স্মৃতিতে চট্টল তত্ত্ববিদ আবদুল হক চৌধুরী

ডেইজী মউদুদ | সোমবার , ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ at ৬:৪০ পূর্বাহ্ণ

পরনে শ্বেত শুভ্র ফতুয়া আর লুংগী, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, মাথায় ছাতি আর কাঁধে একটি থলে, লম্বা চওড়া বিশাল দেহের অধিকারী। উন্নত নাসা, তীক্ষ্ণ ও অনুসন্ধানী দৃষ্টি অথচ শিশুর মতো সহজ সরল যাকে আমি খুব কাছে থেকে দেখেছি আমৃত্যু, তিনি হলেন চট্টল তত্ত্ববিদ ও ইতিহাস অনুসন্ধানী চারণ লেখক আবদুল হক চৌধুরী। ইতিহাস গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আবদুল করিম আবদুল হক চৌধুরীর সাথে প্রথম পরিচয় পর্বটি অত্যন্ত চমৎকারভাবেই তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, “আজাদী পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ পাঠের মাধ্যমে তাঁর সাথে আমার প্রথম পরিচয়। তখন আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। উক্ত প্রবন্ধ পাঠ করে দেখি, তাঁর লেখায় সত্য অনুসন্ধানের প্রবল চেষ্টা আছে, আলোচনা যুক্তি নির্ভর, তাঁর লেখা অন্যান্য সাধারণ লেখা থেকে ব্যতিক্রম, তাই তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হই। খবর নিয়ে জানলাম, উনার এক পুত্র তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ওর মাধ্যমে লেখককে আমার সাথে দেখা করার অনুরোধ জানালাম। দেখি, দু একদিন পরেই তিনি এলেন। প্রথম দেখাতেই তাঁর প্রতি আকর্ষণ বেড়ে গেল, তিনি দীর্ঘ দেহী, লম্বা নাক, পরনে সাদা লুংগী, সাদা কোর্তা বা পাঞ্জাবী। আমি ইতিহাসের ছাত্র, নৃতত্ত্ব সম্পর্কে আমার ধারণা আছে, নৃতত্ত্বে নাক এবং মাথার খুলির যে বিশেষত্ব আছে তাও জানা ছিল। তাই প্রথম দেখতে মনে হল, এই লোকের পূর্ব পুরুষ আরবী, তুর্কী কিংবা মোগল আফগান না হয়ে যায় না। পরে জেনেছিলাম আমার ধারণাই সত্য, তিনি মধ্যযুগের কবি কোরেশী মাগনের বংশধর। তবে তাঁর ধমনীতে মোগল আফগান রক্তের মিশ্রণ থাকাও অসম্ভব না। লুংগীও একটি বিশেষত্ব। তাঁকে কোন সময়ই লুংগী পরিহিত ছাড়া দেখিনি। চট্টগ্রামী সংস্কৃতির অহংবোধই তাঁর লুংগী প্রীতি বলে মনে হয়”। এই মহান ব্যক্তিকে আমি দেখে আসছি আমার বোধশক্তি বিকাশের পর থেকে। আমার বাবা যখন গহিরা হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক, দোর্দণ্ড প্রতাপে তিনি শিক্ষকতা করছিলেন, অত্যন্ত দক্ষতা ও কড়া নিয়ম আর শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে গহিরা হাই স্কুলকে একটি সেরা বিদ্যাপীঠে উন্নীত করেছিলেন, তখন থেকেই আমার বাবার সাথে তাঁর বন্ধুত্ব পূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠে। তিনি তাঁর পুত্রদের গহিরা স্কুলে ভর্তি করান। উনার পুত্র শহীদুল আমীন চৌধুরী ও আমার আপা সহপাঠী ছিলেন। অন্য পুত্রেরাও বাবার ছাত্র। ফলে উনাদের পরিবারের সাথে অন্য রকম এক সম্পর্ক