চট্টগ্রাম নগরীর সড়ক আজ এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি। মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন (বিএইচআরএফ)-এর তথ্যানুসন্ধানী মো. রিদুয়ান করিম নাভিলের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, কাগজে–কলমে নগরের ১৭টি রুটে বাস–মিনিবাস চলাচলের অনুমোদন থাকলেও বাস্তবে সড়ক দখল করে আছে কয়েক গুণ বেশি যানবাহন। রুট পারমিটের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৯০০ হলেও অনুমোদিত বহরের তুলনায় বহুগুণ বেশি যানবাহন চলছে। এর মধ্যে ৮০৩টি বাসের ফিটনেস সনদ নেই। নগরীতে অনুমোদিত বাস–মিনিবাস প্রায় ১ হাজার ১৩০টি, টেম্পো ২ হাজার ১৫৮টি, হিউম্যান হলার ৯৬৯টি এবং সিএনজি অটোরিকশা ১৩ হাজার। কিন্তু বাস্তবে অন্তত ২ লাখ রিকশা, ৫০ হাজারের বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং ১০ হাজার অনুমোদনহীন সিএনজি অটোরিকশা সড়কে চলাচল করছে।
দীর্ঘ সাত বছর ধরে অটোটেম্পোসহ বিভিন্ন যানবাহনের নিবন্ধন ও রুট পারমিট প্রদান কার্যত বন্ধ। অথচ নগরীর জনসংখ্যা, নগরায়ণ ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড বেড়েই চলেছে। ফলে অনানুষ্ঠানিক ও অনুমোদনহীন যানবাহনের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে (সূত্র: দৈনিক আজাদী ও যুগান্তর–এর প্রতিবেদন; বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআরটিএ)। এই অনিয়ন্ত্রিত অবস্থা কেবল যানজটই বাড়াচ্ছে না, নগরবাসীর নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার মানকেও প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
চট্টগ্রাম নগরের সড়কে বিগত আট বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৬৬২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩৬৩ জনই পথচারী, যা মোট নিহতের অর্ধেকেরও বেশি। এ সময়ে পথচারী মৃত্যুর হার বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। শুধু ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার অর্ধেকেরও বেশি পথচারী। চট্টগ্রাম সিটি রোড সেফটি রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী, বড়পোল মোড়, অলংকার মোড়, সিইপিজেড গেট, সিটি গেট, নিউমার্কেট বাসস্টপ এবং সাগরিকা গোলচত্বরসহ ২০টি স্থানকে দুর্ঘটনার উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ স্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১১ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ৮১২ জন আহত হয়েছেন। ২০২৪ সালের তুলনায় সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে ৬.৯৪ শতাংশ এবং প্রাণহানি বেড়েছে ৫.৭৯ শতাংশ। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৭ হাজার ৩৫৯ জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২ হাজার ৬৭১ জন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ৩৬ শতাংশেরও বেশি (সূত্র: চট্টগ্রাম সিটি রোড সেফটি রিপোর্ট ২০২৫; রোড সেফটি ফাউন্ডেশন; বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি)।
সমস্যার ভয়াবহতা কেবল দুর্ঘটনার সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিপুল রাজস্ব ক্ষতি। দেশের সড়কে বর্তমানে অন্তত আড়াই লাখ নিবন্ধনহীন গাড়ি চলাচল করছে। এতে সরকার প্রতিবছর অন্তত ৬ হাজার ২৫০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। বিআরটিএ সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত মোট যানবাহনের সংখ্যা ৬৪ লাখ ৪২ হাজার ৫৭৩টি। কিন্তু এর বাইরে থাকা এই আড়াই লাখ গাড়ি সম্পূর্ণভাবে করব্যবস্থার বাইরে রয়েছে।
এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল সমপ্রতি ৫ হাজার ৪৮৯টি বিলাসবহুল গাড়ির কর নথি যাচাই করে দেখেছে, ১ হাজার ৩৩৯ জন মালিক তাঁদের গাড়ির তথ্য গোপন করে কর ফাঁকি দিয়েছেন। এনবিআরের ধারণা, এসব গাড়ি থেকে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব ফাঁকি হয়েছে। দেশে গণপরিবহন হিসেবে ব্যবহৃত প্রায় ৫০ হাজার বাণিজ্যিক যানবাহনের হালনাগাদ ফিটনেস সনদ নেই। অর্থ অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী, ৫২ আসনের কম আসনবিশিষ্ট বাসের প্রতিটির জন্য ২০ হাজার টাকা, মিনিবাসের জন্য ১২ হাজার ৫০০ টাকা এবং হিউম্যান হলারের জন্য ৭ হাজার ৫০০ টাকা অগ্রিম আয়কর পরিশোধের বিধান রয়েছে। এই হিসাবে, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ফিটনেস নবায়ন না হলে রাজস্ব হারানোর পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৭৩ কোটি ৯ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা (সূত্র: বিআরটিএ; এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল; অর্থ অধ্যাদেশ ২০২৫)।
এর বাইরে দেশে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি–হুইলার চলাচল করছে। এসব যানবাহনে অবৈধ বিদ্যুৎ–সংযোগ ব্যবহার করে চার্জ দেওয়ার কারণে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে জানিয়েছেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তা, যানজট, পরিবেশদূষণ ও সরকারি রাজস্ব সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ছে। এসব যানবাহনের বিপুল বিদ্যুৎ চাহিদা দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় পাঁচ শতাংশ বা তারও বেশি হতে পারে।
