বর্জ্যকে বোঝা নয়, সম্পদে রূপান্তরের নতুন সম্ভাবনা উন্মোচিত হচ্ছে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। সেখানে প্লাস্টিক বর্জ্যকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ফেকাল স্লাজ প্রক্রিয়াজাত করে জৈব সার তৈরির উদ্যোগ দেখাচ্ছে–সুষ্ঠু পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য একই সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা, জ্বালানি উৎপাদন ও কৃষির জন্য মূল্যবান সম্পদে পরিণত হতে পারে। সমপ্রতি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপি উখিয়ার বিভিন্ন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য সম্পদ উৎপাদন প্রকল্প পরিদর্শন করে এই সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।
কক্সবাজারের উখিয়া–টেকনাফে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার দীর্ঘসময় অবস্থানের কারণে বর্জ্য এখন শুধু ক্যাম্পের অভ্যন্তরের সমস্যা নয়; এটি আশপাশের কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে। ২০২৬ সালের ইউনিসেফ–এর তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের ৩৩টি ক্যাম্পে প্রতিদিন প্রায় ১২০ টন কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। যথাযথভাবে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত না হলে পচনশীল বর্জ্য, প্লাস্টিক এবং পয়ঃবর্জ্য বৃষ্টির পানির সঙ্গে খাল, পুকুর ও নিচু জমিতে পৌঁছে পানি ও মাটির গুণমান নষ্ট করছে; বিশেষ করে ফেকাল দূষণ কৃষিজমির সেচের পানি ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। বিশ্বব্যাংকের নথিতে উখিয়া–টেকনাফে রোহিঙ্গা আগমনের পর কৃষিজমি ক্ষতি, সেচের পানির সংকট, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস এবং পানি ও মাটিতে দূষণের ঝুঁকি নথিভুক্ত হয়েছে; এমনকি অপরিশোধিত ফেকাল বর্জ্য মাটি ও পানি দূষিত করে কৃষি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অতিরিক্ত প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্য ড্রেনেজ ব্যবস্থা বন্ধ করে জলাবদ্ধতা বাড়াচ্ছে, আর জমে থাকা বর্জ্য মাছি–মশা ও অন্যান্য রোগবাহকের বিস্তার এবং দুর্গন্ধের কারণ হচ্ছে। ফলে এর প্রভাব শুধু রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সীমাবদ্ধ না থেকে স্থানীয় কৃষিজমি, জলাশয়, ভূগর্ভস্থ পানি, জীববৈচিত্র্য এবং উখিয়া–টেকনাফের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করছে। বর্জ্যকে দ্রুত অপসারণের পরিবর্তে উৎসস্থলে পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার, কম্পোস্ট উৎপাদন, নিরাপদ ফেকাল স্লাজ ব্যবস্থাপনা এবং অবশিষ্ট বর্জ্য থেকে শক্তি আহরণের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
এখানে প্লাস্টিক বর্জ্য বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহারযোগ্য অংশ পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা গেলে কাঁচামালের চাহিদা কমে এবং বর্জ্যের চাপও হ্রাস পায়। পুনর্ব্যবহার সম্ভব নয় এমন উচ্চ–তাপমূল্যযুক্ত অবশিষ্ট বর্জ্য উপযুক্ত নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তিতে শক্তি উৎপাদনে ব্যবহার করা যেতে পারে। বর্জ্যের গঠন, আর্দ্রতা, তাপমূল্য, নির্গমন নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তির পরিচালন ব্যয় আগে যাচাই করতে হবে। এ বিষয়ে এডিবির বর্জ্য থেকে শক্তি (ওয়াস্ট টু এনার্জি) নির্দেশিকাতেও প্রযুক্তি ও প্রকল্পের উপযোগিতা, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ফেকাল স্লাজ ব্যবস্থাপনা আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য মাটি, পানি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এডিবির কক্সবাজার প্রকল্পে ফেকাল স্লাজ ও পৃথকীকৃত কঠিন বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন ও পরিচালনার উদ্যোগ রয়েছে বলে জানা যায়। সূত্রমতে, এডিবি তাদের সহায়তায় ক্যাম্পে এমন প্রযুক্তিও চালু হয়েছে যা কঠিন বর্জ্য থেকে জৈব সার, শক্তি এবং পানযোগ্য পানি তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। কৃষির জন্য জৈব সার উৎপাদনের সম্ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ। উখিয়ার প্রেক্ষাপটে এর কৃষিগত গুরুত্ব রয়েছে। ক্যাম্প ও আশপাশের কৃষিজমিতে নিরাপদ ও মানসম্মত কম্পোস্ট ব্যবহার করা গেলে মাটির জৈব পদার্থ ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনায় সহায়তা মিলতে পারে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্য সবচেয়ে কার্যকর মডেল হতে পারে সমন্বিত সার্কুলার ইকোনমি বা বৃত্তাকার অর্থনীতিভিত্তিক ব্যবস্থা। ক্যাম্পের উৎসেই জৈব বর্জ্য, প্লাস্টিক, কাগজ, ধাতু ও অন্যান্য বর্জ্য আলাদা করা। সে সাথে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ বাজারজাত করা, জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট বা বায়োগ্যাস তৈরি, নিরাপদভাবে প্রক্রিয়াজাত ফেকাল স্লাজ থেকে সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং অবশিষ্ট উপযুক্ত বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদন–এভাবে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে একই বর্জ্য থেকে একাধিক মূল্য সৃষ্টি হবে এবং ল্যান্ডফিল বা অনিয়ন্ত্রিত ফেলার ওপর চাপ কমবে। এই ব্যবস্থায় স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গাদের প্রশিক্ষণভিত্তিক অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ বাছাই, কম্পোস্ট উৎপাদন, পরিবহন ও রক্ষণাবেক্ষণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। তবে অংশগ্রহণ অবশ্যই নিরাপত্তা, শ্রমমান ও মানবিক নীতিমালা অনুসরণ করে হতে হবে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রকল্পের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়িত্ব। দাতা সংস্থার অর্থায়নে স্থাপনা তৈরি করা গেলেও পরিচালন ব্যয়, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত না হলে প্রকল্প বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই প্রতিটি প্রকল্পের জন্য প্রতি টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয়, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, কার্বন ও দূষণ হ্রাসের সুফল, কম্পোস্ট বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্যের বাজারমূল্য এবং মোট জীবনচক্র ব্যয় হিসাব করা প্রয়োজন। এডিবির ২০২৬ সালের দূষণ মূল্যায়ন নির্দেশনাতেও বর্জ্য ও স্যানিটেশন প্রকল্পে দূষণ পরিমাপ এবং পরিবেশগত প্রভাবের পরিমাণগত মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অভিজ্ঞতা শুধু রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়িত ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার জন্যও একটি পরীক্ষাগার হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের জন্য যেসব পদক্ষেপ জরুরি হতে পারে তাহলো: প্রথমত, বর্জ্যের পরিমাণ ও গঠন নির্ণয় করে পৃথক সংগ্রহব্যবস্থা করা; দ্বিতীয়ত, প্রতিটি প্রযুক্তির ব্যয়–সুফল ও পরিবেশগত মূল্যায়ন করা; তৃতীয়ত, প্রকল্পের পরিচালনা নিশ্চিত করতে বাজেট, ব্যবহারকারী ফি এবং উপ–পণ্যের অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
অতএব, বর্জ্যকে সমস্যা হিসেবে দেখার পরিবর্তে সম্পদ হিসেবে ব্যবস্থাপনা করাই এখন সময়ের দাবি। তবে ‘বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ’কে একমাত্র সমাধান না ধরে প্রথমে বর্জ্য কমানো, পুনঃব্যবহার, পুনর্ব্যবহার এবং শেষে অবশিষ্ট বর্জ্য থেকে শক্তি আহরণ–এই ক্রম অনুসরণ করতে হবে। উখিয়ায় চলমান উদ্যোগগুলোর সফলতা নির্ভর করবে প্রযুক্তির চেয়ে বেশি দক্ষ ব্যবস্থাপনা, মান নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের ওপর। সঠিক পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিসহায়তা থাকলে ক্যাম্পের বর্জ্যই একদিন বিদ্যুৎ, সার, কর্মসংস্থান ও পরিবেশ সুরক্ষার নতুন সম্পদে পরিণত হতে পারে।
লেখক: কৃষি অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট।
সাবেক ন্যাশনাল কনসালটেন্ট, এফএও, জাতিসংঘ।













