পরিসংখ্যান ব্যুরো ও বিভিন্ন বৈশ্বিক সংস্থার সামপ্রতিক তথ্য–উপাত্ত নিয়ে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা যেমন বহুগুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনই আন্তর্জাতিক সূচকে আমাদের তরুণদের কর্মমুখী দক্ষতা ও বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা তলানিতে গিয়ে ঠেকছে। দক্ষতার অভাবে একদিকে লাখ লাখ স্থানীয় গ্র্যাজুয়েট কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হয়ে বেকারত্বের বোঝা টানছেন, অন্যদিকে দেশের তৈরি পোশাক খাতসহ বৃহৎ বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোয় বিশ্বমানের দক্ষ ব্যবস্থাপকের মারাত্মক অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। ফলে শুধু শিল্প পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আনতে বাধ্য হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক তরুণ হওয়ায় যে জনমিতিক লভ্যাংশ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা বাংলাদেশের পাওয়ার কথা ছিল, অপরিকল্পিত শিক্ষা ও দক্ষতার অভাবে তা উলটো জাতীয় বোঝার ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশের জন্য মানবসম্পদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্পদকে কাজে লাগাতে না পারলে তা অভিশাপে পরিণত হয়। বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। দেশের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য এবং দেশের উন্নয়নে তাদের মেধাকে কাজে লাগাতে তাদেরকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর। তাঁরা বলেন, দক্ষ মানবসম্পদ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে এক নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। যখন কোনো দেশের বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা যায়, তখন তারা প্রাকৃতিক ও মূলধনী সম্পদের সঠিক ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়াতে পারে। যা বেকারত্ব দূর করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিকে টেকসই ও শক্তিশালী করে তোলে।
বিবিএসের জরিপ তথ্য অনুযায়ী, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর প্রতি তিনজনের দুজনই কমপক্ষে মাধ্যমিক ডিগ্রিধারী। শিক্ষাগত যোগ্যতা বিবেচনা করলে দেখা যায়, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৬ লাখ ৬৫ হাজার নারী–পুরুষ আছেন, যাঁরা কমপক্ষে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েও পছন্দমতো কাজ পাচ্ছেন না। আর মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পাস এমন নারীপুরুষের সংখ্যা সাড়ে ৩৭ লাখ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপে, কর্মক্ষম বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে বেকার, খণ্ডকালীন কর্মজীবী এবং সম্ভাবনাময় জনগোষ্ঠী–এ তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টার কম কাজ করেন, এমন ব্যক্তিদের খণ্ডকালীন কর্মজীবী হিসেবে ধরা হয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, খণ্ডকালীন কাজ করেন ১৪ লাখ ৬৫ হাজার জন। মূলত টিউশনি, খণ্ডকালীন বিক্রয় প্রতিনিধি, ফাস্ট ফুডের দোকানের বিক্রয়কর্মী, কল সেন্টারের কর্মী হিসেবে বিভিন্ন ধরনের কাজ করেন তাঁরা। পছন্দের কাজ না পেয়ে বাধ্য হয়ে তাঁরা এসব খণ্ডকালীন কাজের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছেন। তাই নিজেদের এ কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট নন তাঁরা। অন্যদিকে কোনো ধরনের কাজ খুঁজেও না পেয়ে পুরোপুরি বেকার রয়েছেন এমন নারী–পুরুষের সংখ্যা ২৬ লাখ ৭৭ হাজার। তাঁরা সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ করারও সুযোগ পাননি। এ বেকার শ্রেণিতে নারী ও পুরুষ প্রায় সমান সমান।
বাংলাদেশ ক্রমশ উন্নয়নশীল থেকে উন্নত দেশের দিকে হাঁটছে। তার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। এটি উন্নয়নের প্রাথমিক ভিত্তি। এর অংশ হিসেবে প্রচুর কল–কারখানা হবে, অবকাঠামো হবে, সুরম্য মার্কেট, শপিং মল হবে, হোটেল–মোটেল হাসপাতাল–বিনোদনকেন্দ্র হবে। প্রচুর কায়িক শ্রমনির্ভর বা ক্লারিক্যাল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু আমাদের কর্মের শ্রেণি–বিভাজিত দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকার লোকজন এসব মানের কাজ করতে আগ্রহী নয়। তারা চায় এক্সিকিউটিভ ধরনের চাকরি। সেটি হয়তো পাওয়া যাবে, তবে দেশ উন্নত রাষ্ট্রের মহাসড়কে উঠে গেলে তখন। এখন চলবে কনস্ট্রাকশন, তখন লাগবে মেইনটেন্যান্স। আসলে আমাদের দেশে কাজের চাহিদা আছে, কিন্তু স্ব স্ব ক্ষেত্রে দক্ষ লোক নেই। চাহিদা ও জোগানের মধ্যে একধরনের ফারাক আছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে বস্তুগত সম্পদের চেয়ে মেধাসম্পদ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই অর্থনীতির প্রতিটি খাতের জন্য মেধাভিত্তিক মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক বিশ্বে মেধাভিত্তিক সম্পদ যাদের বেশি রয়েছে তারা কৃষি, শিল্প, ব্যবসা–বাণিজ্য, সেবাসহ সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে। যার কারণে অনেক শিল্পোন্নত দেশের কৃষি উৎপাদন কৃষিভিত্তিক দেশের তুলনায় বেশি হয়ে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ৩৭ শতাংশ অবদান রাখছে মেধাভিত্তিক সম্পদ। বর্তমানে চীন ও ভারত মেধাভিত্তিক সম্পদ গড়ে তোলার জন্য জাতীয় পর্যায়ে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। এক্ষেত্রে বেশ খানিকটা পিছিয়ে বাংলাদেশ। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক এবং যুগোপযোগী করা দরকার।







