিসিটিতে নোঙর করবে। ক্রেনবাহী জাহাজটি যাতে নিরাপদে জেটিতে ভিড়তে পারে এজন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ গতকাল বন্দর চ্যানেলে চলাচলরত সব ধরণের জাহাজ এবং নৌযানের জন্য বিশেষ নোটিশ জারি করেছে। এতে ক্রেন খালাসের সময় কর্ণফুলী নদীতে সব ধরণের নৌযানকে পিসিটি জেটি থেকে অন্তত ১শ’ মিটার পূর্বতীর ঘেষে বিশেষ সতর্কতার সাথে চলাচল করতে বলা হয়েছে। ক্রেনগুলো চালু করতে দুই থেকে তিনমাসের মতো সময় লাগতে পারে বলে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে যে, ক্রেনগুলো পুরোদমে কার্যক্রম শুরু করলে পিসিটির বার্ষিক কন্টেনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ৫ লাখ টিইইউএসে উন্নীত হবে। যা চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।












