সাহস আশা প্রেরণা

ক্যান্সারজয়ী রোগীদের নিয়ে বৈশাখী মিলনমেলা, ব্যতিক্রমী আয়োজন

আজাদী প্রতিবেদন | রবিবার , ৩ মে, ২০২৬ at ১০:২৪ পূর্বাহ্ণ

সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, দেশে ক্যান্সার চিকিৎসায় বর্তমানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। অস্ত্রোপচার, ওষুধ ও রেডিয়েশনের সমন্বিত চিকিৎসার ফলে অনেক রোগী সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছেন। তাই ক্যান্সার মানেই জীবন শেষএ ধারণা সঠিক নয়।

গত শুক্রবার দুপুরে নগরীর জিইসি কনভেনশন সেন্টারে ক্যান্সারজয়ী অদম্য যোদ্ধাদের সাহস ও জীবনের জয়গান উদ্‌যাপনে আয়োজিত বৈশাখী মিলনমেলায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘লড়াই শেষে জয়ের সাজ, অদম্য যোদ্ধাদের উদ্যোগ আজ’এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা. ভাস্কর চক্রবর্তীর তত্ত্বাবধানে মিলনমেলার আয়োজন করা হয়।

মেয়র বলেন, চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীর মানসিক শক্তি, পরিবারের সহযোগিতা এবং সঠিক পুষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের আয়োজন ক্যান্সারজয়ীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং সমাজে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সহায়তা করে। তিনি বলেন, দেশে অনেক সময় রোগ দেরিতে শনাক্ত হওয়ায় চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে পরীক্ষা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। ক্যান্সার থেকে সুস্থ হওয়ার পর রোগীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে পরিবার ও সমাজের সহমর্মিতা প্রয়োজন। আজকের এই আয়োজন প্রমাণ করে, ইচ্ছাশক্তি ও সঠিক চিকিৎসা থাকলে ক্যান্সার জয় করা সম্ভব। এই অদম্য মানুষগুলো আমাদের সবার জন্য অনুপ্রেরণা।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে একুশে পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব ও দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক বলেন, ক্যান্সারজয়ী পেশেন্টরা আমাদের যে সাহসের কথা শুনিয়ে গেলেন, এতে আমাদের সাহস অনেক বেশি বেড়ে গেছে। ক্যান্সার ইজ এ ওয়ার্ড, নট এ সেন্টেন্স। এই কথাটি বলেছিলেন ক্যান্সার আক্রান্ত এক ব্রিটিশ সাংবাদিক। সেন্টেন্সের পর ফুলস্টপ বসে যায়, কিন্তু ওয়ার্ডের পর ওয়ার্ড বসিয়ে স্বপ্ন রচনা করা যায়। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, ক্যান্সার শব্দটা শুরু হয়েছে ‘ক্যান’ দিয়ে, সি এ এন। তার অর্থ হচ্ছে ‘পারি’। মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি। আত্মসেবা, মানবতার সেবা করতে পারি। অসুস্থ, অসহায় মানুষকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করতে পারি। তাদের স্বপ্ন দেখাতে পারি। এর জন্য চাই আত্মবিশ্বাস।

তিনি বলেন, আপনারা জানেন, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের যে ক্যান্সার ইনস্টিটিউটটা হয়েছে, সেটার সঙ্গে আমি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আজ আপনাদের সেই গল্পটা বলি। আসলে সেটা গল্প না, সত্য ঘটনা। একদিন আমার অফিসে এক লোক এলেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি আমাকে চেনেন? আমি বললাম, না তো, আপনার সাথে তো কোনোদিন দেখা হয়নি। তিনি বললেন, আপনার সাথে একটু কথা বলব। আমি বললাম, ঠিক আছে, বসেন। তিনি বলেন, গতকাল সন্ধ্যার সময় ডাক্তার আমাকে বলেছেন, আমি ক্যান্সার পেশেন্ট। আমি মনে করলাম, তিনি হয়তো আমার কাছে সাহায্য চাওয়ার জন্য এসেছেন। বললাম, ক্যান্সার হলে তো অসুবিধার কিছু নেই। আপনার যদি প্রাথমিকভাবে ধরা পড়ে তাহলে ভালো হয়ে যাবেন। এখন কিন্তু ক্যান্সারের অনেক ভালো চিকিৎসা আছে। তিনি বললেন, না। আমি সাহায্যের জন্য আসিনি। আমি আপনার কাছে এসেছি নিজেকে একটু হালকা করতে। আমার একটা পরিবার আছে। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে আছে। আমি তো মধ্যবিত্ত ঘরের লোক, ছোট একটা চাকরি করি। আমি ক্যান্সার আক্রান্তএটি আমার পরিবারকে জানাতে চাই না। বললাম, কেন জানাতে চান না? তিনি বললেন, দেখেন, আমার পরিবার যদি জানে আমার ক্যান্সার হয়েছে, তাহলে কী হবে? তারা আমার জায়গাজমি যেগুলো আছে, সব বিক্রি করে ক্যান্সারের ট্রিটমেন্ট করাবে। কিন্তু আসলে আমি আলটিমেটলি মারা যাব। আমি বললাম, মারা গেলে তো ভাই কদিন পরে মরবেন। এখন ট্রিটমেন্ট না করলে তো তাড়াতাড়ি মারা যাবেন। তিনি বললেন, আমি আসলে জানাতে চাচ্ছি না। শুধু আপনাকে এ কথা বলে একটু হালকা হতে এলাম। এই বলে তিনি চলে গেলেন।

এম এ মালেক বলেন, এ ঘটনার প্রায় পাঁচসাত দিন পর চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল থেকে টেলিফোন করে জানাল, আমার সাথে তারা দেখা করতে চায়। তার পরদিন হাসপাতালের লোকজন আমাকে বললেন, দেখেন, চট্টগ্রামে ক্যান্সারের স্পেশালাইজড কোনো হসপিটাল নাই। তখন আমার মনে হলো, আরে, ওই লোক এলো কেন? উনাকে পাঠিয়ে নিশ্চয়ই উপরওয়ালা কোনো ইঙ্গিত দিয়ে আমাকে বলেছেন, ‘ইউ মাস্ট টেক দিস জব’। তুমি একটু চেষ্টা করে দেখ, হয়তো হয়ে যেতে পারে। আমি রাজি হয়ে গেলাম। বিশ্বাস করুন, আমি ৩৫ কোটি টাকা তাদেরকে তুলে দিতে সক্ষম হয়েছি আপনাদের সহায়তায়। আজকে সেই ক্যান্সার হাসপাতাল, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে মা ও শিশু হাসপাতালে। আমি আমার মায়ের নামে একটা ওয়ার্ড করেছি, সেখানে ১০ তলা একটা বিল্ডিং আছে। সেই ওয়ার্ডে আমি এক কোটি টাকা দিয়েছি আমার ছেলে এবং আমার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে। তারা সানন্দে রাজি হয়েছে। এভাবে যদি আপনারা সকলে কিছু কিছু নিয়ে এগিয়ে আসেন, তাহলে নিশ্চয়ই আমরা সমাজে অনেক বড় বড়, ভালো ভালো কাজ করতে পারবসেটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

আজাদী সম্পাদক বলেন, ইংরেজিতে একটা সুন্দর কথা আছে, ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দেন কিউর’। আমরা সবসময় শরীর চেকআপে রাখব। বিশেষ করে বর্তমানে মহিলারা ব্রেস্ট ক্যান্সারে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হন। আপনারা যদি কোনো সময় ব্যথা বা কোনো কিছু অনুভব করেন, তবে লজ্জায় নিজেকে ঢেকে রাখবেন না। প্লিজ গো টু ইয়োর ডক্টর। অনেক মহিলা ডাক্তার এখানে আছেন। প্রথম স্তরে যদি রোগ ধরতে পারেন, তাহলে নিশ্চয়ই ভালো হবেন।

