মানুষের শরীরের ভেতরের ছবি দেখতে আলট্রাসাউন্ডের ব্যবহার বহুদিনের। এবার উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গকে কাজে লাগিয়ে শরীর না কেটে ক্যান্সারের টিউমার ধ্বংসের নতুন পদ্ধতি নিয়ে এগোচ্ছেন গবেষকরা। এর পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগানের বায়োমেডিকেল প্রকৌশলী জেন জুয়ের কয়েক দশক আগের একটি আবিষ্কার। শূকরের হৃদপিণ্ডের টিস্যুতে পরীক্ষা চালাতে গিয়ে জু এমন একটি পদ্ধতি খুঁজে পান, যা পরে ‘হিস্টোট্রিপসি’ নামে পরিচিত হয়। খবর বিডিনিউজের।
এই শতকের প্রথম দশকে পিএইচডি শিক্ষার্থী হিসেবে জু অস্ত্রোপচার ছাড়াই রোগাক্রান্ত টিস্যু ধ্বংস ও সরিয়ে ফেলার উপায় খুঁজছিলেন। এজন্য তিনি উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ দিয়ে টিস্যু যান্ত্রিকভাবে ভেঙে ফেলার ধারণা নিয়ে শূকরের হৃদপিণ্ডে পরীক্ষা চালান। আলট্রাসাউন্ড সাধারণত মানুষের কান শুনতে পায় না। তবে জু এত শক্তিশালী অ্যামপ্লিফায়ার ব্যবহার করছিলেন যে, একই গবেষণাগারে থাকা অন্য গবেষকরা শব্দ নিয়ে অভিযোগ করতে শুরু করেন।
জু বলেন, আগের কোনো পদ্ধতিই কাজ করছিল না। তাই সহকর্মীদের বিরক্তি কমাতে আমি প্রতি সেকেন্ডে আলট্রাসাউন্ডের পালসের সংখ্যা বাড়িয়ে দেই। এতে প্রতিটি পালসের দৈর্ঘ্য মাইক্রোসেকেন্ডে নেমে আসে এবং শব্দ মানুষের শ্রবণসীমার বাইরে চলে যায়। এতে অপ্রত্যাশিত ফল পান তিনি। বেশি পালসের এই পদ্ধতি শুধু আশপাশের মানুষের বিরক্তি কমিয়ে দিয়েছিল তাই না, জীবন্ত টিস্যুর ওপরও আগের পদ্ধতির চেয়ে বেশি কার্যকর ছিল। আলট্রাসাউন্ড প্রয়োগের এক মিনিটের মধ্যে শূকরের হৃদপিণ্ডের টিস্যুতে একটি গর্ত তৈরি হতে দেখেন তিনি। জু বলেন, আমার মনে হয়েছিল, আমি বুঝি স্বপ্ন দেখছি।
ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগানের বায়োমেডিকেল প্রকৌশলের অধ্যাপক জুয়ের সেই ঘটনাচক্রে পাওয়া আবিষ্কারই হিস্টোট্রিপসির ভিত্তি। শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে অস্ত্রোপচার ছাড়াই ক্যান্সারের টিউমার ধ্বংস করার কয়েকটি পদ্ধতির মধ্যে এটি অন্যতম।
২০২৩ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন যকৃতের টিউমারের চিকিৎসায় হিস্টোট্রিপসির অনুমোদন দিয়েছে। পরের বছর জুয়ের প্রযুক্তিকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য গঠিত প্রতিষ্ঠান হিসোসনিকসের অর্থায়নে একটি ছোট গবেষণায় দেখা যায়, যকৃতের টিউমারের ৯৫ শতাংশের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি প্রযুক্তিগতভাবে সফল হয়েছে। পেটে ব্যথা থেকে শুরু করে শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণের মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে, তবে গবেষণা বলছে জটিলতা বিরল এবং পদ্ধতিটি সাধারণভাবে নিরাপদ।
চলতি বছরের জুনে ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্যও হিস্টোট্রিপসির অনুমোদন দিয়েছে। অপ্রাপ্য চিকিৎসা চাহিদার ক্ষেত্রে নতুন চিকিৎসা প্রযুক্তি ব্যবহারের একটি পরীক্ষামূলক কর্মসূচির আওতায় দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্যসেবায় এই চিকিৎসা চালু হয়েছে।
স্পেনের রামন ই কাখাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ রিসার্চের ক্যান্সার গবেষক জুলি আর্ল বলেন, মানুষ সাধারণত আলট্রাসাউন্ডকে শরীরের ভেতরের ছবি তৈরির প্রযুক্তি হিসেবে দেখে। তবে গবেষণার পরিধি এখন আরো বড় হচ্ছে। তার ভাষায়, আলট্রাসাউন্ড দিয়ে টিউমার ধ্বংস করা, শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়া ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ করা এবং অন্য ক্যান্সার চিকিৎসার কার্যকারিতা বাড়ানোও সম্ভব হতে পারে এবং সেটি অস্ত্রোপচার ছাড়াই।
কীভাবে কাজ করে আলট্রাসাউন্ড : গর্ভাবস্থায় শিশুর ছবি দেখতে যে আলট্রাসাউন্ড ব্যবহার করা হয়, তার ক্ষেত্রে একটি হাতে ধরা যন্ত্র শরীরে উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ পাঠায়। শরীরের ভেতরের বিভিন্ন টিস্যুতে ধাক্কা খেয়ে সেই তরঙ্গ ফিরে আসে। যন্ত্রের সেন্সর সেই ফিরে আসা তরঙ্গ ধরে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপ দেয়। এরপর সেই সংকেত থেকে শরীরের ভেতরের ছবি তৈরি হয়।
ক্যান্সারের চিকিৎসায় সেই একই ধরনের শব্দতরঙ্গ একটি টিউমারের ছোট নির্দিষ্ট অংশে কেন্দ্রীভূত করা হয়। যকৃতের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে হিস্টোট্রিপসি যন্ত্র প্রায় দুই মিলিমিটার বাই চার মিলিমিটার আয়তনের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে আলট্রাসাউন্ডের শক্তি কেন্দ্রীভূত করে। জু এই জায়গাটিকে রং করার কলমের মাথার সঙ্গে তুলনা করেন। এরপর একটি রোবোটিক বাহু টিউমারের ওপর দিয়ে আলট্রাসাউন্ডের যন্ত্রটি পরিচালনা করে সঠিক জায়গায় তরঙ্গ পাঠায়।
দ্রুত ছোট ছোট পালস আকারে আলট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করা হয়। এসব পালস অতি ক্ষুদ্র মাইক্রোবাবল তৈরি করে। সেগুলো মাইক্রোসেকেন্ডের মধ্যে ফুলে ওঠে এবং আবার চুপসে যায়। এই কাজ বারবার করার ফলে টিউমারের টিস্যু ভেঙে যায়। পরে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সেই অবশিষ্ট অংশ পরিষ্কার করে ফেলে।
জু বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটি দ্রুত, বিষমুক্ত এবং শরীর না কেটে করা যায়। সাধারণত রোগী একই দিন বাড়ি ফিরতে পারেন। সঠিক সময় চিকিৎসার ধরন অনুযায়ী বদলায়, তবে হিসোসনিকসের তথ্য অনুযায়ী বেশির ভাগ চিকিৎসা এক থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়। অনেক ক্ষেত্রে একবারের চিকিৎসাতেই টিউমার ধ্বংস করা যায়। তবে একাধিক বা বড় টিউমার থাকলে একাধিকবার চিকিৎসা লাগতে পারে।
হিস্টোট্রিপসিকে এখনো সব ক্যান্সারের সমাধান হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। চিকিৎসার পর ক্যান্সার আবার ফিরে আসার বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি শক্ত তথ্য এখনো পর্যাপ্ত নয়। শরীরের ভেতরে টিউমার ভেঙে দিলে ক্যান্সারের কোষ অন্য জায়গায় ছড়িয়ে গিয়ে নতুন টিউমার তৈরি করতে পারে কি না, তা নিয়েও কিছু গবেষক উদ্বেগ জানিয়েছেন। এখন পর্যন্ত প্রাণীর ওপর গবেষণায় সেই আশঙ্কার প্রমাণ মেলেনি।
এছাড়া শরীরের সব জায়গায় হিস্টোট্রিপসি ব্যবহার করা সম্ভব নয়। হাড় আলট্রাসাউন্ডের পথ আটকে দিতে পারে। আবার ফুসফুসের মতো গ্যাসপূর্ণ অঙ্গে এই পদ্ধতি ব্যবহার করলে আশপাশের সুস্থ টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তারপরও কিডনি ও অগ্ন্যাশয়ের টিউমারের চিকিৎসায় হিস্টোট্রিপসির সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে।
শব্দতরঙ্গে টিউমার পুড়িয়ে ফেলা : ক্যান্সারের চিকিৎসায় আলট্রাসাউন্ডের ব্যবহার হিস্টোট্রিপসিতেই শেষ নয়। এর আগে থেকেই উচ্চমাত্রার কেন্দ্রীভূত আলট্রাসাউন্ড বা এইচআইএফইউ প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ভার্জিনিয়ার ফোকাসড আলট্রাসাউন্ড ক্যান্সার ইমিউনোথেরাপি সেন্টারের সহপরিচালক রিচার্ড প্রাইস বলেন, এই পদ্ধতিতে টিউমারের ওপর কেন্দ্রীভূত আলট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করে তাপ তৈরি করা হয়। সেই তাপে টিউমারের টিস্যু অনেকটা কুকড বা রান্না হয়ে যায়। তিনি বিষয়টি বোঝাতে আতশকাচের উদাহরণ দেন। তার ভাষায়, রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে শুকনো পাতার ওপর আতশকাচ ধরলে সেটিতে আগুন ধরতে পারে। এইচআইএফইউও অনেকটা একইভাবে শব্দের শক্তি ব্যবহার করে ক্যান্সারের টিস্যুতে তাপ তৈরি করে।
