মাওলানা ইসলামাবাদীর মতো বিশাল পণ্ডিত সম্পর্কে লেখার যোগ্যতা আমার নেই। তারপরও তাঁর জীবন, শিক্ষা ও সমাজচিন্তা নিয়ে সামান্য কিছু লেখার চেষ্টা করছি। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন তিনি একাধারে আরবি ভাষার মহান পণ্ডিত, ইসলামী চিন্তাবিদ, প্রাবন্ধিক, বক্তৃতাদানে পটু, ধর্মপ্রচারক, সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী, সমাজ সংস্কারক, সাংবাদিকতার পথিকৃৎ এবং বিজ্ঞ শিক্ষক ছিলেন। রাজনীতি চর্চার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং মাদ্রাসা শিক্ষায় বাংলা ভাষার চর্চা ও বিজ্ঞানমনস্ক সমৃদ্ধ জাতি গড়ে তোলার আন্দোলনে পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। মুসলিম রেনেসাঁর অন্যতম সৈনিক ছিলেন। শিক্ষকতার মতো মহান পেশাকে জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছেন।
ক্ষণজন্মা এই মহান ব্যক্তিত্ব ১৮৭৫ সালের ২২ আগস্ট চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলার অন্তর্গত বরমা ইউনিয়নের আরালিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন মুন্সী মতি উল্লাহ। পৃথিবীর অন্য সব শিশুর মতো পারিবারিকভাবেই তাঁর নাম রাখা হয় মনিরুজ্জামান। এই বর্ষীয়ান নেতা চট্টগ্রামের তৎকালীন নাম ‘ইসলামাবাদ’–এর নামানুসারে তিনিও তাঁর কর্মগুণে লোকমুখে ‘ইসলামাবাদী‘ নাম অর্জন করেন।
গ্রামের মক্তবে শিশু মনিরুজ্জামানের শিক্ষার হাতেখড়ি হলেও পিতা–মাতার একান্ত ইচ্ছায় তিনি ১৮৮৯ সালে কলকাতার হুগলি সিনিয়র মাদ্রাসায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন (মাধ্যমিক শিক্ষার প্রাথমিক শ্রেণি ৬ষ্ঠ শ্রেণির সমমানের শ্রেণি)। ১৮৯৫ সালে এফ.এম ফাইনাল পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে স্বীয় চেষ্টায় ইংরেজি, বাংলা, আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় পড়াশোনা করে অসাধারণ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। আধুনিক শিক্ষার স্বল্প ভিটের ওপর দাঁড়িয়ে নিজের উপলব্ধি ও চিন্তা–চেতনায় আধুনিক মনের মানুষে পরিণত হয়েছিলেন। শিক্ষা জীবন শেষে সরকারি চাকরির সুযোগ পেয়েও ১৮৯৬–৯৭ সালে রংপুর সদরের মুন্সিপাড়া জুনিয়র মাদ্রাসার হেড মৌলভী হিসেবে শিক্ষকতা করেন। এরপর একই জেলায় পীরগঞ্জ উপজেলার কুমেদপুর মাদ্রাসায় ১৮৯৮–১৯০০ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। এরপর তিনি চট্টগ্রামে ফিরে এসে মাস ছয়েক মৌলভী আবদুল আজিজ প্রতিষ্ঠিত মুসলিম বোর্ডিং–এর সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে কাজ করেন। এরপর সীতাকুণ্ড সিনিয়র মাদ্রাসায় প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন।
মাতৃভাষা বাংলা চর্চার প্রয়াসে তিনি নিবেদিত ছিলেন। মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর সমসাময়িক সময়ে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় শুধু ধর্মীয় শিক্ষা ও আরবি–ফারসি ভাষা শিক্ষা দেওয়া হতো। ইসলামাবাদী মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য বিজ্ঞান, অংক, ভূগোল, ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়াবলী অন্তর্ভুক্ত করতে উদগ্রীব ছিলেন।
মূলত মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর স্বপ্নে ছিল মানুষ। মানুষকে সুন্দর, সুশৃঙ্খল, সুশিক্ষিত, কুসংস্কারহীন ও স্বাধীন হিসেবে দেখতে পাওয়া ছিল তাঁর গোটা জীবনের আরাধনা। বিশেষত তৎকালীন মুসলিম সমাজ শিক্ষা–দীক্ষায়, জ্ঞান–বিজ্ঞানে অন্য সব ধর্মাবলম্বীদের চেয়ে পিছিয়ে ছিল। পরোপকারী ও বিরল ত্যাগী ব্যক্তিত্ব মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী আমৃত্যু সমাজ কল্যাণে নিজেকে সোপর্দ করেন। তিনি ১৯০৪ সালে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য কলকাতায় ‘বঙ্গীয় মুসলমান শিক্ষা সমিতি’ প্রতিষ্ঠা করেন। ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় থাকার পরও তিনি ইংরেজি ভাষা আয়ত্ত ও প্রসারে ভূমিকা রাখেন। অন্যদিকে প্রাদেশিক সংসদে ইসলামাবাদীই প্রথম বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করেন।
পাশাপাশি তিনি বিতর্কেও বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষা ব্যবহার করতেন না। সর্বোপরি তাঁর বক্তব্য সংসদের কার্যবিবরণীতে বাংলা ভাষাতে লিপিবদ্ধ করা হতো। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষায় উপনীত করার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবেও উপরোক্ত কার্যক্রমকে আমরা চিন্তা করতে পারি। মুসলিম সমাজকে অন্য সব ধর্মমতের মানুষের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্যই তিনি শিক্ষা বিস্তারে, শিক্ষা চিন্তায় মনোনিবেশ করেছিলেন। তারই প্রেক্ষিতে নিজের সন্তানের নামে চন্দনাইশে বরকল এস.জেড উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। অনাথ শিশুদের কথা বিবেচনায় এনে চট্টগ্রাম শহরের মোমিন রোড, কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি কদম মোবারক এম ওয়াই উচ্চ বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেন। এতিমখানার শিশুদের হাতে–কলমে শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কারিগরি শিক্ষার প্রচলন করেছিলেন। পাশাপাশি গবাদি পশু পালনের দীক্ষাও দেওয়া হতো কদম মোবারক এতিমখানা থেকে।
জনগণের সাথে সম্পৃক্ত থাকার ও জনগণের মন জয় করার দুটো পথ বেছে নিয়েছিলেন ইসলামাবাদী। তাঁর একটি হলো বক্তৃতা আর অন্যটি হলো লেখালেখি। তাই তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেন। তাঁর সময়ে পূর্ব বাংলা ও কলকাতার বিখ্যাত বহু পত্রিকায় সম্পাদক ও সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রাজশাহীর বিশিষ্ট পণ্ডিত মির্জা ইউসুফ আলী প্রকাশিত ‘ছোলতান’ (১৯০৩)-এর সম্পাদনার দায়িত্ব পালন, ১৯১৩ সালে বগুড়ার বানিয়ায আঞ্জুমান–ই–ওলামা–এ–বাঙ্গালা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বঙ্গীয় মুসলমান শিক্ষা সমিতি (১৯০৩) এবং বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি (১৯১১)-এরও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও উভয় সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯১৮ সালে তিনি সাপ্তাহিক ‘মোহাম্মদী’র সম্পাদনা পরিষদে যোগদান করেন। ১৯১২ সালে কলকাতার ফারসি পত্রিকা ‘হাবলুল মতিন’–এর বাংলা সংস্করণের সম্পাদনা করেন। আঞ্জুমানে ওলামায়ে বাংলার মুখপত্র মাসিক ‘আল–ইসলাম’ পত্রিকারও তিনি সম্পাদক ছিলেন। ১৯২৮ সালে তিনি নিজ দায়িত্বে দৈনিক ‘আম্বর’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে ‘ইসলামাবাদ’ নামে একটি পত্রিকা পরিচালনা করেন।
তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী দেয়াং পাহাড়ে ‘আরবি বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করা। সে উদ্দেশ্যে সরকার থেকে ৬০০ বিঘা জমি ও ওই এলাকার জমিদার আলীর কাছ থেকে ৫০০ কানি ভূমি রেজিস্ট্রি মূলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গ্রহণ করেন।
শিক্ষাব্রতী মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ১৯৪৭ সালে কলকাতায় পক্ষাঘাত রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। ১৯৫০ সালের ২৪ অক্টোবর ৭৫ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। শেষ ইচ্ছানুযায়ী তাঁর প্রতিষ্ঠিত এতিমখানা সংলগ্ন কদম মোবারক মসজিদের সামনের প্রাচীন কবরস্থানে তিনি সমাহিত হন।
মাওলানা ইসলামাবাদীর জীবন পাঠ করে এই সত্যে উপনীত হয়েছি যে, তাঁর জীবন ছিল সংগ্রামী ও কর্মময়। সমাজ সেবা, শিক্ষা বিস্তার, শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা ও সাহিত্য কর্মে তাঁর অবদান পৃথিবী বিলুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত মানুষের কাছে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, চিন্তক; টিচার এডুকেটর, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, চট্টগ্রাম।












