মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ড পাওয়া ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত সারতে ভারতের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। একইসঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের ফিরিয়ে দিতেও আর্জি জানানো হয়েছে।
গতকাল সোমবার সকালে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকে এসব অনুরোধ জানানো হয় বলে জানিয়েছেন সরকারপ্রধানের উপ–প্রেস সচিব শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীন। তিনি বলেন, বৈঠকে বাংলাদেশ আশা করে, ভারত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে। একই সঙ্গে শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হত্যাকারীদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়েও ভারতের প্রতি অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। খবর বিডিনিউজের। এদিন বেলা ১১টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথমবারের মতো সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতের হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। সাক্ষাতের সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন।
উপ প্রেস সচিব স্বাধীন বলেন, দুই দেশের দ্বি–পাক্ষিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান দুই দেশের এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো এগিয়ে নিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি জানান, ভারতের নতুন হাই কমিশনারকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী। ঢাকায় গেল দুই মাসের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন ত্রিবেদী।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্রিফিং : প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের হাই কমিশনারের বৈঠকের বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান পরে মন্ত্রণালয়ে ব্রিফ করেন। তিনি বলেন, দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ করার বিষয়ে বিষয়টি উঠে এসেছে এবং আমরা তাদেরকে বলেছি এই প্রত্যর্পণ প্রসেস ত্বরান্বিত করার জন্য। আমরা আশা করি ভারত এ ব্যাপারে পজিটিভ সাড়া দেবে। এছাড়া শহীদ হাদীর সাসপেক্টেড হত্যাকারীরা ধরা পড়েছে। ভারত যে সমস্ত কাগজপত্র চেয়েছিল সবই তাদেরকে দিয়েছি। এই বিষয়টা এসেছে। আমাদের জন্য এটাও তো অত্যন্ত সেনসিটিভ বিষয়। এবং আমরা বলেছি এই হত্যাকারীদেরকে যত দ্রুত সম্ভব আমাদের কাছে প্রত্যর্পণ করার জন্য।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে এনাবলিং এনভায়রনমেন্ট দরকার, সেই ধরনের পরিবেশ সৃষ্টির ব্যাপারেও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এক প্রশ্নে খলিলুর বলেন, ৫ আগস্টের ব্যাপারে আমাদের যে পজিশন, আমরা ক্লিয়ারলি বলে দিয়েছি। এবং সেটা গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করেছেন ভারতের কর্তৃপক্ষ, সেটা আমাকে গতকালকেও তারা জানিয়েছেন, আজকেও তারা প্রধানমন্ত্রীকে সেটা বলেছেন।
সেটা নিয়ে ভারত দুঃখ প্রকাশ করেছে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, না দেখুন, এখানে দুঃখ প্রকাশ, সে ধরনের তো নয়। আপনাকে একটা জিনিস ভালো করে বুঝতে হবে, কী হয়েছে জিনিসটা। একটা রাষ্ট্রের তিনটা স্তম্ভ থাকে। নির্বাহী, আইন প্রণয়ন এবং বিচার বিভাগ। দণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনা, তার জায়গা হচ্ছে জুডিশিয়ারি। বাংলাদেশের একটা কম্পিটেন্ট কোর্ট তার বিচার করেছে, তাকে দণ্ড দিয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির বিষয়ে কী হয়? তাকে কাস্টডিতে নেওয়া হয় এবং তার যদি কিছু বক্তব্য থাকে, আত্মপক্ষ সমর্থনের কিছু থাকে, সেটা আদালতে বলবে। তো ৫ তারিখে হাসিনা যে কাজটি করেছে, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশের জুডিশিয়ারির… রাষ্ট্রের একটি স্তম্ভ, তার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করেছে। এবং সেই কাজটি ভারত সরকার করতে দিয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমার ধারণা হচ্ছে, তারা জিনিসটা বুঝতে পেরেছেন। এবং আশা করব যে আমাদের রাষ্ট্রের কোনো স্তম্ভকে আন্ডারমাইন করার কিছু তারা আর করবেন না। সীমান্ত হত্যা ও পুশ ইন নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এগুলো খুব সংক্ষেপে আমরা বলেছি। এগুলো তো প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনার নয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ : বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক আগামী দিনে ভালোর দিকেই যাবে বলে আশাবাদী ভারতের নতুন হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি বলেছেন, আমি বলতে পারি, কনফিডেন্টলি বলতে পারি, এমন কোনো ইস্যু নাই যা আমরা বসে সলভ করতে পারি না।
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ত্রিবেদী। তার আগে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথমবার সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ভারতের হাই কমিশনার বলেন, আমি খুবই আনন্দিত। উনার সঙ্গে আমার দেখা হলো। আর দেখা হওয়ার সাথে সাথে মনে হয়নি যে প্রথমবার আমি দেখা করছি। খুবই ভালো, খুবই হাম্বল, অন দ্যা গ্রাউন্ড। খবর বিডিনিউজের।
হাই কমিশনার আশা প্রকাশ করেন, আমার মনে হচ্ছে, আগামী দিন ভালোই হবে। আলোচনার মধ্য দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করার আশা প্রকাশ করে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, পিপল টু পিপল আলোচনা হবে। উই আর লুকিং ফরওয়ার্ড। আমি আগেও বলেছি, ভারতের জনগণ এবং প্রধানমন্ত্রী সামনের দিকে তাকিয়ে আছেন এবং আমরা ইতিবাচক। দুজন লিডার একসাথে বসলে আলোচনা হবে। ডেমোক্রেসিতে ইস্যুজ থাকবে। ইস্যু না থাকলে ওইটা ডেমোক্রেসি না।
তিনি বলেন, আমাদের ইস্যু হবে, বাংলাদেশের ইস্যু হবে, কিন্তু মানুষের ইস্যু একটাই, সেটা ভালো সম্পর্ক। আর সম্পর্ক ভালো হলে…. আমাদের যা সিচুয়েশন হিস্টোরিক্যালি, ওটা তো আপনি বদলাতে পারবেন না। নেইবার তো বদলাতে পারবেন না। ইস্যুটা সর্ট আউট করতেই হবে। আই অ্যাম ভেরি কনফিডেন্ট, আই অ্যাম ভেরি ভেরি কনফিডেন্ট।
পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান মতপার্থক্যের সমাধানে আন্তরিকতার সাথে এগিয়ে আসতে ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য বা ইস্যু রয়েছে, যেগুলো পারস্পরিক সহযোগিতা ও আলাপ–আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। সমতার ভিত্তিতে আলাপ–আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে হবে। তবে এ বিষয়ে ভারতকে আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভৌগোলিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটসহ নানা দিক থেকে বাংলাদেশ ও ভারত একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। অতীতকে পেছনে ফেলে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে সুদৃঢ় করতে একটি নতুন সূচনা বা ফ্রেশ স্টার্ট জরুরি। দুই দেশের মধ্যে কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য বা ইস্যু রয়েছে, যেগুলো পারস্পরিক সহযোগিতা ও আলাপ–আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে ভারতের হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। আমরা কেবল ভৌগোলিক সীমানা ভাগাভাগি করি না, আমরা সমৃদ্ধির স্বপ্নও ভাগাভাগি করি, বলেন ত্রিবেদী।












