সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব

সিডিএর ২৫ বছরের খসড়া মহাপরিকল্পনা । বাস, রেল ও নৌপথকে একই গণপরিবহন নেটওয়ার্কের আওতায় আনা, টার্মিনাল নির্মাণ, ৩৮৫ কিমি সড়ক উন্নয়ন, ৬৮ গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা আধুনিক করাসহ অনেক পরিকল্পনা

হাসান আকবর | শনিবার , ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৬:১৩ পূর্বাহ্ণ

সড়ক বাড়ালে যানজট কমবেএমন ধারণা থেকে সরে এসে বাস, রেল ও নৌপথকে একই গণপরিবহন নেটওয়ার্কের আওতায় আনার ওপর জোর দিয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) আগামী ২৫ বছরের জন্য মহাপরিকল্পনা তৈরি করছে। ইতোমধ্যে একটি খসড়া মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে সিডিএর ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এই মহাপরিকল্পনার ব্যাপারে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নাগরিকদের মতামত, আপত্তি ও পরামর্শ নেওয়া হবে। এরপর সেগুলো পর্যালোচনা করে পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের আজকের যানজট শুধু বর্তমানের সমস্যা নয়। আগামী ২৫ বছরে নগর ও আশপাশের এলাকার মানুষের যাতায়াত যে হারে বাড়বে, তাতে এখনকার বিচ্ছিন্ন ও বিশৃঙ্খল পরিবহনব্যবস্থা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। এই মহাপরিকল্পনায় চট্টগ্রাম নগরী ছাড়াও আশপাশের পৌরসভা ও উপজেলাগুলোকে সিডিএর আওতায় এনে মোট ১ হাজার ২৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২২ সালে চট্টগ্রাম নগরী ও আশপাশের এলাকায় প্রতিদিন মোট যাতায়াত ছিল ৭৪ লাখ ৩৮ হাজার ট্রিপ। ২০৩০ সালে তা বেড়ে ৯২ লাখ ৮৮ হাজার, ২০৪০ সালে ১ কোটি ২২ লাখ এবং ২০৫০ সালে ১ কোটি ৫৬ লাখ ৬৯ হাজার ট্রিপে দাঁড়াতে পারে। সমীক্ষা অনুযায়ী, ২৮ বছরে দৈনিক যাতায়াত বাড়বে প্রায় ৮২ লাখ ট্রিপ, যা বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি চাপ তৈরি করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাড়তি চাপ সামলাতে বিপুল ব্যয়ের মেট্রোরেল বা মনোরেলকে তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে না দেখে বিদ্যমান বাস ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সিডিএর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ৭০০টি আধুনিক বাসের একটি সংগঠিত বহর, কোম্পানিভিত্তিক পরিচালনা, কমিউটার ট্রেন এবং কর্ণফুলী নদীতে ওয়াটার বাস চালুর মাধ্যমে একটি সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এতে বলা হয়, বর্তমানে নগরীর বিভিন্ন রুটে প্রায় ১ হাজার ১০০ বাস চলাচল করছে। কিন্তু রুটের বিশৃঙ্খলা, একই পথে অতিরিক্ত বাস, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, অপরিকল্পিত স্টপেজ এবং পৃথক মালিকানাভিত্তিক পরিচালনার ফলে এতে সুফল মিলছে না বলে পরিকল্পনাবিদরা মন্তব্য করেছেন। তারা বলেন, সমস্যা বাসের সংখ্যা কমবেশি হওয়া নয়, মূল সংকট হচ্ছে বিশৃঙ্খলভাবে বাস চলাচল, একই পথে অতিরিক্ত বাস, ইচ্ছেমাফিক যাত্রী ওঠানামা, যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে যাওয়া, পৃথক মালিকানাভিত্তিক পরিচালনা। তাই ৭০০ আধুনিক বাস দিয়েই ভবিষ্যতের চাহিদার বড় অংশ পূরণ করা সম্ভব বলে মহাপরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে। এজন্য বাসগুলোকে এক বা একাধিক কোম্পানির অধীনে এনে রুট পুনর্বিন্যাস, নির্দিষ্ট সময়সূচি, আধুনিক টিকেটিং, বেতনভুক্ত চালক এবং কর্মদক্ষতাভিত্তিক পরিচালনার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