সামপ্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোটরসাইকেল, থ্রি–হুইলার, বাস–মিনিবাস, ট্রাক–কাভার্ড ভ্যান ও প্রাইভেট কার এই পাঁচটি প্রধান খাত থেকে বর্তমানে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব আয় ৩ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা। কিন্তু বিদ্যমান কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর করা গেলে এই আয় বেড়ে দাঁড়াতে পারে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, নজরদারির ঘাটতি ও অনিয়মের কারণে বছরে ৩ হাজার ৫১৭ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
সমস্যার মূল গভীরে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও দুর্নীতি। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানে উঠে এসেছে, বিআরটিএর বিভিন্ন কার্যালয়ে রুট পারমিট, গাড়ির নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ, মালিকানা পরিবর্তন ও ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে সেবাপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে নিয়মিত ঘুষ নেওয়া হচ্ছে। সেবাভেদে ১ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ অবৈধভাবে নেওয়া হয়।
২০২৫ সালের ৭ মে দুদক দেশব্যাপী ৩৫টি বিআরটিএ কার্যালয়ে একযোগে অভিযান পরিচালনা করে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিআরটিএর সেবা নিতে গিয়ে ৬৩.৫ শতাংশ পরিবার ঘুষের শিকার হয়েছে। এই জরিপে পাসপোর্ট অফিসের পর বিআরটিএ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। জরিপটি ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে পরিচালিত হয়েছিল (সূত্র: বাংলা নিউজ ২৪, ‘একযোগে ৩৫ বিআরটিএ কার্যালয়ে দুদকের অভিযান’, ২০২৫–০৫–০৭; টিআইবি, জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫)।
অন্যদিকে, ট্রাফিক পুলিশের একটি প্রভাবশালী অংশের সঙ্গে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক লেনদেন ও সিন্ডিকেট ব্যবস্থার কারণে ফিটনেসবিহীন ও বৈধ কাগজপত্রহীন শতাধিক বাস–মিনিবাস অবাধে চলাচল করছে। চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কে পুলিশের বিশেষ টোকেন নিয়ে প্রতিদিন ৮ হাজার অবৈধ থ্রি–হুইলার, লেগুনা ও ডাম্পার চলাচল করে, যেগুলোর ফিটনেস নেই এবং চালকদের লাইসেন্স নেই। সংশ্লিষ্ট থানা, ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশকে প্রতি গাড়ির জন্য মাসিক ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা দিয়ে টোকেন নিতে হয়, যার মাসিক পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা।
চট্টগ্রাম নগরীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো কেবল একটি প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ নয়; এটি নগরবাসীর মৌলিক অধিকার রক্ষার প্রশ্ন। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মোটরসাইকেল, থ্রি–হুইলার, বাস–মিনিবাস, ট্রাক–কাভার্ড ভ্যান ও প্রাইভেট কার এই পাঁচ খাতে বিদ্যমান কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় বছরে কমপক্ষে ৩ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা সম্ভাব্য রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার (সূত্র: সিটিজেনস ভয়েস, ‘পরিবহন খাতে বছরে রাজস্ব ক্ষতি ৩৫০০ কোটি টাকা’, ৩০ এপ্রিল ২০২৬)।
এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নিবন্ধনহীন গাড়ির কর ফাঁকি। দেশে অন্তত আড়াই লাখ নিবন্ধনহীন গাড়ি চলাচলের কারণে বছরে প্রায় ৬ হাজার ২৫০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার (সূত্র: আমার বার্তা, ‘নিবন্ধনহীন গাড়ির কর ফাঁকি বছরে ৬ হাজার ২৫০ কোটি টাকা’, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫; বিআরটিএ সূত্র)। এ ছাড়া অবৈধ চার্জিং পয়েন্টে বৈদ্যুতিক থ্রি–হুইলার চার্জ দেওয়ার কারণে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে বলে সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ (সূত্র: টিবিএস নিউজ, ‘অটোরিকশার অবৈধ চার্জিংয়ে বছরে ৪,০০০ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী’, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।
পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনার আর্থিক বোঝা বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা বলে বিআরটিএর গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে (সূত্র: টিবিএস নিউজ, ‘সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে ক্ষতি ৬০ হাজার কোটি টাকা!’, ৩ এপ্রিল ২০২৬; প্রতিদিনের বাংলাদেশ, ‘অর্থনীতির নীরব ঘাতক’, ১ এপ্রিল ২০২৬)।
এই সম্মিলিত ক্ষতি কেবল রাজস্ব ঘাটতিই তৈরি করছে না; এটি নগরবাসীর নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানকেও প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সময় এসেছে, চট্টগ্রামের সড়ককে যানবাহনের জঞ্জালমুক্ত করে নগরবাসীর জন্য নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও মানবিক পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার। কেবল অভিযান নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
লেখক: আইনবিদ, কলামিস্ট, সুশাসন ও মানবাধিকারকর্মী।












