(গত সংখ্যার পর)
৪.
পুনাকাতে আসার আরেকটা কারণ পুবজিকা ভ্যালি। পরের দিন সকালের নাস্তা সেরে রওনা দিলাম পুবজিকা ভ্যালির দিকে। আবারও আমাদের গাড়ি রওনা দিলো পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে, এই রাস্তায়ও রোডোডেনড্রন গাছের আধিক্য। আমরা উঁচু থেকে আরো উঁচুতে উঠছি, ঠান্ডার মাত্রাও বাড়ছে, কিছুদূর পরপর খুব সুন্দর সাজানো গোছানো চায়ের দোকানগুলোও আপনাকে আহ্বান জানাবে শরীরটা উষ্ণ করার জন্য চা পান করতে। ঘন্টাখানেক পর এই পথে আমাদের সঙ্গী হলো হিমালয়ের পর্বতগুলো, একদিকে বরফে ঢাকা সাদা পর্বত অন্যদিকে লাল রোডোডেনড্রন ফুল আর এসব দৃশ্য নিয়ে আপনি যখন ছুটে চলবেন পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে তখন আপনি বাধ্য হবেন খড়ঁরং অৎসংঃৎড়হম এর গলার সাথে গলা মিলিয়ে গেয়ে উঠতে “ডযধঃ ধ ড়িহফবৎভঁষ ড়িৎষফ”। অনেক উঁচুতে উঠার পর এবার আমরা নিচে নামতে শুরু করলাম, নিচের দিকে নামতে নামতে দূর থেকে দেখা মিলল একটা গ্রামের, এটাই পুবজিকা ভ্যালি। দুই পাশে উঁচু উঁচু পর্বত, পর্বতের ঢাল বেয়ে বেয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাইন–ওক গাছগুলো যে জায়গায় এসে থেমে গেছে সেখান থেকে শুরু সবুজ ঘাসের, এটা দেখে মনে হবে প্রকৃতির উপরে কোন শিল্পী নাই। ক্যালেন্ডারে আমরা যেরকম ভ্যালির ছবি দেখতে অভ্যস্ত এটা যেনো সেরকম। এই ভ্যালিতে যারা বসবাস করে তারাও এমনভাবে বাস করছে যেনো এই প্রকৃতি বিরক্ত না হয়। বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে ফেরার মত পথ ধরলাম, যদি কখনো সময়–সুযোগ তাহলে আবার আসবো নিজেকে সে আশ্বাস দিয়ে।
পুনাকা থেকে এবার আমরা রওনা দিলাম ভুটানের অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য পারো শহরে। ভুটানের পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ ধরে আমাদের গাড়ি চলছে পারো শহরের দিকে। পাহাড়ের মধ্যে চলা রাস্তায়গুলো এত সুন্দর এত মসৃণ কোন জায়গায় ভাঙ্গা কিংবা আধা পাকা রাস্তার দেখা পাই নাই। রাস্তাগুলোকে এমনভাবে বানানো হয়েছে যেনো প্রাণ–প্রকৃতির কোন ক্ষতি না হয়, দূর থেকে পাহাড়গুলোর দিকে তাকালে কোনভাবেই বুঝাই যায় না সেখানে পিচঢালা কোন হাইওয়ে আছে আর রাস্তাগুলো দেখলেই বুঝা যায় যত্নও নেয়া হয় প্রতিনিয়ত বলতে গেলে গত ৪–৫ দিনে আমি ভুটানের রাস্তার প্রেমে গেলাম।
