সাজন ডাক্তারমামার চেম্বারে ঢোকে এক হাতে স্মার্টফোন স্ক্রল করতে করতে। রেটিং কুশলী টাইপিস্টের চেয়েও দ্রুতগতির। তার চোখে পাওয়ারি চশমা। কানে হেড–ফোন। চুল উসকো–খুসকো। পর্তুৃগাল প্লেয়ারের স্টাইলে ছাঁটা। পরনে ফুল প্যান্ট। পায়ে বিধ্বস্ত চটি। পিঠে ব্যাগের চেইন অর্ধেক খোলা। তা দিয়ে দুমড়ে–মুচড়ে রাখা খাতা–কাগজ মুখ বার করে আহ্লাদপূর্বক সবাইকে দেখছে।
দুই আঙুলে পাঁচটা চিপসের টুকরো মুখে পুরে রাগ–মেজাজে মাকে বলে– ‘প্যাকেট এভাবে ধরতে পারো না !’ তৈরি হয় চিবানোর কুড়মুড় শব্দ–লহরী। সাজনের মায়ের একহাতে দামী আইফোন সেট।
ক্লাশ ফাইভে পড়ে সাজন। চেম্বারকক্ষে ঢুকতে জোর ধাক্কা খায় দরোজার চৌকাঠে। কঁকিয়ে ওঠে ব্যথায়। নিজ নিজ মোবাইল স্ক্রিনে ব্যস্ত ছিলেন সাজনের বাবা–মা। একসঙ্গে ভর্ৎসনা সুর মিশিয়ে বলেন-‘হাঁটার সময় খেয়াল রাখবে না!’
শিশুকে স্টেথো বসিয়ে পরীক্ষা করার গুরুত্বপূর্ণ আগের ধাপ– অভিভাবকের সাথে চেম্বারে ঢোকার সময়, মায়ের সাথে কথা বলার সময় শিশুকে পর্যবেক্ষণ করা। এটা শিশুচিকিৎসাবিদ্যার একটা অত্যাবশ্যক অংশ। শিশুটি অসুস্থ দেখাচ্ছে কি? সে আশেপাশের পরিবেশে আগ্রহী কি? হাঁটার ধরনে বা শারীরিক গঠনে কোনো স্পষ্ট অস্বাভাবিকতা আছে কি? বিকাশে কোনো অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য আছে কি? শ্বাসপ্রশ্বাসে কোনো সমস্যা আছে কি? শিশু সুস্থভাবে পুষ্টি পেয়েছে নাকি অপুষ্ট বা ক্ষীণ দেখাচ্ছে? ইত্যাদি।
রোগীর ইতিহাস গ্রহণ একটা যোগাযোগের শিল্প। যখন পরিবার কক্ষে প্রবেশ করে, তাদের বন্ধুত্বপূর্ণভাবে অভ্যর্থনা জানানো এর অন্যতম। চিকিৎসক–রোগী–পিতামাতা সম্পর্ক গড়ে তোলার গুরুত্ব অপরিসীম। কোমল ও বন্ধুসুলভ আচরণ এবং শান্ত স্বর পরিবেশ স্থাপনে সহায়ক হয়। কোনো তাড়াহুড়োর ছাপ না ফেলাই শ্রেয়।
ডাক্তারমামা যখন সাজনের মায়ের কাছে সন্তানের উপস্থাপিত অভিযোগ জানতে চান– তখন তিনি ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটা কাগজ বের করে ডাক্তারের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেন-‘এই নেন ’। মনে হবে যেন বাজারের ফর্দ একখানা। তবে হস্তাক্ষর যেন মুক্তোর মালা।
ডাক্তার সাজনের মায়ের দেওয়া উপসর্গনামা কবিতার চরণ পড়ে যাবার মতো পড়তে থাকেন। তাতে প্রধান অভিযোগগুলো রোগীর ভাষায় এবং সময়কাল উল্লেখ করে সংজ্ঞায়িত। যেমন–
পঠন–পাঠনে অমনোযোগী, শোনার আগ্রহ কম, গুছিয়ে কিছু করতে পারে না, বার বার নোটবুকস্ , খাতাপত্র হারিয়ে বসে, স্কুল ওয়ার্কেও অন্যান্য সকল কাজে না তোয়াক্কা ভাব।
