চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বারান্দার মেঝেতে চলছে বেশিরভাগ ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা। এসব রোগীদের কারো মশারি নেই। এছাড়া রয়েছে স্যালাইন স্ট্যান্ডের স্বল্পতাও। অনেক রোগীকে বারান্দায় ওয়ার্ডের জানালায় ঝুলিয়ে স্যালাইন দিতে দেখা গেছে। এছাড়া নেই ফ্যানের ব্যবস্থা। ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস করছিল ডেঙ্গু রোগীরা। বেশ কয়েকজন রোগীর স্বজনকে হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতে দেখা যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডেঙ্গু রোগীদের সার্বক্ষণিক মশারি টানিয়ে চিকিৎসা দিতে হয়। যাতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে মশা কামড় দিতে না পারে। যদি আক্রান্ত ব্যক্তিকে মশা কামড় দেয় সেই মশা সুস্থ মানুষকে কামড় দেয়, তবে ডেঙ্গু ভাইরাস ওই সুস্থ মানুষকেও সংক্রমিত করে। কিন্তু বর্তমানে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসক থাকলেও স্থান সংকুলানের অভাবে রোগীদের অমানবিক কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে।
চমেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার কারণে গত জুলাইয়ে ১৬ নম্বর মেডিসিন ওয়ার্ডের মহিলা ব্লককে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে রূপান্তরিত করা হয়। তবে সেই ওয়ার্ডে শয্যা রয়েছে ৩২টি। বর্তমানে ডেঙ্গু প্রকোপ বাড়ার কারণে হাসপাতালেও বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ। ফলে নির্ধারিত শয্যার বাইরে রোগীদের বারান্দার মেঝেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। গতকাল দুপুরে হাসপাতালেও ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিল ৮০ জন। এরমধ্যে ৪৮ জনই ছিল বারান্দার মেঝেতে।
ফটিকছড়ি থেকে আসা রোগী নুর মোহাম্মদ বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর চমেক হাসপাতালে এসেছি। কিন্তু এখানে বেড খালি না থাকায় বারান্দায় চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। খুব কষ্টে আছি।
একই কথা বলছেন পটিয়ার বাসিন্দা আমির হোসেনও। তিনি বলেন, আমার বাবার ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ায় তাকে হাসপাতালে এনেছি। কিন্তু এখানে ওনি আরো বেশি অসুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। আমরা গরীব মানুষ কোথায় যাবো।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন দৈনিক আজাদীকে বলেন, এই মুহূর্তে চমেক হাসপাতালের কোনো ওয়ার্ডে স্থান খালি নাই। সব ওয়ার্ডেই ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী। এক্ষেত্রে নগরীর সিআরবি এলাকার রেলওয়ে হাসপাতালকে যদি ডেডিকেটেড ডেঙ্গুর জন্য করে দেয়া হয় তবে রোগীরা ভালো সেবা পাবে।
তবে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি দৈনিক আজাদীকে বলেন, রেলওয়ে হাসপাতাল আসলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়। এছাড়া এই হাসপাতালে বাজেটও নাই। তারপরেও আমরা মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে চিঠি লিখেছি। আশা করি কয়েকদিনের মধ্যে একটা সিদ্ধান্ত আসবে। অপরদিকে বর্তমানে ডেঙ্গুর ব্যবস্থাপনা বিষয়ে জানতে চাইলে চমেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. এ এস এম জাহেদ দৈনিক আজাদীকে বলেন, ডেঙ্গু হলে আসলে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নাই। ডেঙ্গু জ্বরের ক্ষেত্রে যাদের দীর্ঘমেয়াদি রোগ বিশেষ করে হার্টের রোগ, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ এবং গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। অনেকের দেরিতে উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে এখন জ্বর হলে সাধারণ ভাইরাস জ্বর মনে করে বসে থাকলে হবে না। জ্বর হলে ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে হবে। ডেঙ্গু হলে পূর্ণ বিশ্রাম নিতে হবে। এ সময় ভ্রমণ করা যাবে না। বেশি করে তরল জাতীয় খাবার খাবে। ফলের রস, ডাবের পানি, লেবুর পানি, খাবার স্যালাইন ও সাধারণ পানি খাবে। কোনো ধরণের শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে হাসপাতালে যেতে হবে।
এদিকে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর গতকাল পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ৫ হাজার ১ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ২১ জনের। গতকাল সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ৮৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত চিকিৎসা নিচ্ছেন। এরমধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৩০ জন, ফৌজদারহাট বিআইটিআইডি হাসপাতালে ১৪ জন, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ৮ জন, চট্টগ্রাম সিএমএইচ হাসপাতালে ৩ জন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙে ২ জন এবং বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৩০ জন।
চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু রোগীর মূল চিকিৎসা হচ্ছে ফ্লুইড ম্যানেজম্যান্ট। অনেক রোগী এনএসওয়ান রিপোর্ট হওয়ার সাথে সাথে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যাচ্ছেন। এটির আসলে কোনো দরকার নাই। ডেঙ্গুর প্ল্যাটিলেট কাউন্ট ১০ হাজারের নিচে নেমে গেলে তখন ইন্টারনাল ব্লিডিং শুরু হয়। তখন ক্রিটিক্যাল কেয়ার ম্যানেজম্যান্টের প্রয়োজন পড়ে। আবার প্ল্যাটিলেট কমা শুরু হয় জ্বর কমে যাওয়ার পর পর। তখন শারীরিক কিছু অসুবিধা দেখা দেয়। ওই সময় হাসপাতালে ভর্তি হতে পারে। সাধারণ মানুষের মধ্যে প্ল্যাটিলেট নিয়ে আতঙ্ক লক্ষ্য করা যাচ্ছে, আসলে প্ল্যাটিলেট যখন বাড়া শুরু হয় তখন দ্রুতই বাড়ে। কাজেই ডেঙ্গু জ্বর হলেই আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান দৈনিক আজাদীকে বলেন, এখন প্রায় প্রতিদিন থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি হওয়ার কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে যাচ্ছে। ফলে এসব পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার হচ্ছে। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। কোন স্থানে যাতে তিনদিনের বেশি পানি না জমে সেই বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনও মশক নিধনে তাদের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
উল্লেখ্য, গত বছর ২০২৫ সালে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৮৬৪ জন এবং মারা যান ২৭ জন। এছাড়া ২০২৪ সালে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৩২৩ জন এবং মারা যান ৪৫ জন। ২০২৩ সালে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১৪ হাজার ৮৭ জন। এরমধ্যে মারা যান ১০৭ জন এবং ২০২২ সালে মোট আক্রান্ত ৫ হাজার ৪৪৫ জনের মধ্যে মারা যান ৪১ জন।










