পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অপারেটর নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতায় সাগরের তলদেশে এবং মাটির নিচে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার এসপিএম (সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং) উইথ ডাবল পাইপলাইন প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। কমিশনিং এবং পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্পন্ন হলেও পাইপ লাইনটি চালু করা যাচ্ছে না। পাইপ লাইনটি চালু করার আগেই এর দেড় বছরের গ্যারান্ট্রি পিরিয়ড শেষ হয়ে গেছে। এখন এই পাইপ লাইনে কোনো জটিলতা তৈরি হলে তা বিপিসিকেই নিজস্ব খরচে সংস্কার বা মেরামত করতে হবে। ইতোমধ্যে বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তিনটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান টেন্ডারে অংশ নিয়েছে। কিন্তু টেন্ডার যাচাই বাছাই করে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানকে অপারেটর নিয়োগের কাজটি ঝুলে থাকায় প্রকল্পটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) এই পাইপলাইন কবে সচল হবে তাও নিশ্চিত নয়। এতে করে দেশের জ্বালানি তেল লাইটারিংয়ের কাজটি এখনো ভাড়া করা জাহাজের উপরই নির্ভরশীল রয়ে গেছে। এতে বিপিসির বছরে অন্তত আটশ’ কোটি টাকা বাড়তি ব্যয় হচ্ছে।
সূত্র জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর প্রায় ৯০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। আমদানিকৃত জ্বালানি তেল নিয়ে আসা বড় বড় মাদার ভ্যাসেলগুলো বহির্নোঙরে অবস্থান করে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে এসব জ্বালানি তেল খালাস করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন নিজস্ব দুইটি জাহাজে এই জ্বালানি তেল লাইটারিং করছিল। কিন্তু এক মাসের ব্যবধানে দুইটি অয়েল ট্যাংকারই অগ্নিকাণ্ড এবং বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইতোমধ্যে এগুলো বহর থেকে বাদ দিয়ে স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয়। ফলে চুক্তি অনুযায়ী তেল লাইটারিং করার জন্য বিএসসি বিদেশ থেকে ভাড়া করে একটি জাহাজ আনে। যেই জাহাজটি দিয়েই বর্তমানে আমদানিকৃত ফিনিসড ও ক্রুড অয়েল লাইটারিং করা হচ্ছে।
বহির্নোঙর থেকে গুপ্তাখালস্থ জেটি পর্যন্ত জ্বালানি তেল লাইটারিং করতে বিপুল অর্থ খরচের পাশাপাশি প্রচুর সময়ও লাগে। এভাবে ১ লাখ মেট্রিকটন জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ খালাসে ১০–১১ দিন এবং ৩০ হাজার মেট্রিকটন ডিজেলবাহী জাহাজ খালাসে ৪–৫ দিন সময় লাগে। এই পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল খালাস সময়সাপেক্ষ, ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল হওয়ায় বড় জাহাজ থেকে সরাসরি তেল খালাসের জন্য ‘ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপলাইন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। ২০১৫ সালের নভেম্বরে নেওয়া ওই প্রকল্পের মাধ্যমে গভীর সাগরে নোঙর করা বড় বড় মাদার ভ্যাসেল থেকে পাইপলাইনে জ্বালানি তেল ইস্টার্ণ রিফাইনারীতে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হয়। এতে একটি পাইপ লাইনে ডিজেল এবং অপর পাইপ লাইনে ক্রুড অয়েল আনার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজারের মহেশখালীল মাতারবাড়ী দ্বীপের স্টোরেজ ট্যাঙ্ক থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে সাগরে ভাসমান বয়াটির অবস্থান। ২২০ কিলোমিটার সমান্তরালে দুটি পাইপলাইনের সঙ্গে সেটি সংযুক্ত। এর মধ্যে ১৪৬ কিলোমিটার পাইপলাইন অফশোর বা সাগরের তলদেশে এবং ৭৪ কিলোমিটার পাইপলাইন অনশোর বা স্থলভাগে স্থাপন করা হয়েছে। এসপিএম থেকে ৩৬ ইঞ্চি ব্যসের দুটি আলাদা পাইপলাইন ইস্টার্ণ রিফাইনারী পর্যন্ত নিয়ে আসা হয়।
বড় জাহাজ থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল প্রথমে মহেশখালীর ট্যাঙ্ক টার্মিনাল, পরে সেখান থেকে পতেঙ্গায় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির ট্যাঙ্ক টার্মিনালে নিতে এগুলো স্থাপন করা হয়েছে। চীনের অর্থায়ন ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডের মাধ্যমে এসপিএম প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। এতে ব্যয় হয় ৮ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। প্রকল্পটির কাজ শেষে কমিশনিং এবং পরীক্ষা নিরীক্ষাও করা হয়েছে।
এই টার্মিনালটি ঠিকঠাকভাবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করে পরিচালনার মতো লোকবল বিপিসির নেই। ইতোমধ্যে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান চীনের চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড তিন বছরের জন্য এসপিএম পরিচালনার আগ্রহ প্রকাশ করে। বিষয়টি নিয়ে কিছু আলাপ আলোচনাও হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের না দিয়ে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে অপারেটর নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, পাইপ লাইনটি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বুঝে নিয়েছে। কিন্তু তাদের কাছে এটি পরিচালনার মতো অভিজ্ঞ লোকবল নেই। তাই বিপিসি উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়ার পর পাইপ লাইনে জ্বালানি তেল আনার কার্যক্রম শুরু হবে। তবে শঙ্কার কথা হচ্ছে, চীনা কোম্পানি পাইপ লাইন বুঝিয়ে দিয়েছে। তাদের যে দেড় বছরের গ্যারান্ট্রি পিরিয়ড় ছিল সেটিও শেষ হয়ে গেছে। এই দেড় বছরের মধ্যে পাইপ লাইনে কোনো সমস্যা হলে তা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ঠিকঠাক করে দিতো। এখন কোনো সমস্যা হলে তা বিপিসিকেই নিজস্ব অর্থায়নে করতে হবে।
বিপিসির দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স ঠিকাদার নিয়োগের প্রয়োজনীয় টেন্ডার ডকুমেন্টস তৈরিসহ আনুষঙ্গিক কাজ করার জন্য আইএলএফ নামের একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ওই প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে টেন্ডার ডকুমেন্টস তৈরি করে টেন্ডার আহ্বান করে। টেন্ডারে চীনের সিপিপিইসি, ইন্দোনেশিয়ার পারটামিনা এবং চীন ও হংকংয়ের হিলং অফসোর ইঞ্জিনিয়ারিং নামের তিনটি কোম্পানি অংশগ্রহণ করে। গত বেশ কিছুদিন ধরে এসব টেন্ডার যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। দ্রুত এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত নেয়া না হলে ঠিকাদার নিয়োগে আরও সময় লাগবে বলে মন্তব্য করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, ঠিকাদার নিয়োগের পরই কেবল সাগর থেকে পাইপ লাইনে জ্বালানি তেল সংগ্রহের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে। যাতে জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি বিপিসির বছরে অন্তত ৮শ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলেও তারা মন্তব্য করেছেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত অপারেটর নিয়োগ ও পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে পারলেই এই ৮ হাজার কোটির বেশি টাকার বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল মিলবে।











