মানিক চৌধুরী, আজ ৩০ জুন যাঁর প্রয়াণ দিবস। তাঁর ভালো নাম ভূপতি ভূষণ চৌধুরী। চট্টগ্রামের পটিয়া থানার হাবিলাসদ্বীপ গ্রামের এমন একটি পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন, যে পরিবার ছিলো একই সঙ্গে গ্রামে ভূস্বামী এবং শহরে ধনী ব্যবসায়ী। কিন্তু পরিবারের চেয়েও হাবিলাসদ্বীপ গ্রামের পটভূমিই মানিক চৌধুরীর মানস গঠনে বেশি অবদান রেখেছিলো। হাবিলাসদ্বীপ একটি বিপ্লবী গ্রাম। এই গ্রামের অনেক তরুণ মাস্টারদা সূর্য সেনের গোপন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেদের ভাগ্যকে মিশিয়ে দিয়েছিলেন। ধলঘাটে সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে যেদিন ক্যাপ্টেন ক্যামেরুনের গুর্খা বাহিনীর সঙ্গে মাস্টারদা ও বিপ্লবীদের যুদ্ধ হয়েছিলো, সেদিন সেখানে প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্তও ছিলেন এবং তাঁরা হাবিলাসদ্বীপ থেকে ধলঘাট গিয়েছিলেন। সেই খণ্ডযুদ্ধে ক্যাপ্টেন ক্যামেরুন নিহত এবং বিপ্লবী নায়ক নির্মল সেন শহীদ হন। হাবিলাসদ্বীপ গ্রামের কিরণ সেন একজন দুঃসাহসী, বেপরোয়া বিপ্লবী তরুণ ছিলেন, যিনি রাতের আঁধারে খড়্গ নিয়ে গৈড়লায় গিয়ে বিশ্বাসঘাতক নেত্র সেনকে এক কোপে ধড় থেকে মুণ্ডু বিচ্ছিন্ন করে শাস্তি দিয়েছিলেন। মাস্টারদা গৈড়লার ক্ষীরোদ প্রভা বিশ্বাসের আশ্রয় নিয়েছিলেন। প্রতিবেশি নেত্র সেন সেটা জানতে পেরে পটিয়া থানায় গিয়ে জানিয়ে দেয়। অতঃপর পটিয়া থেকে ক্যাপ্টেন ওময়সালের নেতৃত্বে প্রায় ৩০০ গুর্খা সৈন্য রাত ৯টার সময় ক্ষীরোদ প্রভা বিশ্বাসের বাড়ি ঘেরাও করে ফেলে। সৈন্যবাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ হয়েছেন বুঝতে পেরে মাস্টারদার নির্দেশ অনুযায়ী দুইজন করে তিন দলে বিভক্ত হয়ে গুলিবর্ষণ করতে করতে চারজন বিপ্লবী সৈন্যবেষ্টনী থেকে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হন। দুর্ভাগ্যক্রমে মাস্টারদা এবং তাঁর সঙ্গী ব্রজেন সেন ধরা পড়েন। নেত্র সেন যখন বিশ্বাসঘাতকতার পুরস্কারের অর্থ দিয়ে নিকটবর্তী ঘোষের হাট থেকে ইয়া বড় এক রুই মাছ কিনে এনে তার বিরাট মাথাটা নিয়ে খেতে বসেছিলো, এমন সময় যমদূত কিরণ সেন হাজির হয়ে খড়্গের কোপে তার ধড় থেকে মুণ্ডুটা বিচ্ছিন্ন করে ফেললে সেটি ভাতের থালায় রুই মাছের মুড়োর ঝোলের সাথে রক্তে মাখামাখি হয়ে যায়। এই কিরণ সেন হাবিলাসদ্বীপেরই গর্বিত সন্তান। নেত্র সেনকে হত্যার ঘটনায় কিরণ সেনের সঙ্গে হাবিলাসদ্বীপ গ্রামের আরো একজন তরুণ জড়িত ছিলেন– তিনিও বিপ্লবী, নাম রবীন্দ্র নন্দী (খোকা)।
চট্টগ্রামের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চর্চার ক্ষেত্রেও হাবিলাসদ্বীপ গ্রামের দুই ভ্রাতা উস্তাদ গঙ্গাপদ আচার্য ও উস্তাদ শ্রীপদ আচার্যের নাম বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। পূর্ব হাবিলাসদ্বীপের আচার্য পাড়ায় ছিলো তাঁদের বাড়ি। দু’ভাই প্রথমে সুরেন্দ্র লাল দাশের (ঠাকুর্দা) সঙ্গে আর্য সঙ্গীতে এবং পরে সঙ্গীত পরিষদে ছিলেন। সঙ্গীত পরিষদ তাঁরাই প্রতিষ্ঠা করেন। চট্টগ্রামে তাঁদের কাছে যাঁরা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম নেন, তারা পরবর্তীকালে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। উস্তাদ গঙ্গাপদ এবং তাঁর ছোট ভাই শ্রীপদ আচার্য পরে কলকাতায় চলে যান এবং কলকাতায়ও তাঁরা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের জগতে বিখ্যাত শিল্পী ও শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
হাবিলাসদ্বীপের উপর্যুক্ত বৈপ্লবিক ও সাঙ্গীতিক পরিবেশে জন্মগ্রহণ ও বর্ধিত হওয়ার কারণেই মানিক চৌধুরীকে আমরা উত্তরকালে একজন স্বদেশব্রতী বিপ্লবী হিসেবে আবির্ভূত হতে দেখি। তাঁকে কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজে অধ্যয়নকালে নেতাজী সুভাষ বসুর ফরওয়ার্ড ব্লকের ছাত্র সংগঠনে যোগ দিয়ে বিপ্লবী রাজনীতির অনুশীলন করতে দেখা যায়। কলকাতায় কলেজিয় শিক্ষার পাঠ সমাপ্ত করে চট্টগ্রামে ফিরে নিজের মধ্যে যে বিপ্লবের আগুন প্রজ্বলিত করে এসেছিলেন মানিক চৌধুরী, এ দেশে তারই কোন ক্ষেত্র যখন খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন, তখনই আওয়ামী লীগ এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানের এক মোক্ষম প্রতিষেধক হিসেবে ৪৯–এ আত্মপ্রকাশ করে আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুও পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি ফেরি করে বেড়ালেও তাঁর অন্তরে ছিলো বিপ্লবের বহ্নি ধূমায়মান। পঞ্চাশের দশকে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করলেও ষাটের দশকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য প্রকাশ্য, গোপন নানামুখী তৎপরতায় লিপ্ত হন তিনি। ৬২ থেকে বঙ্গবন্ধু গোপনে পাকিস্তান আর্মিতে কর্মরত বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে একটি বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলার জন্য সচেষ্ট হন। লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনের সঙ্গে এ সময়ই তাঁর যোগাযোগ স্থাপিত হয়। ক্রমান্বয়ে এই সংগঠনের সঙ্গে রাজনীতিবিদ, সামরিক–বেসামরিক আমলা এবং ব্যবসায়ী অনেকেই জড়িত হন। তবে শুরুতে ছিলেন মাত্র তিনজন বঙ্গবন্ধু, মানিক চৌধুরী এবং ডা. ছৈয়দুর রহমান চৌধুরী। ডা. ছৈয়দের রেয়াজুদ্দিন বাজার চৈতন্য গলির বাসভবনই হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর বিপ্লবের আঁতুরঘর। সেখানে পরে লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনও গেছেন।
ডা. ছৈয়দ ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং মানিক চৌধুরীর বন্ধু। মানিক চৌধুরী তাঁর আরও একজন বন্ধুকে এই বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত করেন। তিনি হচ্ছেন বিধান কৃষ্ণ সেন। বঙ্গবন্ধু সেখানে বিপ্লবের প্রস্তুতি গ্রহণের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রকাশ্য রাজনীতির সুযোগও অবহেলা করেননি। ৬৫’র পাক–ভারত যুদ্ধের পর তিনি ৬ দফা দিয়ে প্রকাশ্য রাজনীতিতে স্বায়ত্তশাসনের উপাদান সংযোজিত করেন। ৬ দফা বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সূচনা করে, এই রাজনীতিও পরিণামে স্বাধীনতা যুদ্ধে পূর্ণাহুতি লাভ করে। ৬ দফার ভিত্তিতে রাজনৈতিক আন্দোলন–সংগ্রাম জোরদার হতে থাকলে বঙ্গবন্ধুর গোপন বৈপ্লবিক প্রচেষ্টা একজনের বিশ্বাসঘাতকতায় ফাঁস হয়ে যায় এবং তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে আগরতলা মামলা দায়ের করা হয়। ওদিকে প্রকাশ্য রাজনীতি এগিয়ে যাওয়ায় ৬৯–এ গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। আইয়ুব খানের একনায়কত্ববাদী শাসনের পতন ঘটে এবং আগরতলা মামলা প্রত্যাহার ও বঙ্গবন্ধু মুক্তিলাভ করেন।
প্রথমে যে আগরতলা মামলা রুজু করা হয়, তাতে বঙ্গবন্ধু ছিলেন ১ নং আসামী, মানিক চৌধুরী ২ নং আসামী; পরে দ্বিতীয় দফা যে মামলা করা হয়, তাতে বঙ্গবন্ধু ১ নং আসামী ঠিকই থাকেন, কিন্তু ২ নং আসামী হয়ে যান লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন। ৩৫ জন আসামীর মধ্যে মানিক চৌধুরীকে এবার ১২ নং আসামী করা হয়। বঙ্গবন্ধুর বিপ্লব প্রচেষ্টায় মানিক চৌধুরী যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন, আগরতলা মামলা থেকে তা প্রমাণিত হয়। বন্দি অবস্থায় তাঁকেই সবচেয়ে বেশি নির্যাতন করা হয়।
প্রথাগত ঐতিহাসিকরা কখনো বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাস উদঘাটন করতে পারবেন না। মানিক চৌধুরীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামের অনেক তথ্য বিলীন হয়ে গেছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্তরালে সব সময় একটা চোরাস্রোত প্রবহমান ছিলো; বঙ্গবন্ধু, মানিক চৌধুরী, চিত্তরঞ্জন সুতার, ‘র’ প্রধান রামনাথ কাণ্ড ও তাঁর বিশ্বস্ত সহকারী রাজ নির্মল নারায়ণ চৌধুরী (আর এন এন চৌধুরী), শঙ্কর নায়ার উক্ত স্রোতে অবগাহন করেছিলেন। আমি অন্তত ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বছর পূর্বে দিল্লি সফরে গিয়ে চিত্তরঞ্জন পার্কে আর এন এন দত্ত চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন সব তো দাদার (মানিক চৌধুরী) জন্যই হলো। ভারতের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর যোগাযোগের সেতু হিসেবে কাজ করতেন মানিক চৌধুরী। তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন ৬১ খ্রিস্টাব্দে তিনি চট্টগ্রামে এসেছিলেন, তাঁরা পতেঙ্গা, হালিশহর ইত্যাদি উপকূলীয় এলাকা ঘুরে দেখেছিলেন। বঙ্গবন্ধু, এম এ আজিজ সঙ্গে ছিলেন। মানিক চৌধুরীর পুত্র দীপঙ্কর চৌধুরী কাজলও উক্ত সাক্ষাৎকারের সময় আমার সঙ্গে ছিলেন।
মানিক চৌধুরী তেজস্বী লোক ছিলেন। যত ঝুঁকির কাজ, মানিক চৌধুরী তাতে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। তাঁর কোনও ভয় ডর ছিলো না। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি একটি গ্রুপ নিয়ে আলী আহমদ মাস্টার ছদ্মনামে যাত্রা বাড়িতে এসে যুদ্ধ করেছিলেন। মাথায় টুপি লুঙ্গি পরিহিত মানিক চৌধুরী তখন দেখার মত একজন মানুষ ছিলেন।
লেখক : সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা, প্রাবন্ধিক, গবেষক











