চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে জালিয়াতি করে ১০ বিষয়ে ফেল করা এক শিক্ষার্থীর নম্বর বাড়িয়ে পাস করানোর অভিযোগে ওই শিক্ষার্থীসহ শিক্ষা বোর্ডের কম্পিউটার সেলের তিন কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে এই জালিয়াতি করা হয়। পাঁচলাইশ মডেল থানায় দায়েরকৃত এজাহারে বলা হয়েছে, একজন শিক্ষার্থীর ১১টি বিষয়ের সৃজনশীল অংশের নম্বর বাড়িয়ে অনলাইনে প্রকাশিত ফলাফল পরিবর্তন করা হয়। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান এবং তদন্ত শেষে বোর্ড কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে বোর্ডের সচিব প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।
মামলার আসামিরা হলেন চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কম্পিউটার সেলের স্ক্যানিং অপারেটর ইমতিয়াজ আহমেদ চৌধুরী (২৮), স্ক্যানিং অপারেটর মো. রাশেদুল ইসলাম (৩০) এবং কম্পিউটার অপারেটর (সলভার) নূর হোসেন রায়হান (৩২)। এছাড়া ১৭ বছর বয়সি এক শিক্ষার্থীকে আসামি করা হয়েছে।
পাঁচলাইশ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মোজাম্মেল হক মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মামলাটি তদন্ত করছেন থানার এসআই মো. কাউছার হামিদ। তদন্তে শনাক্তযোগ্য অন্য ব্যক্তি ও অজ্ঞাতনামা সহযোগীদেরও এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৫, ৪৬৬, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ৪৭৭(ক) ধারা এবং পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০–এর ৫, ৬, ১২ ও ১৩ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করে ওই শিক্ষার্থী। পুনঃনিরীক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের উত্তরপত্রের নম্বরের সঙ্গে শিক্ষা বোর্ডের কম্পিউটার সেল থেকে পাওয়া প্রিন্ট আউটের নম্বরের ব্যাপক পার্থক্য দেখতে পান। বিষয়টি তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানান। পরে বোর্ডের প্রোগ্রামার যাচাই করে নম্বরের গরমিলের সত্যতা পান।
এ ঘটনায় বোর্ডের চেয়ারম্যানের নির্দেশে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি দুজন আইসিটি বিশেষজ্ঞের কারিগরি সহযোগিতায় মূল উত্তরপত্র, পরীক্ষকদের পাঠানো ম্যানুয়াল নম্বর ফর্দ, প্রকাশিত ফলাফল, এমসিকিউ ওএমআর এবং কম্পিউটার সেলের বিভিন্ন তথ্য–উপাত্ত পর্যালোচনা করে। ৯ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।
তদন্তে ওই শিক্ষার্থীর ১১টি বিষয়ের সৃজনশীল অংশের নম্বর বাড়ানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বাংলার প্রথমপত্রে ২৩ নম্বরকে ৩৩, দ্বিতীয়পত্রে ২৪ নম্বরকে ৬২, ইংরেজির প্রথমপত্রে ৩৩ নম্বরকে ৮৩ এবং দ্বিতীয়পত্রে ২০ নম্বরকে ৮২ করা হয়। গণিতে ৯ নম্বর বাড়িয়ে ৬৬, ইসলাম শিক্ষায় ৭ থেকে ৬৪, উচ্চতর গণিতে শূন্য থেকে ৪৬, পদার্থবিজ্ঞানে শূন্য থেকে ৪৫, রসায়নে ১ থেকে ৪৬, জীববিজ্ঞানে ১ থেকে ৪৬ এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়ে ৪ থেকে ৬৫ নম্বর করা হয়।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষার্থীর ইন্ধনে এবং কম্পিউটার সেলের সংশ্লিষ্ট তিন কর্মীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় পারস্পরিক যোগসাজশে এ জালিয়াতি করা হয়েছে। প্রকৃত নম্বরের পরিবর্তে বাড়ানো নম্বর বসিয়ে ফলাফলের হিসাব পরিবর্তন করা হয় এবং জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি ফলাফল অনলাইনে প্রকাশ করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
এজাহারে বলা হয়েছে, ফলাফলে অসঙ্গতি ধরা পড়ার পর শিক্ষার্থীর ফলাফল স্থগিত রাখা হয়। ১৫ অক্টোবর তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। ২৬ অক্টোবর শিক্ষার্থী নোটিশের জবাব দিলেও তা সন্তোষজনক না হওয়ায় বোর্ড কর্তৃপক্ষ মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, এজাহারে যে ধরনের নম্বর পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে, তাতে প্রোগ্রামার ছাড়া অন্য কারও এ কাজ করার সুযোগ থাকার কথা নয়। কারণ ওই প্রক্রিয়ায় রোল নম্বর থাকে না। নম্বর পরিবর্তন করতে হলে মূল ডিভাইসে প্রবেশ করতে হয়, যা কেবল প্রোগ্রামার ও সহকারী প্রোগ্রামার ব্যবহার করতে পারেন।
মামলার বাদী ও শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন সাংবাদিকদের বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মামলা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সে অনুযায়ী পাঁচলাইশ মডেল থানায় চারজনের বিরুদ্ধে এজাহার দেওয়া হয়েছে।
পাঁচলাইশ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হক বলেন, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড থেকে এসএসসি পরীক্ষার ফল জালিয়াতির অভিযোগে একটি মামলার এজাহার দেওয়া হয়েছে। বাদী বোর্ডের সচিব। তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।