ভুটানের রাজা এবং তার প্রশাসনের একটা গুরুত্বপূর্ণ নীতি হচ্ছে পুরো দেশে ৬৫ ভাগ যেনো পাহাড় আর সবুজ থাকে এবং জনগণও বেশ উৎসাহ নিয়ে এটা বজায় রাখার চেষ্টা করে। আমাদের গাইড ও ড্রাইভার গর্ব করে জানালো এখন ভুটানের ৭০ ভাগ জায়গা পাহাড় ও সবুজে ঘেরা। “পিচ ঢালা এই পথটাকে ভালোবেসেছি, তার সাথে এই মনটারে বেঁধে ফেলেছিচ এই গানটা গুনগুন করতে করতে আমরা থিম্পু শহর পার হয়ে প্রায় পারো শহরের কাছাকাছি চলে আসলাম। এই পুরো পথজুড়ে বেশ কয়েকবার চা–কফি খাওয়ার জন্য দাঁড়িয়েছি আসলে আমার কাছে চা–কফি ছিলো একটা বাহানা আসল বিষয় ছিলো এই বিশুদ্ধ বাতাস–সবুজ পাহাড়ের সাথে আরেকটু মিশে থাকা। ভুটানের অন্য শহরের চেয়ে এই পারো শহর আরো বেশ সাজানো–গোছানো ও পরিস্কার–পরিচ্ছন্ন মনে হলো। দুই পাশেই উঁচু উঁচু পর্বত তার মাঝখানে এই পারো ভ্যালি, ভুটানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় এই শহরেও নেই কোন জ্যাম, হর্ণ, ময়লা; নেই কোন উচ্চস্বরে আওয়াজ অথচ রাস্তার পাশে সারিসারি কফিশপ, রেস্টুরেন্ট, সুভ্যনিয়ারশপ। শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে আমাদের হোটেল, শহরের মাঝখান দিয়ে যখন আমাদের গাড়ি চলছে হোটেলের দিকে আর আমি জানালা দিয়ে এই শহরের সৌন্দর্য দেখছি সে সাথে অবাকও হচ্ছি প্রশাসন–জনগণ চাইলে একটা দেশকে কত সুন্দর করে রাখা যায় অথচ দেশটা অর্থনৈতিকভাবে আশেপাশের দেশগুলোর তুলনায় বেশ পিছিয়ে।
৫.
পারো শহরের আশেপাশে পর্যটকদের বেশকিছু জনপ্রিয় স্থান রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম টাইগার নেস্ট (তাক্তসাং), পারো বিমানবন্দর বার্ড ভিউ, চেলেলা পাস। আমাদের প্রথম গন্তব্য তাক্তসাং–এ, পারো ভ্যালি’র পাশের পর্বতের চূড়ায় ১৬ শতাব্দীর শেষের দিকে নির্মাণ করা হয় এই বৌদ্ধ মন্দিরটি। সমুদ্রপৃষ্ঠ প্রায় ৩১০০ মিটার (প্রায় ১০১০০ ফুট) উঁচুতে পাহাড়ের কাঁধে নির্মিত এই অসাধারণ নির্মানশৈলীটি দেখতে প্রতিবছর নানা দেশ থেকে পর্যটকরা ভুটানে আসে। প্রায় ৫–৬ ঘন্টা (আসা–যাওয়া) উঁচু পাহাড়ের পথ ধরে হাইকিং করতে হবে তারপর দেখা মিলবে এই মন্দিরের। পরের দিন সকাল সকাল আমরা খুব উত্তেজনা নিয়ে রওনা দিলাম তাক্তসাং এর উদ্দেশ্যে আমার যতটা না মন্দির দেখার উত্তেজনা তারচেয়ে বেশী উত্তেজনা হাইকিং করতে পারবো তার জন্য। প্রথমে আমাদের হোটেল থেকে ৩০ মিনিটের গাড়ির পথ ধরে চলে আসলাম পর্বতের পাদদেশে এখান থেকে মূল হাইকিং শুরু, এই মন্দির দেখার জন্য বিদেশিদের টিকেট কাটতে হবে যার মূল্য ১০০০ ভুটানি টাকা, আমরা তাড়াতাড়ি টিকেটে কেটে হাইকিং শুরু করে দিলাম। আমাদের পরিকল্পনা খুব আস্তে আস্তে হাঁটবো আর চারপাশের প্রাণ–প্রকৃতি উপভোগ করতে যাবো, পাইন–ওক গাছ কিছু দূর পরপর রোডোডেনড্রন ফুল গাছের এরই মাঝখানে দিয়ে আমাদের হাইকিং চলছে। হাইকিং কিংবা ট্রেকিং করতে গেলেই দেখবেন নানা দেশের, নানা বয়সের, নানা চামড়ার লোকজন আপনার আশেপাশে দিয়ে যাচ্ছে আর সবাই সবাইকে হাই–হ্যালো করে যেটা আমাহ কাছে হাইকিং এর অন্যতম সৌন্দর্য মনে হয়। এই পথেও নানা দেশের লোকজন দেখা মিললো, তবে সবচেয়ে বেশী দেখা গেলো ইউরোপীয়ান–চায়না বয়স্ক লোকদের। তারা খুব উৎসাহ নিয়ে হাঁটছে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০০০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই প্রাচীন মন্দির দেখতে। পৃথিবীর নানা প্রান্তের ৬৫–৭০ বছরের এই বয়স্ক লোকদের এত উঁচু পর্বতে হাইকিং করতে দেখে যতটা অবাক হয় তার চেয়ে বেশী অনুপ্রেরণা পাই এই পৃথিবী ঘুরে ঘুরে দেখতে। ঘন্টাখানেক হাঁটার পর দেখলাম এক ইউরোপ কিংবা আমেরিকান পরিবারের, এই পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্যটির বয়স হবে ৫–৬ বছর, হাতে লাটি, পায়ে সুন্দর জুতা নিয়ে বাবার হাত ধরে এত উঁচু পাহাড়ে হাঁটতে দেখে বেশ অবাক হলাম আর ভাবছি বড় হলে এই বাচ্চাগুলো কি পরিমাণ আত্মবিশ্বাসী হবে। আমরা বাচ্চাটাকে প্রশংসা ও উৎসাহ দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলাম। প্রায় ২ ঘন্টার কাছাকাছি হাঁটার পর আমরা পৌঁছলাম তাক্তসাং এর মাঝামাঝি জায়গা বলতে পারেন বেইস ক্যাম্পের মত জায়গা এটা, সুন্দর একটা ক্যাফে আছে এখানে আর এই জায়গায় থেকে প্রথমবারের মত খুব সুন্দর করে টাইগার নেস্ট (তাক্তসাং) দেখা যায়। এই জায়গায় একটু বিশ্রাম ও তাক্তসাংকে পিছনে রেখে বেশ কিছু ছবিটবি তোলে আমরা আবার আমাদের হাইকিং শুরু করে দিলাম, এবার বেশ কিছু পথ সোজা ২০–২৫ মিনিট ধরে সোজা পথ হাঁটার পর শুরু হলো এই হাইকিং’র সবচেয়ে কঠিন পথ। পাথুরে পাহাড়ের ঢালে তৈরি করা ছোট্ট সিঁড়ি বেয়ে আপনাকে বেশ কিছুক্ষণ নিচে নামতে হবে আর এই নামার পথ ধরে দেখতে পাবেন এই হাইকিং এর আসল সৌন্দর্য, এখান থেকে যেমন পুরো তাক্তসাংকে খুব সুন্দর করে দেখা যায় ঠিক একইভাবে পারো ভ্যালির একাংশও খুব সুন্দর করে দেখা যায়। বেশ কিছুক্ষণ নামতেই দেখা মিলবে অসম্ভব সুন্দর একটা ঝর্ণা’র এটা দেখতে দেখতে আপনাকে আবার হাঁটতে হবে ছোট্ট সিঁড়ি দিয়ে উপরের দিকে। এই উঠা এবং নামার ব্যাপারটা একটু কষ্টকর হলেও প্রকৃতি তার সৌন্দর্য নিয়ে আপনাকে সে কষ্ট অনুভব হতে দিবে না। একটা সময় পর্যন্ত নাকি এই জায়গায় কোন সিঁড়ি ছিলো না, সে সময় যারা এখানে আসতে তারা নাকি পাহাড়ের দেয়ালে হাত, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে বিশেষ কায়দায় পা রেখে অনেক ঝুঁকি নিয়ে এই মন্দিরে আসতো। আমরা প্রায় ২ ঘন্টা ৪৫ মিনিট হাইকিং করে চলে আসলাম তাক্তসাং মন্দিরের খুব কাছেই, একেবারে পাথুরে পাহাড়ের ঢালে এত উচ্চতায় এই মন্দিরটির কিভাবে যে নির্মাণ করা হলো সেটাই একটা বড় রহস্য। মানুষ যে কত বড় হেয়ালী সেটা এসব জায়াগায় এত