দৈনিক আজাদীর পরিচালনা সম্পাদক ওয়াহিদ মালেক বলেন, ক্যান্সারজয়ী রোগীদের উদ্যোগে আয়োজিত এই বৈশাখী মেলা সাহস, আশা ও জীবনের নতুন প্রেরণার প্রতীক। এখানে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের তৈরি পণ্য, হস্তশিল্প, খাবার ও সৃজনশীল কাজ প্রদর্শন করছেন। মেলার মূল উদ্দেশ্য হলো ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, রোগীদের মানসিক শক্তি জোগানো এবং সমাজকে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া। মানুষ হিসেবে যখন জন্মেছি তখন তো রোগ থাকবেই। কিন্তু থেমে গেলে চলবে না। রোগ জয় করে এগিয়ে যেতে হবে। এ মেলায় দর্শনার্থীরা শুধু কেনাকাটা নয়, বরং সংগ্রামী মানুষের অনুপ্রেরণামূলক গল্প জানার সুযোগ পাচ্ছেন। এই আয়োজন প্রমাণ করে, ক্যান্সারকে জয় করে নতুনভাবে জীবন শুরু করা সম্ভব। এমন মেলা সমাজে সহমর্মিতা, আত্মবিশ্বাস ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। আসুন আমরা সবাই মিলে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সুন্দর, বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করি।

বৈশাখী মেলার আয়োজক ঢাকার আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের প্রধান সমন্বয়ক (অ্যাকাডেমিক/রিসার্চ শাখা) ও কনসালটেন্ট (ক্লিনিক্যাল ও রেডিয়েশন অনকোলজি) ডা. ভাস্কর চক্রবর্তী বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, ক্যান্সার মানেই জীবনের শেষ নয়। বরং এটি এক নতুন সাহসের শুরু। এই মেলার মাধ্যমে আমরা সমাজের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিতে চাই যে, অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে যেকোনো বাধা জয় করা সম্ভব। আপনাদের উপস্থিতি এই সাহসী মানুষদের আগামীর পথচলায় নতুন প্রেরণা যোগাবে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রবর্তক সংঘ বাংলাদেশের সভাপতি ইন্দু নন্দন দত্ত, অ্যাডভোকেট আবু মো. হাসেম, ডা. মাহফুজুর রহমান, প্রফেসর রীতা দত্ত, অধ্যাপক ডা. আব্দুর সাত্তার, অধ্যাপক ডা. ফাহমিদা রশিদ, ডা. রেশমা শারমিন, অধ্যাপক ডা. সুকান্ত ভট্টাচার্য, অধ্যাপক মোজাম্মেল হক ও অধ্যাপক মো. আহম্মেদ সোবহান।

ব্যতিক্রমী এই বৈশাখী মেলায় প্রতিটি স্টল পরিচালনা করেন ক্যান্সারজয়ী সারভাইভার এবং বর্তমানে চিকিৎসাধীন সাহসী যোদ্ধারা। তাদের হাতে তৈরি হস্তশিল্প, বৈশাখী পোশাক এবং ঐতিহ্যবাহী পিঠাপুলির সমাহারে সাজানো ছিল পুরো আয়োজন। এছাড়া অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ ও ক্যান্সার জয়ের অভিজ্ঞতা শোনান। ছিল বিশেষ ফ্যাশন শো ‘বিজয়ের বেশে’। ছিল বৈশাখী আবহে গান ও পরিবেশনা, মেডিটেশন ও আড্ডা, রোগীদের জন্য বিশেষ সেশন ও ফটো বুথ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআমরা শুরু করব, তোমাদের এগিয়ে নিতে হবে
পরবর্তী নিবন্ধ৭৮৬