সাজনের মায়ের চোখ সদাজাগ্রত তাকিয়ে–ডাক্তার কাগজখানার কোনো শব্দ–বাক্য এড়িয়ে যাচ্ছেন কিনা। তালিকার উল্টো–পিঠে চোখ বোলানো শুরুর আগেই তিনি বলে ওঠেন–অন্যপৃষ্ঠায়ও আছে ডাক্তার। ‘হ্যাঁ হ্যাঁ দেখছি’। তাতে উল্লেখ সাজনের আরো আরো উপসর্গ– ডানপিঠে অতি দুরন্ত, সদাচঞ্চল, কোথাও স্থির হয়ে বসে থাকে না, পারে না এক লাইনে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে, অন্যান্য অভিভাবক, শ্রেণি–শিক্ষিকার কাছে প্রায় প্রতিদিন এসব নিয়ে নালিশ শুনতে হয়।
ডাক্তার লক্ষ্য করেন–এরি মধ্যে সাজন নিজ চেয়ার ছেড়ে একবার মায়ের পেছনে দাঁড়ায়। পরক্ষণে বসে পড়ে বাবার পাশে থাকা টুলে। ডাক্তার তাকে জিজ্ঞেস করেন-‘সাজন তুমি এখন কোন ক্লাশে পড়ো ?’
সাজন সে প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে মোবাইল টিপতে থাকে। হঠাৎ বুক–সেলফের ভেতর দিকে থাকা শো–পিসখানা হাতে নিয়ে নেচে নেচে আনন্দ–চীৎকার শুরু করে। ‘ইউরেকা, ইউরেকা’র মতন । ভয় পান ডাক্তারমামা। কেননা এ গৌরব উপহার তিনি পেয়েছেলেন এক আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক অধিবেশনে।
যাদু কায়দায় শো–পিসটা নিরাপদে সরিয়ে নেন ডাক্তার। অভিজ্ঞতার দক্ষতায় চটজলদি সাজনের কিছু শারীরিক পরীক্ষাও সেরে নেন। এরপর সাজনের মাকে বলেন-‘ওর রোগের নাম আমি প্রেশক্রিপশনে লিখে রাখলাম’।
‘অ্যাটেনশান ডেফিসিট হাইপার অ্যাকটিভিটি ডিসঅর্ডার। সংক্ষিপ্ত নাম এডিএইচডি। স্কুল বয়সের ৮–১০ শতাংশ শিশুতে এটা হতে পারে। তাই এই রোগ শিশুদের কমন আচরণজনিত সমস্যারূপে স্বীকৃত। মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের মধ্যে এর প্রকোপ ৩ গুণ বেশি’।
‘এসব শিশু কোথাও স্থির হয়ে বসে থাকতে পারে না। মনোযোগ দিয়ে কিছু করে না। তবে যথাযথ চিকিৎসা পেলে ভালভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে। তার উপসর্গাদিরও লাঘব হয়’।
সাজনের মা সাথে সাথে সায় দিয়ে বলেন-‘হ্যাঁ ডাক্তার। আপনার কথাই ঠিক। মাঝে মাঝে আমার সন্তানকে আমি চিনতে পারি না। মনে হয় এ কি মানব শিশু ? নাকি কোনো রোবট? আমার ছেলেটার জন্য প্লিজ কিছু করুন’।
ডাক্তার যোগ করেন-‘্এরা দুই প্রকারের হয়। প্রথমটা হলো অমনোযোগী টাইপের, আর দ্বিতীয়টা হলো–ডানপিটে দুরন্ত, যাকে বলে হাইপার অ্যাকটিভ। সাজন অবশ্য দু’য়ের মিলিত ধারা। এসব শিশুর ব্রেইন কেমিক্যালসে পরিবর্তন থাকে। এ অসুখের যোগসূত্র– গর্ভকালীন সময়ে মায়ের ধূমপান, প্রিম্যাচিওর ডেলিভারি, কম জন্মওজন, জন্মকালীন সময়ে মাথায় আঘাত, কম বয়সে অতিরিক্ত টেলিভিশন দেখা ইত্যাদি কারণে’। ‘তবে মনে রাখতে হবে এ শিশু খারাপ না, এরা ইচ্ছে করে এরূপ করে না। মেডিসিন বা বিহেভিয়োরেল থেরাপি ছাড়া এরা এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না’।