হিস্টোট্রিপসি ও এইচআইএফইউ সাধারণত রোগীকে সম্পূর্ণ অচেতন রেখে করা হয়, যাতে চিকিৎসার সময় তিনি নড়াচড়া না করেন এবং আশপাশের অঙ্গ বা টিস্যুতে অনিচ্ছাকৃত ক্ষতির ঝুঁকি কমে। তবে দুই পদ্ধতির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। এইচআইএফইউ তাপ তৈরি করে, কিন্তু হিস্টোট্রিপসি সেই তাপ তৈরি করে না। ফলে আশপাশের সুস্থ টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি কম হতে পারে।
এইচআইএফইউয়ের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। হাড় বা গ্যাস আলট্রাসাউন্ডের পথ আটকে দিতে পারে। শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়া প্রোস্টেট ক্যান্সারের ক্ষেত্রেও এটি সাধারণত উপযোগী নয়। তবে স্তন ক্যান্সারসহ আরও কিছু ক্যান্সারের চিকিৎসায় এর ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন দেশে গবেষণা চলছে।
রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেও সক্রিয় করার চেষ্টা : আলট্রাসাউন্ডের সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করার চিকিৎসা বা ইমিউনোথেরাপির সমন্বয় নিয়েও গবেষণা চলছে। কেন্দ্রীভূত আলট্রাসাউন্ড যখন টিউমারকে উত্তপ্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত করে, তখন টিউমারের টিস্যু রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কাছে আরো দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা। এতে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ক্যান্সার কোষকে সহজে শনাক্ত করে আক্রমণ করতে পারে।
প্রাইসের গবেষণা কেন্দ্র এই পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে। ভবিষ্যতের গবেষণায় তারা দেখতে চান, আলট্রাসাউন্ড ও ইমিউনোথেরাপির সমন্বয় উন্নত পর্যায়ের ক্যান্সারের বিরুদ্ধেও কাজ করতে পারে কি না। শরীরের বিভিন্ন অংশে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়লে চিকিৎসা অনেক কঠিন হয়ে যায়। তখন শুধু একটি টিউমার সরিয়ে ফেললেই সমস্যার সমাধান হয় না। গবেষকদের একটি বড় লক্ষ্য হলো, আলট্রাসাউন্ড দিয়ে একটি টিউমার ভেঙে সেটিকে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কাছে দৃশ্যমান করে তোলা, যাতে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা একই ধরনের ক্যান্সার কোষকে অন্য জায়গাতেও খুঁজে আক্রমণ করতে পারে।
প্রাইসের মতে, তাত্ত্বিকভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, যেখানে একটি টিউমারে চিকিৎসা করেই শরীরের অন্য ১০, ১৫ বা ২০টি টিউমারের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করা যাবে। তবে কোনো ধরনের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় এখনো এই ধারণা প্রমাণিত হয়নি।
আলট্রাসাউন্ড ও ইমিউনোথেরাপির সমন্বয় নিয়ে গবেষণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। রোগীর চিকিৎসায় এটি কখন, কীভাবে বা আদৌ কতটা পরিবর্তন আনতে পারবে, তা জানতে আরো অনেক গবেষণা প্রয়োজন। তারপরও চিকিৎসাবিজ্ঞানে আলট্রাসাউন্ডের ব্যবহার নতুন একটি সম্ভাবনার দরজা খুলছে। লক্ষ্য হলো অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি ও বিকিরণ চিকিৎসার মতো কার্যকর হলেও কঠিন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াযুক্ত পদ্ধতির বিকল্প তৈরি করা অথবা অন্তত সেগুলোর ক্ষতি কমিয়ে আনা।
জু বলেন, ক্যান্সার ভয়াবহ। আর যে বিষয়টি এটিকে আরো খারাপ করে তোলে, সেটি হলো ক্যান্সারের চিকিৎসা। তবে তিনি হিস্টোট্রিপসিকে ক্যান্সারের জাদুর চিকিৎসা হিসেবে দেখেন না। অন্য সব চিকিৎসার মতো এরও সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি রয়েছে। তবু বহু বছর আগে গবেষণাগারের সহকর্মীদের বিরক্তিকর শব্দ থেকে রেহাই দিতে গিয়ে যে আবিষ্কারের সূচনা হয়েছিল, সেটি ভবিষ্যতে রোগীদের অপ্রয়োজনীয় কষ্ট কমাতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন জু।