তৈরি হয়। তবে আমি তখন খুবই ছোট, গহিরার বাসায় বিশেষ করে আবার বাবা থাকা অবস্থায় উনার সাথে আমার কোন স্মৃতি কিংবা উনাকে দেখেছি বলে আমার মনে পড়ছে না। কিন্তু বন্ধনটা ছিল পারিবারিক এবং অনেক আন্তরিক। আমার বাবার আকস্মিক ও অকাল মৃত্যুর পরেও সেই বন্ধন অটুট ছিল। আমরা যখন আমার নানাবাড়িতে থিতু হয়েছি, দেখতাম মাঝে মাঝে কখনো হেঁটে হেঁটে, কখনো বা রিকশা চেপে আবদুল হক চৌধুরী আমাদেরকে দেখতে যেতেন। আমার মাকে সালাম দিতেন দূর থেকে, কুশল বিনিময় করতেন। আমি তখন হাই স্কুলে পড়ছি। হয়তো সেভেন/ এইটে। একটি মজার ঘটনা খুবই মনে পড়ে। সম্ভবত ১৯৭৫ সালে উনার মেজো ছেলে পুলিশ অফিসার ভাই এর বিয়ের সময়। এর আগে তিনি উনার জন্য পাত্রী খুঁজতে প্রায় আমার মায়ের কাছে আসতেন। আমার মায়ের মামাতো বোনেরা ছিল বিবাহ যোগ্যা। যেমন রূপসী, তেমন খান্দানী পরিবারের। আমার মামা সাংবাদিক আতাউল হাকিম সাহেবের বোনেরা। তিন বোন পিঠাপিঠি জেসমিন, পারভীন আর নাসরীন। উনারও ছেলেরা পিঠাপিঠি। তিনি প্রতিটি ছেলের বিয়ের আগেই আমার মায়ের কাছে আসতেন, উদ্দেশ্য প্রথমতঃ আমাদের খবর নেয়া, দ্বিতীয়ত এই পরিবারের তিন বোনের যে কোন একজন কে পুত্র বধূ করার প্রবল বাসনা। আমার মাও বার বার প্রস্তাব দিয়ে শেষে ক্ষান্ত দেন। আসলে আল্লাহর হুকুম নেই। যার জুটি যেখানে তিনি তো নির্ধারণ করেই রেখেছেন। তবে প্রতি বিয়ে শাদীতে তিনি আমাদের বাড়িতে এসে দাওয়াত দিয়ে যেতেন। যেটি বলতে চেয়েছিলাম পুলিশ আমীন ভাইয়ের বিয়েতে আমরা (নাইউরি) নাইউর যাবো। আগে থেকেই বলা ছিল, কোনদিন আমাদেরকে নিতে আসবে! আমরা রেডি স্যুটকেস ভর্তি কাপড় চোপর, আমার মা বিয়ে বাড়িতে নেয়ার জন্য নাস্তাও বানিয়েছিলেন। আমরা তিন বোন খুশিতে আটখানা। আমি কিশোরী, লাকি লুসি ছোট আর পপী আরও ছোট। দেখি, আবদুল হক চৌধুরী উনার ছেলে মনসুরুল আমীন ভাই কে পাঠিয়েছেন একটি বেবী ট্যাক্সি নিয়ে,আমাদেরকে নেয়ার জন্য। আমরা মায়ের সাথে পেছনে বসলাম,আর মনসুর ভাই সামনে ড্রাইভার এর পাশে বসেছিলেন। খুব বেশি দূরত্ব না, রাউজান থেকে গহিরা পেরিয়ে সামান্য গেলেই উনাদের গ্রাম নোয়াজিশপুর। সে এক মজার স্মৃতি। বিয়ে বাড়িতে এলাহি কাণ্ড। উনার মেয়ে ডলি আমার বান্ধবী।

তৌহিদ আর ডলি একই ক্লাসে পড়তো যথা সম্ভব। আমরা একসাথেই ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছি। ডলি আর তৌহিদ পরীক্ষা দিয়েই আমার সেন্টার–এ এলো আমার সাথে দেখা করতে। যাক, বিয়ে বাড়িতে আনন্দ ঘন পরিবেশ। ঘর ভর্তি নাইউরি। রাতদিন খানাপিনা চলছে। বিয়ে কোথায় হয়েছিল মনে নেই। বাড়িতে বউ ফিরানির দিনে বিশেষ আয়োজন মনে আছে। শহর থেকে অনেক গেস্ট এসেছিল, বড় আমীন ভাবীর বোনেদের সাথে প্রথম পরিচয় হলো, জলি আপা, নিশাত আমার ছোট, সেদিনই দেখেছিলাম। নিশাতের (ফেসবুকের পরিচিত মুখ) মনে আছে কি না জানি না। বউ ফিরানির পরের দিন আস্তে আস্তে নাউউরিদের বিদায়ের