সাজন অকস্মাৎ দরোজা খুলে বাইরে বেরিয়ে যায। সাজনের মা ত্বরিত সাজনের বাবার দিকে চেয়ে বলেন-‘দেখো দেখো ওকে। কোনদিকে যাচ্ছে দেখো’। ‘সত্যি বলতে কি, সাজনকে আরো আগে ডাক্তার দেখানো উচিত ছিল। সাথে আপনারা দুজনের মোবাইল আসক্তিও কমাতে হবে। ব্যবহার করতে হবে নিয়ম–নীতি মেনে। জানেন–তো অস্ট্রেলিয়াতে ১৪ বছরের নিচে শিশুর হাতে স্মার্টফোন না দেওয়ার আইন পাশ হয়েছে !’ সাজনের মা স্বামীর দিকে অঙুলি নিদের্শপূর্বক বলেন– ‘ডক্টর, উনি উনি উনি। বাসায় ঢোকার সাথে সাথে মোবাইল নিয়ে ডুব দেন। ছেলের চেয়েও বেশি। ছেলের সাথে ভালো করে দুটো কথাও বলে না ’। ডাক্তার বিহেভিয়ারেল থেরাপিস্ট পুষ্পিতার হাতে ছাপানো চিকিৎসা–পত্রখানা দিয়ে বলেন, যেন সে পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা সাজনের মা–বাবাকে বুঝিয়ে দেয়। তাতে আছে– ১.উত্তেজক, অনুত্তেজক বা এন্টিডিপ্রেশন্টস ঔষধ। ২.বিহেভিয়ারেল থেরাপি–
সহজ দৈনন্দিন রুটিন মেনে তাকে পরিচালনা–ঘুম থেকে ওঠা হতে রাতে বিছানায় শুতে যাওয়া পর্যন্ত।
সব কিছু গোছগাছ করে রাখা–যাতে শিশু তা হারিয়ে না ফেলে।
মনোযোগ ক্ষুণ্ন হয় এসব দেখা থেকে তাকে বিরত রাখা, যেমন– টিভি, ভিডিও বিশেষত হোম ওয়ার্ক করার সময়ে।
তার পছন্দের তালিকা ছোট রাখা– যাতে সে বেশি পছন্দের ভিড়ে ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে বসে।
বাচ্চার সাথে সহজ সাদামাটাভাবে কথা বলা।
ভালো করলে পুরস্কৃত করা
নিয়ম–শৃঙ্খলা বজায় রেখে চলা।
শিশুর দক্ষতা কোথায় তা বের করে তাকে তার সামর্থ্য প্রদর্শনের সুযোগ সৃষ্টি করা।
৩. মা–বাবাকে পুরো বিষয়ে শিক্ষিত সচেতন করে তোলা ও তাদের দিকে সহযোগিতা সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া।
ইতোমধ্যে একজন গুরুতর অসুস্থ শিশু দেখার ডাক আসে ডাক্তারের। চেয়ার ছেড়ে বেরোনোর সময় সাজনের মাকে উদ্দেশ্য করে– ডাক্তার মামার দার্শনিক বচন শোনা যাচ্ছে– ‘মোবাইলযুগে আমাদের সবাইকে বদলাতে হবে। এখন জীবন কথা বলে না। যন্ত্র কথা বলে ’।
লেখক : সাবেক বিভাগীয় প্রধান, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ,
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।














