রায় কার্যকরের সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে

| শুক্রবার , ১৯ জুন, ২০২৬ at ৮:৩৬ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের মামলায় আসামি মনির হোসেনকে (৩০) যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি তাঁকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। গত বুধবার দুপুরে শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল (মহানগর) চট্টগ্রামের বিচারক সৈয়দা হাফসা ঝুমা এ রায় দেন। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়, বিচার শুরু হওয়ার আট কার্যদিবসের মধ্যে ও মামলার ২৬ দিনের মাথায় এ রায় ঘোষণা করলেন আদালত। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, ‘শিশুধর্ষণ মানবতার বিরুদ্ধে এক জঘন্যতম অপরাধ। এ ধরনের অপরাধ শুধু শারীরিক ক্ষতি করে না, বরং তার মানসিক বিকাশ, আত্মবিশ্বাস ও স্বাভাবিক জীবনযাপনকেও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করে। শিশু সমাজের সবচেয়ে অসহায় ও সুরক্ষার আবশ্যকীয় অনুষঙ্গ। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজের যৌথ দায়িত্ব। কোনো ব্যক্তি যখন একটি শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন চালায়, তখন সে শুধু একটি শিশুর অধিকার লঙ্ঘন করে না, বরং সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেও আঘাত করে।’

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২১ মে বাকলিয়া এলাকার চেয়ারম্যানঘাটা থেকে ধর্ষণের অভিযোগে মনির হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁকে থানায় নেওয়ার সময় বিক্ষুব্ধ লোকজন অভিযুক্তকে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানান। একপর্যায়ে শত শত মানুষ পুলিশের গাড়ি ঘিরে ফেলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদস্যরা পিছু হঠে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে রাত আটটার দিকে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করলে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। রাত সোয়া ১০টার দিকে এলাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে পুলিশ কৌশলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে একটি ভবন থেকে বের করে নিজেদের হেফাজতে নেয়। এরপরও উত্তেজিত লোকজন সড়কে অবস্থান নিয়ে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখেন।

পুলিশ জানায়, ২২ মে শিশুটির বাবা বাদী হয়ে অভিযুক্ত মনির হোসেনকে আসামি করে বাকলিয়া থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। রায় ঘোষণার পর শিশুটির মা বলেন, আদালতের রায়ে তাঁরা ন্যায়বিচার পেয়েছেন। তবে ফাঁসি হলে আরও খুশি হতেন।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বলেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ৩৯৯ শিশু। ছয়টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ৪০৮টি সংবাদ বিশ্লেষণ করে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। অপরদিকে একই সময়ে সারা দেশে ৪৯৬টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করে বাংলাদেশের শিশু অধিকার ফোরাম। ১৫টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সমপ্রতি ‘শিশু অধিকার লঙ্ঘন’ শীর্ষক এ উপাত্ত প্রকাশ করে সংস্থাটি।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, মনস্তাত্ত্বিকভাবে মানুষ ভোগবাদী। কিন্তু দেশে নৈতিকতার অধঃপতনের পাশাপাশি আইনেরও কোনো প্রয়োগ নেই। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে দিয়েছে। ধর্ষণ রোধে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাঁরা বলেন, গত এক বছরের চিত্র লক্ষ করলে দেখা যায়, নির্বাচনের সময়টাতেই শিশু ধর্ষণ তুলনামূলক কম ছিল। এ থেকে অনুমান করা যায়, রাজনৈতিক কর্মীরা ব্যস্ত থাকায় তখন এ ধরনের অপরাধ কম সংঘটিত হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, এতো ঘটনা ঘটছে কিন্তু রাষ্ট্র দোষীদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার করে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারছে না। রাষ্ট্রকে শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের বিচার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মাত্র ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি সুনিশ্চিত করতে হবে। সমাজের এই অবক্ষয় আর দুষ্ট ক্ষত নির্মূলে এবং মূলোৎপাটনে এখনই মানবিকতা নৈতিকতা আইনের শাসন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করা খুবই জরুরি। বিগত দুই দশকে দেশের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিতে ব্যাপক ভিত্তিতে পরিবর্তন হয়েছে। এমন বাস্তবতায় শুধু আইন করে ধর্ষণের মতো অপরাধ দূর করা যাবে না। এজন্য প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে নৈতিকতার ও মূল্যবোধ চর্চা আরো জোরদার করা প্রয়োজন। আগে শিশুরা শুধু ধর্ষণের শিকার হতো। এখন ধর্ষণের পর শিশুকে মেরে ফেলা হচ্ছে। এটা হিংস্রতা ও বর্বরতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত বহন করে। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শিশুদের রক্ষায় প্রচলিত আইনে সংশোধন আনতে হবে। যে ধরনের শিশু নির্যাতন হোক না কেন, এ ক্ষেত্রে রায় কার্যকরের সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে। বাকলিয়ায় চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের মামলার রায় যেভাবে দ্রুত হলো, সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হবে। তা হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে