জুম’আর খুতবা

হাদিসের গুরুত্ব ও মর্যাদা: কুরআন-সুন্নাহর আলোকে প্রাসঙ্গিক আলোচনা

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি | শুক্রবার , ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:১০ পূর্বাহ্ণ

১. হাদিসের অর্থ ও পারিভাষিক সংজ্ঞা:

হাদিস একটি আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হলো কথা, সংবাদ, বিবরণ বা নতুন কোনো বিষয়ের বর্ণনা। পবিত্র কুরআনেও এ শব্দটি সংবাদ বা বিবরণ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। মহান আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, আপনার কাছে কি মুসার সংবাদ পৌঁছেছে? (সূরা: ত্বহা, আয়াত: ৯)

হাদিসের পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইমাম সাখাভী বর্ণনা করেন, মুহাদ্দিসগনের পরিভাষায় হাদিস বলতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সম্পর্কিত তাঁর বাণী, কর্ম, অনুমোদন, সমর্থন এবং তাঁর গতিবিধিও এর অন্তর্ভুক্ত। (হাশিয়া নুযহাতুন নযর, পৃ: ৫)

২. হাদিস শাস্ত্রের বিষয়বস্তু, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য:

হাদিস শাস্ত্রের বিষয়বস্তু, হাদীস শাস্ত্রের প্রধান আলোচ্য বিষয় হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সম্পর্কিত বর্ণনাসমূহ, সেগুলোর সূত্র বা সনদ বর্ণনাকারীদের পরিচয় বর্ণনার বিশুদ্ধতা এবং সেগুলো থেকে প্রাপ্তি শিক্ষা ও বিধান। হাদিস শাস্ত্রের দুটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা রয়েছে, “ইলমুর রিওয়ায়াহ বর্ণনা শাস্ত্র”: এ শাখায় হাদিসের বর্ণনা, সংরক্ষণ সূত্রসহ পরিবেশন এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পদ্ধতি আলোচনা করা হয়। “ইলমুদ দিরাযাহ বা বিশ্লেষণ শাস্ত্র”: এ শাখায় হাদিসের বিশুদ্ধতা, বর্ণনাকারীদের গ্রহণযোগ্যতা সনদের ধারাবাহিকতা, বর্ণনার ত্রুটি এবং হাদিসের অর্থ ও তাৎপর্য বিশ্লেষণ করা হয়। ইমাম ইবনুস সালাহ রহমাতুল্লাহি আলাইহির “মুকাদ্দিমাতু ইবনিস সালাহ” এবং হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি রহমাতুল্লাহি আলাইহির “নুযহাতুন নাযর” হাদিস শাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ।

হাদিস শাস্ত্রের উদ্দেশ্য: হাদিস শাস্ত্রের প্রধান উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে বুখারি শরীফের ব্যাখ্যকার আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী হানাফী (রহ.) বর্ণনা করেন, ইহকাল পরকালের পরম কল্যাণ লাভই হাদিস অধ্যয়নের লক্ষ্য উদ্দেশ্য। (উমদাতুল কারী, খন্ড:১, পৃ: ১১)

হাদিস শাস্ত্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো পবিত্র কুরআন ও বিশুদ্ধ সুন্নাহর আলোকে মানুষের জীবন পরিচালনা করা, সঠিক আকিদা ও আমল গঠন করা, উত্তম চরিত্র অর্জন করা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন করা।

পবিত্র কুরআনে আলোকে হাদিস ও সুন্নাহর গুরুত্ব:

ইসলামি জীবন ব্যবস্থায় হাদিসের গুরুত্ব অত্যন্ত ব্যাপক। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য তাঁর ব্যাখ্যা অনুসরণ এবং তাঁর নির্দেশনা মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আল্লাহর ভালোবাসা ও ক্ষমা অর্জন করতে হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র আনুগত্য ও অনুসরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, আপনি বলনু! যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস তা হলে আমাকে অনুসরণ করো। এতে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করবেন। (সূরা: আল ইমরান, আয়াত: ৩১)

রাসূলের আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্য। মহান আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে অবশ্যই আল্লাহর আনুগত্য করল। (সূরা: আন–নিসা, আয়াত: ৮০)

রাসূলের নির্দেশ গ্রহণ ও নিষেধ থেকে বিরত থাকা:

মহান আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, “রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো। (সূরা: আল–হাশর, আয়াত: ৭)

রাসূলুল্লাহর নির্দেশ গ্রহণের অপরিহার্যতা ও নিষেধ থেকে বিরত থাকার নীতির সমর্থন এ আয়াতের নির্দেশনা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমানিত হয়।

রাসূলুল্লাহর সর্বোত্তম জীবন চরিত, কর্মনীতি ও আদর্শ পরিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন। তাঁর বিশ্বস্ততা, সততা, ন্যায়পরায়ণতা, উদারতা, মানবিকতা, সমাজ সেবা, জনসেবা, সম্প্রীতি, মানব জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগের স্বর্গীয় আদর্শ যা তিনি এ পৃথিবীতে জীবদ্দশায়, প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন তা অনুসরণ ও অনুকরণ করতে হলে হাদিসের জ্ঞান ছাড়া জানা সম্ভব নয়। সুতরাং হাদিস অস্বীকার করে হাদিসের বিরোধিতা করে উপেক্ষা করে শুধু কুরআন দ্বারা রাসূলুল্লাহর অনুসরণ করা কোনক্রমেই সম্ভব নয়। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন। “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। (সূরা: আল– ইমরান, আয়াত: ৩১)

হাদিসের গুরুত্ব সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর বাণী হাদিস সংরক্ষণ ও প্রচারের ফযিলত:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, “আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে সজীব ও উজ্জ্বল রাখুন, যে আমাদের কাছ থেকে কোনো হাদিস শুনেছে তা সংরক্ষণ করেছে এবং অন্যের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। (জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৬৫৬, আবু দাউদ, হাদিস: ৩৬৬০)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও ইরশাদ করেছেন, তোমরা আমার সুন্নাহ এবং হেদায়াত প্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরো। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৬০৭, জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৬৭৬)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরামের ভবিষ্যৎ দায়িত্ব ও বর্তব্য সম্পর্কে নির্দেশনা দিয়ে ইরশাদ করেছেন। হযরত আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আজ তোমরা আমার কাছে দ্বীনের কথা শ্রবণ করছো। তোমাদের নিকট হতেও তা শোনা হবে। আর তোমাদের নিকট হতে যারা শুনবে তাদের নিকট হতেও শোনা হবে। (মুস্তাদরেক হাকিম, খন্ড: ১, পৃ: ৯৫)

হাদিস সংকলনের ইতিহাস:

হাদিস সংকলনের ইতিহাস ইসলামের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এ ইতিহাকে কয়েকটি পর্যায়ে আলোচনা করা যায়। রাসূলুল্লাহর যুগে হাদিস সংরক্ষণ: নবীজির যুগে হাদিস প্রধানত মুখস্থ করা, পারস্পরিক আলোচনা এবং লিখে রাখার মাধ্যমে সংরক্ষিত হতো হযরত আবদুল্লাহ বা ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) রাসূলুল্লাহর কাছ থেকে শোনা কথা লিখে রাখতেন। (সহিহ বুখারি, কিতাবুল ইলম হাদিস: ১১২)

এতে প্রমাণিত হয় যে রাসূলুল্লাহর যুগেই হাদিস লিখে সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল তবে কুরআন অবতরণের সময় তা যেন অন্য লেখার সঙ্গে মিশে না যায় সে বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা হতো।

সাহাবায়ে কেরামের যুগে হাদিস সংরক্ষণ:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর সাহাবায়ে কেরাম তাঁর বাণী কর্ম ও আদর্শ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সাহাবীদের মধ্যে ব্যক্তিগত উদ্যোগ বা অন্যের মাধ্যমে হাদিস সংকলন করেছেন। তাদের সংখ্যা ৫২ জন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন আস (রা.) এর সংকলন “আস সহীফা আস সাদিকা” এতে সংকলিত হাদিস এক হাজার সহীফায়ে আলী (রা.) এ বিষয়ে বুখারি শরীফে উল্লেখ রয়েছে। সহীফা ইবনে আব্বাস (রা.) (মৃ: ৬৮)

সহীফা আবু হুরায়রা (রা.), সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবি হযরত আবু হুরায়রা (রা.) (মৃ: ৫৮/৫৯ হি.) তিনি খলিফা হযরত উমর (রা.) এর নির্দেশে নিয়মিতভাবে মদীনায় হাদীসের দারস প্রদান করতেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর ৪৭ বছর জীবিত ছিলেন। নবীজি হাদিস সংরক্ষণের জন্য তাঁর ব্যাপারে দুআ করেছেন।

তাবেয়িদের যুগে হাদিসের প্রতিষ্ঠানিক সংকলন:

তাবেয়িদের যুগে ইসলামের বিস্তার ঘটে, এ যুগে উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) শাসনকাল ( ৯৯–১০১ হি.)- হাদিস সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যেগ গ্রহণ করেন। তিনি তৎকালীন আলেমদের হাদিস সংগ্রহের নির্দেশ দেন, এ কাজে ইমাম মুহাম্মদ ইবনে শিহাব আয যুহরি (রহ.) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

ইসলামের পঞ্চম খলিফা হযরত উমর আবদুল আজিজ (রহ.) (মৃ.১০১ হি.-৯৯ হিজরিতে) তিনি খিলাফতে অধিষ্ঠিত হয়ে মদীনার গভর্নর হযরত আবুবকর বিন হাজম (রহ.) কে (মৃত: ১১৭/১২০ হি.) নির্দেশ প্রদান করেন, তিনি এক পত্রে লিখেন “তোমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লম এর হাদীস সংগ্রহ করো এবং যে হাদীস পাও তা লিখে নাও। আমি ইলম বিলুপ্ত হওয়া এবং আলিমদের বিদায় নেওয়ার আশঙ্কা করছি, জেনে রেখো! রাসূলুল্লাহর হাদীস ছাড়া আর কিছুই গ্রহণ করা হবেনা এবং প্রত্যেকের উচিত ইলম এর প্রচার প্রসার করা, আর তারা যেন একত্রে বসে (ইলমের চর্চা করে) যাতে যে জানে না সে শিক্ষা লাভ করতে পারে। (ফাতহুল বারী, খন্ড: ১ম, পৃ: ২৫৮)

সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িগণের নিষ্ঠা এবং ইমাম বুখারি (রহ.) ইমাম মুসলিম ইমাম মালিক ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল সহ অসংখ্য মুহাদ্দিস গণের অক্লান্ত সাধনায় হাদিসের বিশাল ভান্ডার সংরক্ষিত হয়েছে। কুরআন সুন্নাহর অধ্যয়ন, অনুধাবন ও আমল করার মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা আমাদের জীবনকে আলোকিত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা–এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম; খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপ্রজ্ঞার মহীরুহের বিদায় : অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোলায়মানের স্মৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য
পরবর্তী নিবন্ধবন্ধু মহল মানবিক সংগঠনের আর্থিক নগদ সহায়তা প্রদান