হরমুজ প্রণালিতে একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। হেলিকপ্টারটি গুলি করে নামানোর জন্য তেহরানকে দায়ী করে ইরানের ভেতরে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা জবাব হিসেবে বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। দুই পক্ষের এই হামলা–পাল্টা হামলার মধ্যেই একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে চুক্তি করতে দেরি করার ‘খেসারত’ দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি নিরাপদ থাকতে যুক্তরাষ্ট্রকে পুরো অঞ্চল ছেড়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সোমবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় হরমুজ প্রণালিতে একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হয়। হেলিকপ্টারটিতে থাকা দুই ক্রু সদস্যকে পরবর্তীতে উদ্ধার করা হয়। সেন্টকমের দাবি, হেলিকপ্টারটি ইরানের আগ্রাসনের শিকার হয়েছে এবং এর জবাব দিতেই তারা সামরিক অভিযান চালিয়েছে। গত মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকেল পাঁচটার দিকে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা শুরু করে মার্কিন বাহিনী। বাংলাদেশ সময় তখন রাত তিনটা। এক বিবৃতিতে সেন্টকম জানায়, এই অভিযান ইরানের চালানো ‘অযৌক্তিক আগ্রাসনের সমানুপাতিক জবাব’। মার্কিন বাহিনীর হামলার সময় পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির উপকূলবর্তী বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, হামলাগুলো মূলত ইরানের প্রতিরক্ষা ও রাডার অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বন্দর আব্বাস, কেশম ও সিরিকসহ উপকূলীয় এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে বলেন, আমাদের হেলিকপ্টারের সঙ্গে তারা যা করেছে, এটি তার জবাব। আমার মনে হয় প্রতিক্রিয়াটি খুবই শক্তিশালী এবং জোরালো হওয়া উচিত, আর এই হামলাটি ঠিক তেমনই। সেন্টকম আরও জানায়, ভূপাতিত হেলিকপ্টারের দুই ক্রুকে উদ্ধার করতে একটি বিশেষ ধরনের আনম্যানড সারফেস ভেহিকল বা চালকবিহীন সমুদ্রযান ব্যবহার করা হয়েছে। এই প্রথমবারের মতো মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রকাশ্যে স্বীকার করল যে এমন অভিযানে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। সোমবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৩৩ মিনিটে উদ্ধার অভিযান সম্পন্ন হয়। এতে নেতৃত্ব দেয় ইউএস নেভাল ফোর্সেস সেন্ট্রাল কমান্ড এবং ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন। অভিযানে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের টাস্ক ফোর্স–৫৯সহ নৌ ও বিমানবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট অংশ নেয়। বাহরাইনভিত্তিক টাস্ক ফোর্স–৫৯ পরিচালিত একটি চালকবিহীন সমুদ্রযান প্রথমে দুই ক্রুকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে হেলিকপ্টারে করে তাদের সরিয়ে নেওয়া হয়।
ইরানি গণমাধ্যমও হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা নিশ্চিত করেছে। তবে দেশটি সরাসরি দায় স্বীকার করেনি। আধা–সরকারি মেহর নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, এ বিষয়ে তেহরানের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা জবাবের ঘোষণা দেয় আইআরজিসি। গতকাল বুধবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বাহিনীটি জানায়, তারা বাহরাইনে অবস্থানরত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর, কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি এবং জর্ডানের আজরাক বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। আইআরজিসির দাবি, মোট ২১টি মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। এর মধ্যে জর্ডানে একটি এফ–৩৫ যুদ্ধবিমানের হ্যাঙ্গারসহ চারটি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে। একইসঙ্গে ইরানের জাম শহরের আকাশে একটি মার্কিন এমকিউ–৯ ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করার দাবিও করেছে তারা। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মার্কিন হামলায় সিরিক এলাকায় একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দুটি পানির ট্যাংক ধ্বংস হয়েছে। আইআরজিসি সতর্ক করে বলেছে, মার্কিন বাহিনীর যে কোনো সামরিক পদক্ষেপের ‘চূড়ান্ত ও বিধ্বংসী’ জবাব দিতে তাদের সব ইউনিট প্রস্তুত রয়েছে। উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেলে এর দায়–দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে ওয়াশিংটনকে বহন করতে হবে বলেও উল্লেখ করা হয়। তবে আইআরজিসির এসব দাবির বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে আজরাক বিমানঘাঁটির দিকে ছোড়া পাঁচটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তারা আকাশেই ধ্বংস করে দিয়েছে। তাদের দাবি, ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকলেও কোনো হতাহত বা উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। ইরানের হামলার পর বাহরাইন ও কুয়েতে বিমান হামলার সতর্কতা জারি করা হয় এবং সাইরেন বাজানো হয়। কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা শত্রুভাবাপন্ন আকাশযান প্রতিহত করেছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
হামলা–পাল্টা হামলার এই পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এঙে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয়ের মুখোমুখি হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র আমাদের দৃঢ়তা ও সংকল্পকে পরীক্ষা করার পথ বেছে নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী কোনো হামলা বা হুমকির জবাব না দিয়ে ছেড়ে দেবে না। নিরাপদ থাকতে চাইলে আমাদের অঞ্চল ছেড়ে চলে যান। আরাগচি তার পোস্টে পারস্য উপসাগরের ইতিহাসে বহিরাগত শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপের পরিণতির কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। পোস্টের সঙ্গে তিনি হরমুজ প্রণালির একটি ছবিও যুক্ত করেন, যেখানে লেখা ছিল-‘ফরএভার পার্সিয়ান গালফ’।
চলমান সংকটের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবারও ইরানকে লক্ষ্য করে কড়া বক্তব্য দিয়েছেন। গতকাল বুধবার ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ইরানের সামরিক বাহিনী এখন অগোছালো অবস্থায় আছে। তাদের নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর বড় অংশ কার্যত আর নেই। তারা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি আরও লেখেন, ইরান শুধু কথা বলে, কাজ করে না। মধ্যপ্রাচ্যের বুলি এখন পরাজিত। পোস্টের শেষাংশে ট্রাম্প বলেন, ইরানের জন্য খুবই ভালো সুযোগ ছিল একটি চুক্তি করার। কিন্তু তারা আলোচনায় অনেক বেশি সময় নিয়েছে। এখন এর খেসারত দিতে হবে।
উল্লেখ্য, গত এপ্রিলে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে কয়েক দফা পাল্টাপাল্টি হামলার পর একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। সামপ্রতিক ঘটনাগুলো সেই যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। এর মধ্যেই ট্রাম্প দাবি করেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, আমরা এমন একটি চুক্তির একেবারে শেষ পর্যায়ে রয়েছি, যা খুবই ভালো হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তিটি সম্পন্ন হতে আরও ‘দুই বা তিন দিন’ সময় লাগতে পারে এবং এরপর হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে। তবে সর্বশেষ হামলা–পাল্টা হামলার পর সেই কূটনৈতিক অগ্রগতি কতটা টেকসই থাকবে, তা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।