সুন্দর স্থাপনা না দেখলে বুঝাবেন না। একবার ভাবুনতো ১৬ শতাব্দীতে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০০০০ ফুট উঁচুতে এই পাথুরে পাহাড়ের একেবারে ঢালে এই মন্দিরটা নির্মাণ করা হয়েছে, এটা হেয়ালি না হলে তো কোনোভাবে সম্ভব না। এখনো এত উঁচুতে এই মন্দিরের যত্ন নেয়াটাও বেশ কঠিন সেটা চারপাশে ভালোভাবে তাকালেই বুঝা যাচ্ছে। মন্দিরের ভিতরে ফোন, ক্যামরা কোনো কিছু নেয়া যায় না, আমরা প্রবেশ করার সময় সবকিছু মন্দিরের গেইটে জমা দিলাম। অনেক প্রাচীন মন্দির হওয়াতে ভুটানের ইতিহাসের সাথে এটা বেশ ভালোভাবে জড়িত, আমাদের গাইড মন্দিরের সবকিছু খুঁটিয়ে বর্ণনা করলো, মন্দিরটা কীভাবে নির্মাণ হলো, কে নির্মাণ করলো এবং প্রতিটা মূর্তির সামনে গিয়ে তার গুরুত্ব কি সবকিছু খুব সুন্দর করে বর্ণনা করলো। অনেক উঁচুতে হওয়ার কারণে বাতাসও বেশ ভালো এখানে, এই উচ্চতা থেকে পারো ভ্যালিসহ তার আশেপাশের জায়গার যে সৌন্দর্য দেখা যায় সেটা নি:সন্দেহে আপনাকে বিমোহিত করবে, ধ্যান করার জন্য আমার কাছে জায়গাটা বেশ আদর্শ মনে হলো। আমরা বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে ফেরার পথ ধরলাম, এত উঁচু থেকে নামতে বেশী সময় নিলাম না আমরা।
৬.
যখন আমরা হাইকিং শুরু করেছি তখন আমরা ভেবেছিলাম এটা শেষ করতে আমাদের সময় লাগবে ৮.০০ ঘন্টা মত কিন্তু শেষ করলাম ৬.০০ ঘন্টার মধ্যে। আমাদের গাইড নাকি প্রচুর বাংলাদেশী পর্যটকদের গাইড হিসাবে কাজ করেছে এবং অনেককে নিয়েও তিনি এই পথে হাইকিং করেছে তার মতে আমরা নাকি সবচেয়ে কম সময় নিয়েছি, গাইডের এই প্রশংসা নিয়ে দিনটার ইতি টানলাম। অনেকে এই হাইকিং শেষ করে ভুটানের ট্র্যাডিশনাল হট স্টোন বাথ নেন এবং এটা নাকি শরীরের জন্য বেশ কার্যকর। যাহোক আমি আর ঐদিকে গেলাম না। পৃথিবীর অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ পারো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও ভুটানের সবচেয়ে উঁচু মোটরযান চলাচল উপযোগী পথ চেলেলা পাস (৩৯৮৮ মিটার বা ১৩১০০ ফুট) ভ্রমণ করে আমরা আমাদের ভুটান ভ্রমণের ইতি টানলাম।
ভুটান অর্থনৈতিকভাবে হয়ত খুবই দুর্বল, চাষযোগ্য জমিও খুব বেশী নাই কিন্তু ভুটানের মানুষগুলোর রয়েছে প্রাণ–প্রকৃতির প্রতি প্রচণ্ড বিবেচনাবোধ, রুচিবোধ, অন্যজনের প্রতি রয়েছে সম্মান ও শ্রদ্ধা এবং সততা। এইসব গুণগুলো যেনো আজকের দুনিয়াতে আস্তে আস্তে দুর্লভ হয়ে যাচ্ছে। ভুটানের রাজা এবং তার প্রশাসন দেশের জনগণের এসব গুণ ও যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে যেভাবে দেশকে তৈরি করছে সেটা কেবল দক্ষিণ এশিয়ার জন্য না পুরো পৃথিবীর জন্য আদর্শ হয়ে দাঁড়াবে।











