পরিবেশের ক্ষতি করে কোনো উন্নয়নই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, পরিবেশের সঙ্গে মানুষের জীবন ও জীবিকা সরাসরি সম্পৃক্ত। গাছপালা, নদী–খাল, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ ও জীববৈচিত্র্য–সবকিছু মিলেই প্রকৃতির ভারসাম্য তৈরি হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ দ্রুত উন্নয়ন করলেও পরিবেশের উপর এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ফলশ্রুতিতে পরিবেশগত ক্ষতি মোকাবিলায় বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। চীনসহ বিভিন্ন দেশ শিল্পায়ন ও উন্নয়নের পাশাপাশি নদী, খাল ও জলাশয় পরিষ্কার এবং পরিবেশ পুনরুদ্ধারে ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এ অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশকেও শিক্ষা নিতে হবে।
তিনি গতকাল দুপুরে নগরের লালদিঘী ময়দানে অনুষ্ঠিত বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা–২০২৬ এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন ভূমি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, চট্টগ্রাম–৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, চট্টগ্রাম পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দে। সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের আয়োজনে ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ‘বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে শুরু হওয়া ১৫ দিনব্যাপী এ বৃক্ষমেলা চলবে আগামী ২৫ আগস্ট পর্যন্ত।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রামে বিপুল সংখ্যক গাছ লাগানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমান সরকার সবুজায়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ। তাই বৃক্ষরোপণের ওপর আলাদা জোর দিয়েছে। প্রতিটি এলাকায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চলবে।
এ সময় ২৫ কোটি চারা রোপণের সরকারের যে পরিকল্পনা রয়েছে তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বৃক্ষরোপণ বাংলাদেশে নতুন কোনো বিষয় নয়। ছোটবেলা থেকেই মানুষ বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব সম্পর্কে জেনে আসছে। তবে একসঙ্গে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর যে বৃহৎ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। একটি লক্ষ্য নির্ধারণের পর সেটি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সম্পৃক্ত হতে হবে। ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য বাস্তবায়নে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু গাছ লাগালেই হবে না, গাছকে ভালোবাসতে হবে এবং এর বেড়ে উঠার দায়িত্বও নিতে হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছপালা, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ ও জীববৈচিত্র্যকে সমান গুরুত্ব দিয়ে একটি সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
আমির খসরু বলেন, এখন বর্ষাকাল হওয়ায় রোপণ করা গাছগুলো সহজেই পানি পাচ্ছে। কিন্তু শুষ্ক মৌসুম শুরু হলে গাছগুলোর নিয়মিত পরিচর্যা, পানি দেওয়া ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। সঠিক গাছ নির্বাচন এবং সময়মতো পরিচর্যা না করলে বৃক্ষরোপণের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। তাই গাছ লাগানোর পাশাপাশি গাছ বাঁচানোর দায়িত্বও নিতে হবে।
এ সময় মন্ত্রী থাইল্যান্ডের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, সেখানে শিশুর জন্মের সাথে সাথে একটি গাছ লাগানোর সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ফলে শিশুর সঙ্গে গাছটিরও একটি পারিবারিক ও আবেগের সম্পর্ক তৈরি হয়। বাংলাদেশে বৃক্ষরোপণকে এমন একটি সামাজিক ও পারিবারিক সংস্কৃতিতে পরিণত করা গেলে গাছের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ আরো বাড়বে।
ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বন বিভাগের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, অতীতের কাগজ–কলমের তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাওয়া না যাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার গাছ কেটে বাইরে বিক্রির অপচেষ্টার কারণে আজ পরিবেশ ধ্বংসের মুখে পড়েছে। কিন্তু আমরা এই ধরনের ফাঁকিবাজি বরদাশত করব না। আমরা যা বলব, তা বাস্তবে কার্যকর হতে হবে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, অতীতে যে পরিমাণ বন উজাড় করা হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ করতে হলে প্রয়োজন ব্যাপক বৃক্ষরোপণ, এর কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, দূরদর্শী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবেই দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রতিটি পরিবার যদি তাদের সন্তানের নামে একটি করে বৃক্ষ রোপণ ও পরিচর্যা করে, তবে তা দেশের পরিবেশ পুনরুদ্ধারে এক বিপ্লব ঘটাবে এবং একটি সবুজ ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলবে। কথার চেয়ে কাজে বিশ্বাসী বর্তমান সরকার দেশে সবুজ, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে ঘোষিত ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি যেকোনো মূল্যে বাস্তবায়ন করবে। তিনি চট্টগ্রামের প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ উদ্যোগে অন্তত একটি করে চারা রোপণ করে এই ঐতিহাসিক কর্মসূচিতে শরিক হওয়ার আহ্বান জানান।
মীর হেলাল বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সরকার। জনগণের কাছে জবাবদিহি রক্ষা করেই আমরা রাষ্ট্র পরিচালনা করছি। আমরা যা বলি, তা বাস্তবে রূপ দান করি। শুধু সরকারের মুখের দিকে তাকিয়ে না থেকে সাধারণ মানুষকেও নিজ উদ্যোগে বৃক্ষরোপণে এগিয়ে আসতে হবে। এ সময় তিনি নিজের এলাকাতেও ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিপুল পরিমাণ বৃক্ষরোপণের কথা উল্লেখ করে সবাইকে উৎসাহিত করেন।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বৃক্ষমেলায় ৫৮টি নার্সারি ও স্টল রয়েছে। এখানে মিলছে ফলদ, বনজ ও ওষুধি নানা প্রজাতির চারা এবং মাঝারি আকারের গাছ।











