শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সমাজ: সামাজিক প্রতিবিম্ব

বিচিত্রা সেন | শনিবার , ২৩ মে, ২০২৬ at ১০:২৪ পূর্বাহ্ণ

শিক্ষাসংস্কৃতি ও সমাজ’ অধ্যক্ষ ছন্দা চক্রবর্তীর প্রবন্ধগ্রন্থ। গ্রন্থটিতে মোট বিশটি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। প্রতিটি প্রবন্ধই শিক্ষা, সংস্কৃতি কিংবা সমাজের আলোচিত কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে লিখিত। প্রবন্ধগুলো পাঠ করলে সহজেই বোঝা যায় প্রাবন্ধিক একজন সমাজসচেতন ব্যক্তিত্ব। তাঁর লেখায় একদিকে যেমন উঠে এসেছে আমাদের শিক্ষাক্রম নিয়ে ভাবনা, অন্যদিকে আবার উঠে এসেছে আমাদের মানসগঠনে বরণীয় ব্যক্তিত্বদের ভূমিকা।

বাঙালির আবেগী মাস’ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন, যা অনেকেরই অজানা। তিনি বলেছেন, ‘আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওনের রাষ্ট্রীয় ভাষা বাংলা। আমাদের দেশ থেকে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ বাহিনীতে যোগ দেওয়া সেনাবাহিনীর তৎপরতায় সিয়েরা লিওনের জনগণকে বাংলা ভাষা শিখাতে সক্ষম হয়েছেন; এমনকি সিয়েরা লিওনে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দিয়েছে।’ একজন প্রাবন্ধিকের কাজই হচ্ছে পাঠককে নতুন নতুন বস্তুনিষ্ঠ তথ্য জানানো।

প্রাবন্ধিক ছন্দা চক্রবর্তী চান এ দেশের মেয়েরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। তারা তাদের আত্মপরিচয় খুঁজে নিক। এ প্রসঙ্গে তিনি বেগম সুফিয়া কামালের কথা বলেছেন। ‘সংগ্রামী দৃঢ়চেতা সুফিয়া কামাল’ প্রবন্ধে তিনি ঘোষণা করেছেন,

সুফিয়া কামাল এক বিরুদ্ধ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে কঠিন সংগ্রামের মাধ্যমে নিজেকে বিকশিত করেছেন। সমগ্র নারীজাতি তাঁর এই বিরুদ্ধ বাস্তবতার সাফল্যকে প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করেছে। ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর এই মহীয়সী নারীর মৃত্যু হয় বটে কিন্তু মানব ইতিহাসে, নারী জাগরণে, সমাজ বিনির্মাণে, নারী আন্দোলনে, নারীর অধিকার আদায়ে তিনি সাহসী ভূমিকা পালন করে হয়েছেন ‘জননী সাহসিকা। এই জননী সাহসিকার জীবনের ইতি নেই। বর্তমান নারীসমাজে আজ তাঁর মতো ত্যাগী সাহসিকার বেশি প্রয়োজন বলে তিনি সদা স্মরণীয়।’

১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের বীরাঙ্গনাদের অবদান ছন্দা চক্রবর্তী স্বীকার করেন কৃতজ্ঞচিত্তে। তিনি মনে করেন বীরাঙ্গনাদের যতটুকু প্রাপ্য ছিল দেশ তা তাঁদের দেয়নি। যার ফলে বীরাঙ্গনারা আত্মপরিচয় দিতে কুণ্ঠিত। ‘মুক্তিযুদ্ধে বীরাঙ্গনাদের অবদান’ প্রবন্ধে তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের সমাজে এই বীরাঙ্গনাদের সঠিক সম্মান বহুকাল থেকে অধরাই থেকে গিয়েছে। সমাজে বীরাঙ্গনাদের সম্বন্ধে আগ বাড়িয়ে কেউ কিছু জানতে চাইলেই ছিঃ ছিঃ করেছে এবং লজ্জার কথা বলে এড়িয়ে গেছে। যার ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে এখনো অধরাই থেকে গেছে বীরাঙ্গনা নারীদের অবদান।’

সমকালীন সমাজ প্রাবন্ধিককে ভাবায়। অধুনা প্রচলিত ‘মা দিবস’ পালনকে তিনি ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখেন। অনেকে এ দিবসের বিরোধিতা করলে তাঁদের সম্পর্কে ‘মা দিবস ও অনাগত মা’ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক বলেন,

