শীতের রাত। উঠোনের কোণে জ্বলছে টিমটিমে হারিকেন। মা বসে আছেন বারান্দায়, কোলের ওপর পুরোনো একটা শাড়ি, হাতে সুচ–সুতো। বাইরে হয়তো তখন হালকা কুয়াশা নেমেছে, ঘরের চালে টুপটাপ শব্দ তুলছে শিশিরের ফোঁটা। পাশে বসে ছোট্ট ছেলেটি অবাক চোখে দেখছে, কীভাবে একটা জীর্ণ কাপড় ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে ফুল–লতা–পাখির এক জীবন্ত ক্যানভাস। মায়ের আঙুলের প্রতিটা নড়াচড়ায় যেন একটা করে গল্প জন্ম নিচ্ছে, আর ছেলেটি না বুঝেই শিখে নিচ্ছে সেই গল্প বলার ভাষা। সেই দৃশ্য আজ আর নেই। বৈদ্যুতিক আলো, ব্যস্ত জীবন আর ছুটে চলা সময়ের ভিড়ে হারিয়ে গেছে সেই দাওয়ায় বসে কাঁথা সেলাইয়ের শান্ত বিকেলগুলো। অথচ এই দৃশ্যটাই ছিল একসময় বাংলার প্রতিটি ঘরের নিত্যদিনের ছবি, প্রতিটি সংসারের এক অনিবার্য অংশ।
নকশি কাঁথা–নামটা উচ্চারণ করলেই বুকের ভেতর একটা মমতার স্রোত বয়ে যায়। এই কাঁথা শুধু শীত তাড়ানোর কাপড় নয়। এটা একজন মায়ের নির্ঘুম রাতের গল্প, একজন নববধূর অপেক্ষার প্রতীক্ষা, প্রবাসী স্বামীর জন্য অপেক্ষারত স্ত্রীর মনের কথা। কোনো কাঁথায় লুকিয়ে থাকে সন্তানের জন্মের আনন্দ, কোনোটায় থাকে বিরহের নীরব কান্না, আবার কোনোটা হয়তো বোনা হয়েছিল কারও অসুস্থ স্বামীর জন্য প্রার্থনার মতো করে, প্রতিটা ফোঁড়ে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল সুস্থতার কামনা। যিনি লিখতে জানতেন না, তিনিও সুঁই–সুতোয় লিখে গেছেন নিজের জীবনের ইতিহাস–সেই ইতিহাসে নেই কোনো বানান ভুল, নেই কোনো অসম্পূর্ণতা, আছে শুধু নিখাদ অনুভূতির প্রকাশ। প্রতিটা ফোঁড়ে জমা আছে ধৈর্য, প্রতিটা রঙে মিশে আছে ভালোবাসা, আর প্রতিটা নকশায় লুকিয়ে আছে একজন নারীর নিজস্ব পৃথিবীর ছাপ।
চর্যাপদের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত এই কাঁথা টিকে আছে বাঙালির সংস্কৃতিতে। শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন থেকে জসীমউদ্দীনের ‘নকশি কাঁথার মাঠ’–সাহিত্যের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে এই কাঁথার কথা। কবি সাজু চরিত্রের মধ্য দিয়ে যেভাবে একজন নারীর সুখ–দুঃখকে কাঁথার নকশায় বেঁধে দিয়েছিলেন, সেই কাব্যিক পরিচয়ই আজও নকশি কাঁথাকে আলাদা মর্যাদা দেয় বাংলা সাহিত্যে। যশোরের নকশি কাঁথার ঐতিহ্য প্রায় তিনশ বছরের পুরোনো, আর দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলেই এই শিল্পের নিজস্ব রূপ ও রীতি গড়ে উঠেছিল, রাজশাহী–বগুড়া–কুষ্টিয়ার মোটা জমিনের কাঁথা থেকে শুরু করে যশোর–ফরিদপুর–খুলনার সূক্ষ্ম সেলাইয়ের কাঁথা পর্যন্ত। একটা সময় ছিল, যখন এই কাঁথা শুধু ঘরের প্রয়োজন মেটাত না–হয়ে উঠত উপহার, হয়ে উঠত ভালোবাসার প্রকাশ, হয়ে উঠত সম্পর্কের বন্ধন মজবুত করার এক নীরব মাধ্যম। মেয়ের বিয়েতে শাশুড়ির ঘরে পাঠানো হতো কাঁথা, নতুন শিশুর জন্মে বোনা হতো নরম মুতনি, প্রবাসী স্বামীর জন্য বানানো হতো ছোট্ট রুমাল কাঁথা–যেন হাজার মাইল দূরেও থেকে যায় স্পর্শের স্মৃতি, যেন বিদেশ–বিভুঁইয়ে একলা রাতে ঘুমের ভেতরেও প্রিয়জনের উষ্ণতা অনুভব করা যায়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শিল্প পেরিয়ে গেছে দেশের সীমানা। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য–বিশ্বের নানা প্রান্তে নকশি কাঁথা আজ সমাদৃত, বিদেশি ক্রেতাদের কাছে এটি এখন গ্রামবাংলার এক টুকরো শৈল্পিক পরিচয় বহন করে চলা পণ্য। ২০২৪ সালে জামালপুরের নকশি কাঁথা ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে, যা এই শিল্পের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিচিতিতে যোগ করেছে নতুন এক গৌরবের অধ্যায়। যে শিল্প একদিন গ্রামের অশিক্ষিত গৃহবধূর হাতে, দাওয়ায় বসে, অবসর সময়ের ফাঁকে জন্ম নিয়েছিল, সেই শিল্পই আজ বিশ্ববাজারে পরিচিত এক নাম, নামীদামি শোরুম আর আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর গর্বিত সদস্য। এ যেন বাংলার এক নীরব বিজয়গাথা–কোনো ঢাকঢোল পিটিয়ে নয়, বরং নিঃশব্দ সুঁইয়ের ফোঁড়ে ফোঁড়ে জয় করা এক বিশ্বজয়ের গল্প।
কিন্তু গৌরবের এই ইতিহাসের ঠিক উল্টো পিঠে দাঁড়িয়ে আছে এক করুণ বাস্তবতা। একটা নকশি কাঁথা তৈরি করতে সময় লাগে মাসের পর মাস, কখনো বছরের পর বছর। প্রতিদিনের সংসারের কাজ সামলে, রান্নাঘর আর সন্তান–পালনের ফাঁকে ফাঁকে যে সময়টুকু বের করে একজন নারী কাঁথা বোনেন, সেই দীর্ঘ শ্রম আর ধৈর্যের বিনিময়ে বাজারে যে দাম মেলে, তা দিয়ে আজকের ছুটে চলা সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। জিনিসপত্রের ঊর্ধ্বমুখী দাম, বাড়তি খরচের চাপ–সবকিছু মিলিয়ে এই দীর্ঘমেয়াদি শ্রমের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন গ্রামীণ নারীরা। ফলে যে হাত একদিন সুঁই–সুতোয় বুনত জীবনের গল্প, সেই হাতই আজ ঝুঁকছে অন্য কাজের দিকে, খুঁজে নিচ্ছে এমন কোনো কাজ যেখানে কম সময়ে বেশি আয়ের নিশ্চয়তা আছে। কেউ কেউ ছেড়ে দিচ্ছেন পুরোনো এই শিল্প, বেছে নিচ্ছেন অল্প পরিশ্রমে বেশি আয়ের বিকল্প পথ, আর সেই পথ ধরে চিরচেনা নকশি কাঁথা হারিয়ে যাচ্ছে একটার পর একটা সংসার থেকে।
শহরের মানুষ আজ কাঁথার বদলে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে কম্বলে। যে উষ্ণতা একদিন মায়ের হাতের বোনা কাঁথায় খুঁজে পাওয়া যেত, আজ সেই জায়গা দখল করেছে কলকারখানায় তৈরি চাদর–কম্বল, যা সহজলভ্য, সস্তা আর ঝক্কিহীন। দোকানের তাকে সাজানো ঝকঝকে কম্বলের সামনে ম্লান হয়ে পড়ে গ্রামের এক নারীর মাসের পর মাসের শ্রম দিয়ে বোনা কাঁথা। দোষটা নকশি কাঁথার নয়–দোষ আমাদের ব্যর্থতার। নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্যের মর্ম তুলে ধরতে আমরা যতটা ব্যর্থ হয়েছি, ঠিক ততটাই সফল হয়েছি এর বিকল্পকে জনপ্রিয় করে তুলতে, আর এই ব্যর্থতার মাশুল গুনতে হচ্ছে একটা গোটা ঐতিহ্যকে।
যাঁদের হাতে জন্ম নেয় এই শিল্প, সেই গ্রামীণ নারীরা কখনোই যথাযথ মূল্যায়ন পাননি। না মিলেছে প্রশিক্ষণের সুযোগ, না মিলেছে আর্থিক নিরাপত্তা, না মিলেছে তাঁদের শ্রমের সঠিক দাম। বছরের পর বছর ধরে একই রকম অবহেলা সয়ে গেছেন তাঁরা, অথচ তাঁদের হাতেই বেঁচে ছিল একটা গোটা সংস্কৃতি। ফলাফল–ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছেন সেই শিল্পীরা, একের পর এক গ্রামে থেমে যাচ্ছে সুঁইয়ের চলাচল, আর তাঁদের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে এক হাজার বছরের লালিত সংস্কৃতি, যা আর কখনো একই রূপে ফিরে আসবে না।
তারপরও নিভে যায়নি সব প্রদীপ। দেশের কোনো কোনো কোণে আজও কিছু মানুষ একলা লড়ে যাচ্ছেন এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে, নিজেদের সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছেন যেন এই ঐতিহ্য একেবারে হারিয়ে না যায়। পাবনার এক প্রান্তে দুই নারী মিলে গড়ে তুলেছেন ছোট্ট একটা উদ্যোগ। একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী, আরেকজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা–নিজেদের কর্মব্যস্ত জীবনের ফাঁকে ফাঁকে তাঁরা বুনে চলেছেন কাঁথা, পৌঁছে দিচ্ছেন শহরের নামীদামি শোরুমে। তাঁদের হাতে বোনা কাঁথায় আজও বেঁচে আছে সেই পুরোনো নিষ্ঠা, সেই একই যত্নের ছাপ, যা কখনো যন্ত্রে তৈরি হয় না। এমন ছোট ছোট উদ্যোগই আজ ধরে রেখেছে এই ঐতিহ্যের শেষ প্রদীপশিখা, একলা লড়াই করে হলেও নিভে যেতে দিচ্ছে না এই আলো।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়–শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগে কতদিন টিকে থাকবে হাজার বছরের এই সংস্কৃতি? একটা–দুইটা গ্রামের সাহসী উদ্যোগ দিয়ে সারা দেশের এই বিশাল ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। প্রয়োজন কারিগরদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা এবং সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা, যাতে একজন নারী মাসের পর মাস শ্রম দিয়ে যে কাঁথা বোনেন, তার ন্যায্য মূল্য তিনি পান। দেশি–বিদেশি মেলায় প্রদর্শনী, অনলাইনে সঠিক বিপণন, তরুণ প্রজন্মকে এই শিল্পের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া–এসব ছাড়া এই শিল্পকে বাঁচানো সম্ভব নয়। শুধু আবেগ দিয়ে ঐতিহ্য রক্ষা হয় না, তার সঙ্গে চাই বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা আর টেকসই উদ্যোগ।
নকশি কাঁথা শুধু একটা কাপড় নয়। এটা আমাদের মায়ের রাতজাগা পরিশ্রম, দাদির হাতের স্পর্শ, প্রবাসী প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষার প্রতীক। এই কাঁথার প্রতিটা ফোঁড়ে লেখা আছে বাংলার মাটির গল্প, লেখা আছে হাজারো নাম–না–জানা নারীর জীবনের ইতিহাস, যাঁদের কথা কোনো বইয়ে লেখা হয়নি, কিন্তু যাঁদের পরিশ্রমে টিকে ছিল একটা গোটা সংস্কৃতি। আজ যদি আমরা এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে না পারি, তাহলে একদিন এই কাঁথা শুধু জাদুঘরের কাচের বাক্সে বন্দি এক স্মৃতিচিহ্ন হয়ে থাকবে, যেখানে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকবে, কিন্তু ছুঁয়ে দেখতে পারবে না সেই উষ্ণতা, অনুভব করতে পারবে না সেই মমতার স্পর্শ। অথচ এই কাঁথার প্রাপ্য ছিল আরও অনেক বড় জায়গা–আমাদের ঘরে, আমাদের গর্বে, আমাদের প্রতিদিনের জীবনে, আমাদের সন্তানদের বিছানায়।
সময় থাকতে যদি আমরা সচেতন না হই, যদি এখনই এগিয়ে না আসি এই ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে, তাহলে যে সুঁই একদিন গেঁথেছিল হাজার বছরের গল্প, যে সুঁই একদিন জয় করেছিল বিশ্বের বাজার, সেই সুঁই হয়তো একদিন সত্যিই থেমে যাবে চিরতরে–আর তার সঙ্গে থেমে যাবে গ্রামবাংলার এক নিঃশব্দ কণ্ঠস্বর, যা আর কখনো ফিরে আসবে না।