পরিকল্পনায় গণপরিবহনের হিস্যা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২২ সালে মোট যাতায়াতের মাত্র ২১ শতাংশ গণপরিবহনের মাধ্যমে হয়েছে। ২০৩০ সালে তা ২৪ শতাংশ, ২০৪০ সালে ২৬ শতাংশ এবং ২০৫০ সালে ২৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও অন্যান্য ব্যক্তিগত যাননির্ভরতা কমিয়ে মানুষকে গণপরিবহনে ফিরিয়ে আনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এজন্য বাস খাতের অবকাঠামোতে বড় বিনিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। বাস, টার্মিনাল, ডিপো, বাসবে ও স্টপেজ নির্মাণ এবং আধুনিকায়নে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে। এর সঙ্গে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল ও পার্কিং ব্যবস্থাপনার জন্য আরও ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। সব মিলিয়ে বাস, ট্রাফিক ও পার্কিং ব্যবস্থার আধুনিকায়নে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে।

তবে চট্টগ্রামের পরিবহন সংকটের সমাধান শুধু বাস বাড়ানো বা সড়ক প্রশস্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। খসড়া পরিকল্পনায় মোট ৩৮৫ দশমিক ৫৭ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে ২৪৪ দশমিক ৯৭ কিলোমিটার বিদ্যমান সড়ক উন্নয়ন এবং ১৪০ দশমিক ৬ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। নগরীর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রশস্ত করার পাশাপাশি নগরীর সঙ্গে বিভিন্ন উপজেলা ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রের নতুন সংযোগ তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, যেখানে প্রয়োজন সেখানে সড়ক বাড়াতে হবে, কিন্তু সড়ক বাড়ানোকে যানজট নিরসনের একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখা যাবে না। কারণ চট্টগ্রামের যানজটের পেছনে রাস্তার ধারণক্ষমতার পাশাপাশি অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল, যত্রতত্র বাস থামানো, দুর্বল মোড় ব্যবস্থাপনা, সড়কে পণ্যবাহী যান রাখা এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করাও বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

এসব নিয়ন্ত্রণে ৬৮টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা আধুনিক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে পার্কিং ব্যবস্থাপনাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার জন্য পৃথক বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। পরিকল্পনায় যে ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা ট্রাফিক ও পার্কিং ব্যবস্থার জন্য ধরা হয়েছে, তার লক্ষ্য মূলত রাস্তার বিদ্যমান সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ কাজে লাগানো।

চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ পরিবহন ব্যবস্থায় রেলকে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। শহরের সঙ্গে সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী ও পটিয়ার সরাসরি কমিউটার ট্রেন চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষ করে অব্যবহৃত বা কম ব্যবহৃত বিদ্যমান রেল অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে যাত্রী পরিবহন বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে শহরের বাইরে বসবাসকারী বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিদিন সড়কপথে প্রবেশ না করে রেলপথে নগরীতে আসাযাওয়া করতে পারবেন।

পরিকল্পনায় কর্ণফুলী নদীকে নগর পরিবহন ব্যবস্থার অংশ করার কথা বলা হয়েছে। নদীর বিভিন্ন ঘাটের মধ্যে ওয়াটার বাস চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্রিক রিভার ক্রুজ চালুর সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। তবে নিয়মিত ওয়াটার বাস চালুর আগে যাত্রী চাহিদা, নৌপথের নিরাপত্তা, ঘাটের অবকাঠামো, সময় ও ব্যয় বিবেচনায় একটি পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রয়োজন হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

মেট্রোরেল প্রসঙ্গে খসড়া পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, একটি মেট্রোরেল ব্যবস্থাকে অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর করতে প্রতি ঘণ্টায় প্রতি দিকে প্রায় ১৮ হাজার যাত্রীর মতো উচ্চ চাহিদা প্রয়োজন। চট্টগ্রামে ২০৪০২০৫০ সালের আগে এ ধরনের যাত্রীর চাপ পাওয়া কঠিন হতে পারে। এমনকি কিছু পরিস্থিতিতে ২০৮০ সালের আগেও প্রয়োজনীয় যাত্রী চাহিদা নাও তৈরি হতে পারে। ফলে এখনই ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকার মতো বিপুল বিনিয়োগ করে মেট্রোরেল বা মনোরেল নির্মাণের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কম ব্যয়ে বাস, রেল ও নৌপথের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