অবশ্য মাতৃভক্তরা তো বলেই থাকে প্রতিদিনই তাদের কাছে মা এর জন্য মা দিবস, সেটাই হওয়ার কথা। কিন্তু সবার মা যদি সবার কাছে প্রতিদিন মা দিবস নিয়ে মনের কোটরে সত্যি সত্যি আসীন থাকতো, তবে এত বৃদ্ধাশ্রমে মাদের দেখা যেত না। সে যাই হোক, মাকে নিয়ে আলাদা একটি দিন, উদযাপনের দিন, ভালোলাগার দিন, মায়েদের পরিতৃপ্তির দিন।’

একজন প্রকৃত মানুষ হতে গেলে পাঠাভ্যাস যে কতটা জরুরি তা চমৎকারভাবে তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর ‘শিক্ষা ও সংস্কার ঋদ্ধ হয় পাঠাভ্যাসের ফলে’ প্রবন্ধে। তিনি বলেছেন,

পানি এক হওয়া সত্ত্বেও করলা তিক্ত, মরিচ ঝাল আর আখ মিষ্টি হয়। এটা পানির কারণে নয়, বীজের কারণে হয়। ঠিক তেমনই মানুষ সব এক হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষা ও সংস্কারের কারণে, একে অপরের থেকে ভিন্ন হয়।’

নারীর মাতৃত্বকালীন সময়টা বড়ই সংকটের। এ সময় নারী দ্বিতীয়বার জন্ম নেয়। আমাদের দেশে শ্রমজীবী এবং কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। তাঁরা মাতৃত্বকালীন সময়ে মারাত্মক সংকটের মুখোমুখি হন। এ প্রসঙ্গে ছন্দা চক্রবর্তী তাঁর ‘নারীর মাতৃত্বসংক্রান্ত সুযোগসুবিধা ও অধিকার’ প্রবন্ধে সরকারের কাছে কিছু সুপারিশ পেশ করেন। তিনি বলেন,

প্রত্যেক প্রসূতি মাকে সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে প্রথমত সরকারকে বাজেট, জনবল, প্রশিক্ষিত নার্স বাড়াতে হবে। মাতৃত্বকালীন সুযোগসুবিধা নিশ্চিত ও অধিকার আদায় করার জন্য প্রত্যেক প্রসূতি মাকে সরকারি উদ্যোগে রেজিস্ট্রিভুক্ত করে নিতে হবে। এবং সেই অনুযায়ী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে প্রত্যেক প্রসূতিকে প্রসবকালীন সময়ের আগে ও পরে প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা প্রদান কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। সব প্রসূতিকে হাসপাতালে নিয়ে আসার এবং হাসপাতালেই প্রসবের ব্যবস্থা করতে হবে।’

একজন সমাজসচেতন মানুষ হিসেবে প্রাবন্ধিক আমাদের প্রচলিত উৎসবগুলোকে প্রত্যক্ষ করেছেন গভীরভাবে। তাঁর ‘রঙ্গে ভরা বঙ্গ উৎসবপ্রবন্ধে সেই উৎসবগুলোর বৈশিষ্ট্য এবং তাৎপর্য তিনি তুলে ধরেছেন। তাঁর প্রবন্ধের বিষয়বস্তু হয়েছেন কখনো রবীন্দ্রনাথ, কখনো নজরুল। বাঙালি মানসে এই দুই কবির কতটা প্রভাব তা তিনি তুলে ধরেছেন ‘মাকে নিয়ে কবিতায় রবীন্দ্রনাথ’, ‘চেতনায় নজরুল’, ও ‘রবীন্দ্র ভাবনায় বাংলাদেশ’ প্রবন্ধে। ‘বেগম রোকেয়া: নারী জাগরণের অগ্রদূত’ প্রবন্ধে নারীদের দৃপ্ত পদক্ষেপে উঠে দাঁড়ানোর কথা বলেছেন। ‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম ও প্রাসঙ্গিকতা’ প্রবন্ধে তিনি বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতি, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব অনুসারে সিলেবাস প্রবর্তন, বর্তমান প্রজন্মের চারিত্রিক অধঃপতন, শিক্ষাবোর্ড ঘেরাও প্রভৃতি বিষয় চমৎকার যুক্তিনিষ্ঠ ভাষায় তুলে ধরেছেন। এইভাবে তিনি তাঁর চারপাশের সমাজকেই তাঁর প্রবন্ধগুলোতে উপস্থাপন করেছেন। আমরা প্রাবন্ধিকের নিয়মিত প্রবন্ধচর্চার অপেক্ষায় রইলাম। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে ‘শৈলী প্রকাশন। মূল্য ৩০০ টাকা। প্রচ্ছদ করেছেন আজিজ রাহমান।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক; অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী কলেজ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশোনো মেয়ে
পরবর্তী নিবন্ধঅধ্যাপক আসহাব উদ্দিন আহমদ স্মরণে