পালা শুরু। আমরাও বাড়ি ফিরবো। আবার বেবী টেক্সি এলো। প্রচুর পিঠাপুলি, ক্ষেতের আলু, ফেলন আর কলাই ডাল সহ কতকিছু পোটলায় বেঁধে দিলেন। এই ঘটনা উল্লেখ করলাম এজন্য, উনাদের পরিবারের সাথে আমাদের যে আন্তরিক বন্ধন, তা অনেকেরই অজানা। এর পর সুখে দুখে কেটে যায় বেলা। কিন্তু ইউনিভার্সিটি ভর্তি হয়ে মনজু ভাই, মনসুর ভাই আর তৌহিদকে পাই। প্রায় দেখা হতো মনসুর ভাই, মুজিব ভাইয়ের সাথে উনাদের ডিপার্টমেন্টের সামনে। আমি শিপ্রা সেদিকে কেন যেনো ঘুর ঘুর করতাম। একদিন ভার্সিটিতে বাসের অপেক্ষায় ছিলাম, মনজুরুল আমীন ভাইয়ের সাথে দেখা। আমি কী ভাবে বাসায় ফিরবো জানতে চাইলেন। পরে একই বাসে করে তিনি আমাকে আমাদের প্যারেড কর্নারের বাসায় নামিয়ে দিলেন। ভাড়াটাও দিয়ে দিয়েছিলেন। আরো পরে আমি সংসারি হলে, আমার শ্বশুর পরিবারে গেলে, দেখি সেই বাড়িতে আবদুল হক চৌধুরী প্রায় সময় আসতেন। আমার শ্বশুর এর সাথে নানা বিষয়ে আলাপ করতেন। ক্রমে আমি সাংবাদিকতা শুরু করলে, তিনি প্রতিনিয়ত অফিসে আসতেন, ঢুকেই বলতেন, ‘ডেইজী না! মউদুদ, ক্যান আছে? যতোবার আসতেন ততবারই একই কথা বলতেন। আমার মায়ের খবরও নিতেন। উনার মৃত্যুর পরে মেজবান এ আমাকে আর আমার মাকে দাওয়াত দিয়েছিলেন বড় আমীন ভাই। আমি আর আমার মা উনাদের সিএন্ডবি কলোনীর বাড়িতে গিয়েছিলাম। আমীন ভাই, তখন উনার মাকে, বলেছিলেন, অ মা ইবা ডেইজী। ও এখন সাংবাদিক। লেখা লেখে, অনুষ্ঠানত বক্তব্য দেয়, আবার টিভিত যায়। তার মানে উনি, আমার এই অবস্থানে অনেক খুশি ছিলেন। আসলে তখন বয়স কম ছিল এরকম গুণী মানুষের সাথে একটি ছবি তুলে রাখার চিন্তাও মাথায় আসেনি। যা আজ আমার কাছে মহামূল্যবান হয়ে থাকতো। উনার ইতিহাস অনুসন্ধানী স্পৃহা, গ্রামে গঞ্জে ঘুরে ফিরে ইতিহাসের রত্ন ভাণ্ডার সংগ্রহের কাহিনি, এবং চট্টগ্রামের নানান ঘটনাবলীকে অত্যন্ত নিখুঁত ও সত্যনিষ্ঠভাবে তুলে ধরে গ্রন্থবদ্ধ করে অজস্র বই রচনা, চট্টগ্রামের ইতিহাসকে দিয়েছে ভিন্ন এক মাত্রা। আমি উনার কোন এক মৃত্যুবার্ষিকীতে সেসব বিষয়ে আলোকপাত করেছিলাম। আজকের লেখা টা স্মৃতিচারণমূলক। অনেক অনেক স্মৃতি। কোনটা রেখে কোন টা লিখি। সামান্যই উল্লেখ করলাম। আজ ২৬ অক্টোবর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। আমি গভীর শ্রদ্ধা ভরে ইতিহাস অনুসন্ধানী এই চারণ লেখক কে স্মরণ করছি। তিনি চট্টগ্রামের গ্রামে গঞ্জে মাঠে হাটে বাটে ঘুরে ঘুরে ইতিহাসের যেই অমূল্য রত্নরাজি তুলে এনে গভীর সাধনায় মগ্ন থেকেছেন, এগুলোকে লিপিবদ্ধ করে এক বিশাল অবদান রেখে গেছেন, যা অত্যন্ত মূল্যবান হিসেবে আজীবন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে জ্বলজ্বল করবে ইতিহাসের পাতায়।

লেখক: সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামের সড়কে অবৈধ যানবাহন : জবাবদিহির ঘাটতিতে রাজস্ব খাতে বিপুল ক্ষতি
পরবর্তী নিবন্ধদূরের দুরবিনে