যাত্রী চাহিদা তৈরি হলে ভবিষ্যতে উচ্চক্ষমতার রেলভিত্তিক গণপরিবহন চালুর সুযোগ রাখা হয়েছে। আপাতত লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি পরিবহন নেটওয়ার্ক তৈরি করা, যার ওপর ভবিষ্যতের বৃহৎ গণপরিবহন ব্যবস্থা দাঁড় করানো যাবে।

শহরের যানজটের বড় একটি অংশ তৈরি হয় আন্তঃজেলা বাসের কারণে। নগরীর ভেতরে যাত্রী নামানোওঠানোর পাশাপাশি দূরপাল্লার বাসগুলো শহরের সড়ক ব্যবহার করায় কেন্দ্রীয় এলাকার ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। এ সমস্যা কমাতে আনোয়ারা, পটিয়া, কর্ণফুলী, বোয়ালখালী, সীতাকুণ্ডের সলিমপুর ও রাউজানে নতুন বাস টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। হাটহাজারীর বিদ্যমান টার্মিনাল সম্প্রসারণ এবং নগর ও আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালগুলোর উন্নয়নের কথাও পরিকল্পনায় বলা হয়েছে।

বন্দরনগরীর পরিবহন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চাপগুলোর একটি পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান। বন্দরের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন শিল্প ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের পণ্য পরিবহনের কারণে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে এসব যান চলাচল করে। এ চাপ কমাতে অন্তত ১০ হাজার ট্রাক ধারণক্ষমতার একাধিক আধুনিক ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী সলিমপুরে ২ হাজার ট্রাক এবং ভাটিয়ারী, আনোয়ারা ও কর্ণফুলীতে ১ হাজার করে ট্রাক ধারণক্ষমতার টার্মিনাল করা হবে। এর বাইরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বে টার্মিনাল এলাকায় ৫ হাজার ট্রাক ধারণক্ষমতার পৃথক টার্মিনাল নির্মাণ করছে। ফলে ভবিষ্যতে বন্দরের পণ্যবাহী যানগুলোকে নগরীর সড়কে অপেক্ষা না করিয়ে নির্দিষ্ট টার্মিনালে রাখা সম্ভব হলে যানজট কমানোর পাশাপাশি বন্দরকেন্দ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থাপনাও আরও সুশৃঙ্খল হতে পারে।

শহরের কেন্দ্রের ওপর চাপ কমাতে ‘এক শহর দুই নগর’ ধারণাসহ নতুন উন্নয়ন এলাকা তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। মানুষের বসবাস, কর্মসংস্থান, শিল্প, শিক্ষা ও বাণিজ্য যদি একই কেন্দ্রকে ঘিরে থাকে, তাহলে প্রতিদিন বিপুল মানুষকে এক জায়গায় আসতে হবে। কিন্তু আবাসিক ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্রগুলো বিকেন্দ্রীভূত করা গেলে দৈনিক যাতায়াতের দূরত্ব ও চাপ উভয় কমানো সম্ভব। শুধু রাস্তা ও বাস নয়, ভবিষ্যৎ নগর কাঠামোকেও পরিবহন পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সিডিএর উপপ্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রকল্প পরিচালক মো. আবু ঈসা আনছারী বলেন, চট্টগ্রামের পরিবহন সমস্যা শুধু সড়ক প্রশস্ত করে সমাধান করা সম্ভব নয়। বাড়তে থাকা যাতায়াতের চাপ সামলাতে গণপরিবহনকে সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে। তাই পরিকল্পনায় বাসের রুট পুনর্বিন্যাস, অব্যবহৃত বা স্বল্প ব্যবহৃত রেললাইন কাজে লাগানো এবং নৌপথকে গণপরিবহনে যুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৬৭ বছরে আজাদী
পরবর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা