১১ মাসে ৩২ লাখ কন্টেনার হ্যান্ডলিং অর্থবছর শেষে নতুন মাইলফলকের আশা

বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও রেকর্ডের পথে চট্টগ্রাম বন্দর

হাসান আকবর | সোমবার , ১৫ জুন, ২০২৬ at ৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বৈশ্বিক অর্থনীতির মন্থর গতি, জাহাজ চলাচল ব্যয় বৃদ্ধি এবং শ্রমিক আন্দোলনের মতো নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও দেশের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর চলতি ২০২৫২৬ অর্থবছরে নতুন রেকর্ড গড়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। কন্টেনার, কার্গো ও জাহাজ হ্যান্ডলিং মিলে তিনটি সূচকেই অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দর সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই ২০২৫ থেকে মে ২০২৬) বন্দরে ৩২ লাখ ২০ হাজার টিইইউএস কন্টেনার, ৯ কোটি ৯৫ লাখ টন কার্গো এবং ৩ হাজার ৯৫২টি জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় তিনটি খাতেই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের পূর্বাভাস অনুযায়ী, জুন মাসের কার্যক্রম শেষে চলতি অর্থবছরে মোট কন্টেনার হ্যান্ডলিং ৩৫ লাখ ৪২ হাজার টিইইউএস, কার্গো খালাস ১০ কোটি ৬৯ লাখ টন এবং জাহাজ হ্যান্ডলিং ৪ হাজার ৩১৭টিতে পৌঁছাতে পারে। লক্ষ্য অর্জিত হলে এটি হবে চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ কার্যক্রমের নতুন রেকর্ড।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা বলেন, ‘চলতি অর্থবছরে ৪ হাজার ৩০০টির বেশি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসবে বলে আমরা আশা করছি। কন্টেনার, কার্গো এবং জাহাজ হ্যান্ডলিংসব ক্ষেত্রেই অতীতের রেকর্ড অতিক্রম করা সম্ভব হবে।

দেশের মোট আমদানিরপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯৩ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিচালিত হয়। তৈরি পোশাক, ভোগ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি ও কৃষিপণ্যের বড় অংশ এই বন্দর দিয়েই দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ ও বিদেশে রপ্তানি হয়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বন্দরের কার্যক্রমে প্রবৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। কারণ আমদানিরপ্তানি বৃদ্ধি, শিল্প উৎপাদন সমপ্রসারণ এবং ভোক্তা চাহিদা বৃদ্ধির প্রতিফলন দেখা যায় বন্দরের পরিসংখ্যানে। বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, আমদানিরপ্তানি কার্যক্রম ধীরে ধীরে বাড়ছে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি স্থিতিশীল সরকারের প্রতি আস্থা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অব্যাহত থাকলে আগামী বছরগুলোতে বাণিজ্য আরও সমপ্রসারিত হবে। তারা বলেন, বন্দর কোনো অবস্থাতেই বন্ধ রাখা উচিত নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি আমদানিনির্ভর। শিল্পকারখানার কাঁচামাল থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে বন্দরকে ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহে সাত দিন সচল রাখতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, চলতি অর্থবছরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নানা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, লোহিত সাগর ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি, জাহাজ পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতির চাপ আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছে। এ ছাড়া দেশের অভ্যন্তরেও বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিকদের কর্মসূচি ও ধর্মঘটের ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও আমদানিরপ্তানি কার্যক্রম বড় ধরনের বিঘ্ন ছাড়াই অব্যাহত থাকায় বন্দরের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।

বন্দরের কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েক বছরে বেটার্মিনাল প্রকল্পের প্রস্তুতি, পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল চালু, ইক্যুইপমেন্ট আধুনিকায়ন, ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনায় উন্নয়ন এবং ডিজিটাল সেবা সমপ্রসারণের ফলে বন্দরের অপারেশনাল সক্ষমতা বেড়েছে। বন্দরে বর্তমানে জাহাজের গড় অবস্থানকাল ও কন্টেনার খালাস প্রক্রিয়া আগের তুলনায় দ্রুততর হয়েছে। ফলে একই অবকাঠামো ব্যবহার করেও অধিক পরিমাণ কন্টেনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং সম্ভব হচ্ছে।

বন্দর কর্মকর্তারা জানান, ভবিষ্যৎ চাহিদা মোকাবিলায় বেটার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, লালদিয়া কন্টেনার টার্মিনাল এবং নতুন জেটি নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব প্রকল্প সম্পন্ন হলে দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যে নতুন গতি আসবে।

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক প্রকাশনা সংস্থা লয়েডস লিস্টের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ব্যস্ততম ১০০ কন্টেনার পোর্টের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান অবস্থান ৬৮তম। চলতি অর্থবছরে কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ আগামী এক দশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ও রপ্তানি কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ে ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ, কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ১৬ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং জাহাজ আগমনে ৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে। তবে ব্যবসায়ী নেতারা মনে করেন, এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শ্রমিক অসন্তোষের দ্রুত সমাধান, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বন্দরের ডিজিটাল রূপান্তর আরও জোরদার করতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচেম্বার সংকট লাঘবে কোর্টহিলে প্রতীকী মূল্যে জমি বরাদ্দ চায় আইনজীবী সমিতি
পরবর্তী নিবন্ধফেরানো হবে কীভাবে?