তিন দিন ধরে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে চলমান যানজট দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোরটিকে কার্যত অচল করে দিয়েছে। ২৪৫ কিলোমিটারের ঢাকা–চট্টগ্রাম পথ পাড়ি দিতে সাধারণত ৫–৬ ঘণ্টা সময় লাগে। বর্তমানে ব্যক্তিগত গাড়িতে লাগছে ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা, দূরপাল্লার বাসে ১০–১২ ঘণ্টা। ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও কন্টেনার মুভারসহ ভারী পণ্যবাহী যানবাহনের ক্ষেত্রে সময় লাগছে আরো বেশি। এতে লাখো যাত্রীর সীমাহীন দুর্ভোগের পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর এবং বন্দরনির্ভর বেসরকারি আইসিডিগুলো থেকে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে আমদানি–রপ্তানি কার্যক্রম, শিল্পকারখানার কাঁচামাল সরবরাহ এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে। গত কয়েকদিন ধরে কুমিল্লার ক্যান্টনমেন্ট এলাকাকে কেন্দ্র করে উভয়মুখী প্রায় ১০ কিলোমিটার করে রাস্তার দুই পাশে ২০ কিলোমিটার এলাকায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। ঢাকামুখী লেনে পদুয়া বাজার বিশ্বরোড থেকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এবং চট্টগ্রামমুখী লেনে ক্যান্টনমেন্ট থেকে আলেখারচর বিশ্বরোড পর্যন্ত যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকছে। কখনো ধীরগতিতে কিছু পথ এগোচ্ছে, আবার উল্টো পথে বিশৃঙ্খলভাবে চলেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টানা বৃষ্টিতে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় মহাসড়কের কয়েকটি স্থানে গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর জরুরি মেরামত কাজ শুরু করে। ইট দিয়ে রাস্তার গর্তগুলো ভরানোর কাজ করছে সড়ক বিভাগ।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ব্যস্ততম এই মহাসড়কে পর্যাপ্ত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং বিকল্প পরিকল্পনা ছাড়া কাজ শুরু করায় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এর সঙ্গে অনেক চালকের উল্টো পথে চলার চেষ্টা, লেনের শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং ভারী যানবাহনের চাপ যানজটকে আরো ভয়াবহ করে তোলে। গতকাল যানজটের সময় বেশ কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্সও আটকে ছিল।
দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকলেও মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশ কিংবা পুলিশের অন্য কোনো ইউনিটের কার্যকর উপস্থিতি চোখে পড়েনি বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এই প্রতিবেদকও গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কুমিল্লা অংশের স্থবির যানজটে আটকে ছিলেন। ওই সময় কোথাও হাইওয়ে বা অন্য কোনো পুলিশ সদস্যকে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়নি। শুধুমাত্র ক্যান্টনমেন্টের সামনে সেনাবাহিনীর কয়েকজন সদস্যকে যান চলাচলের বিশৃঙ্খলা দূর করতে দেখা যায়।
হাইওয়ে পুলিশের একজন কর্মকর্তা গতকাল আজাদীকে জানান, রাস্তার পরিস্থিতি খুবই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সংস্কারের কোনো বিকল্প ছিল না। ছোট পরিসরে সংস্কার কাজ করা হয়েছে। জাস্ট ইট দিয়ে গর্ত ভরাট করে দেওয়া। এই কাজের সময় কিছুটা সমস্যা হয়েছিল। কাজটি হয়ে গেছে। রাস্তার গর্তগুলো ভরাট করে দেওয়ায় যান চলাচলে গতি আসবে।
চার লেনের ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে গতকাল শত শত গাড়িকে উল্টো পথে গিয়ে এলাকাটি পার হওয়ার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। এতে যানজটের তীব্রতা আরো বেড়েছে। সড়কের উপর বাজার বসায় পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে রাজধানী ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সংযোগের প্রধান সড়ক হওয়ায় এই মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও কন্টেনার মোভার চলাচল করে। বন্দরে খালাস হওয়া আমদানি পণ্য দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পৌঁছানো এবং রপ্তানি পণ্য বন্দরে আনার প্রধান মাধ্যমও এই মহাসড়ক। ফলে দীর্ঘ যানজটের কারণে বন্দরের ডেলিভারি কার্যক্রম, বেসরকারি আইসিডিতে কন্টেনার পরিবহন, শিল্পকারখানার কাঁচামাল সরবরাহ এবং রপ্তানি পণ্য সময়মতো পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ শৃক্সখলা ও লজিস্টিক ব্যয় আরো বেড়ে যাবে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা সাংবাদিকদের বলেন, বৃষ্টির কারণে মহাসড়কের কয়েকটি স্থানে খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। সেগুলো ছোট পরিসরে মেরামত করা হচ্ছে। তবে যানজট সৃষ্টি হওয়ার মতো বড় ধরনের সংস্কারকাজ চলছে না।
এদিকে ভোগান্তিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা। মো. আশরাফ নামে একজন যাত্রী বলেন, কয়েক মিনিটের পথ পাড়ি দিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে। এমন দুর্ভোগ সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক।
আরেক যাত্রী রাফসান আহমেদ বলেন, সংস্কার কাজ শুরুর আগে জনসাধারণকে আগাম জানানো উচিত ছিল। অনেক প্রবাসী, রোগী ও জরুরি কাজে যাওয়া মানুষ সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না।
দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে এমন পরিস্থিতিতে শুধু যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়েনি, একইসাথে জাতীয় অর্থনীতিতেও চাপ সৃষ্টি করছে। কোটি কোটি শ্রম ঘণ্টা নষ্ট ছাড়াও লাখ লাখ টাকার আামদানিকৃত জ্বালানি অহেতুক পুড়ে যাচ্ছে।
শ্যামলী পরিবহনের একজন কর্মকর্তা গতকাল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কোনো বাসই সিডিউল রক্ষা করতে পারছে না। সব এলোমেলো হয়ে গেছে। এতে যাত্রীদের মাঝে ক্ষোভ বাড়ছে।
একজন পরিবহন ব্যবসায়ী বলেন, কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতি এবং বিকল্প যান চলাচল পরিকল্পনা নিশ্চিত না করলে এমন পরিস্থিতি ভবিষ্যতেও সংকট তৈরি করবে।












