
ফরাসী সম্রাট নেপোলিয়ন তার এক বিখ্যাত উক্তিতে উল্লেখ করেছিলেন Four hostile newspapers are more be feared than a thousand bayonets. অর্থাৎ চারটি স্বাধীন সংবাদ পত্র হাজারো উন্মুক্ত তরবারীর চেয়েও বিপজ্জনক। এ বিপজ্জনক অবস্থা হল অন্যায়ের বিরুদ্ধে অনাচারের বিরুদ্ধে, দুঃশাসন এর বিরুদ্ধে। হাজারো উন্মুক্ত তরবারী যা করতে পারবে না তার চেয়েও বেশী কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে সংবাদপত্র। এ বিষয়টি অন্যভাবে উল্লেখ করেছেন আমেরিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং তৃতীয় প্রেসিডেন্ট হিসাবে ১৮০১–১৮০৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকারী থমাস জেফারসন, তার অভিমতে তিনি বলেছেন, Were it left to me to decide if we should have a government without newspapers, or newspapers without a government. I should not hesitate a moment to prefer the latter. অর্থাৎ আমাকে যদি বলা হয় সংবাদপত্র ছাড়া একটি সরকার এবং সরকার ছাড়া সংবাত্র বিদ্যমান একটি রাষ্ট্র একটিকে বেছে নিতে, তবে আমি নির্দ্বিধায় দ্বিতীয়টিকে বেছে নেব। থমাস জেফারসন’ এই সংবাদপত্রবিহীন সরকার, এবং সরকার ছাড়া সংবাদপত্র বিদ্যমান একটি রাষ্ট্রের দ্বিতীয়টি বেছে নেওয়ার পিছনে অকাট্যযুক্তি হল সংবাদপত্র বৈপরীত্য, বৈষম্য, বিচ্যুতি সব কিছুকে সমাজের সামনে তুলে ধরে যেটি সরকার করে না। রাষ্ট্রের তার নাগরিকের প্রতি দায়বদ্ধতা বা রাষ্ট্রের স্তম্ভসমূহ যেমন বিচার, আইন, প্রশাসন,ইত্যাদি তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথার্থভাবে পালন করছে কিনা, পালনে অক্ষম বা ক্রটি বিচ্যুতির শিকার কিনা এসব একটি সংবাদ পত্র নির্দিষ্ট করে তুলে ধরে তার প্রতিকার চাইতে পারে বা প্রতিকারত্বে জনমত গঠন করতে পারে।
আমাদের দেশের বিদ্যমান সংবাদপত্র সমূহের রাষ্ট্র এবং সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকার কথা বিবেচনায় নিলে আমাদেরকে হতাশায় যেমন ডুবতে হয় তেমনি সময়ের পালাবদলে তাদের রং বদলের আতিশয্য দেখে লজ্জিতও হতে হয়। এবিষয়ে ক্ষমতাসীনদের ভূমিকা যেমন উলংগ তেমনি সংবাদপত্র মালিকদের উপায়ন্তরহীন ভুমিকাও অনেকাংশে দায়ী। আমি সংবাদপত্র মালিকদের উপায়ন্তরহীন ভূমিকার কথা উল্লেখ করছি এ জন্য যে আমাদের দেশের সংবাদপত্রসমূহ পাঠক নির্ভর হয়ে চলতে পারে না। এর কারণ নগণ্য সংখ্যক পাঠক অন্যদিকে পত্রিকায় যে সব ব্যক্তি বা কর্পোরেট বিজ্ঞাপন দিয়ে পত্রিকাকে টিকিয়ে রাখে তারা কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতা মুখাপেক্ষী ফলে বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে সরকারি বিজ্ঞাপনের বাইরে গিয়ে বেসরকারি খাতেও ক্ষমতাসীনদের হস্তক্ষেপের হাত প্রলম্বিত হয়। এটি বুঝে নিয়ে সংবাদপত্রসমূহ তথা মালিকরা প্রায়ই তাদের স্বাধীন সত্তা বিলিয়ে দেয়। ফলশ্রুতিতে জনগণ সংবাদপত্রের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সত্য জানতে অনেক সময় বঞ্চিত হয়। এটি রাষ্ট্র এবং সমাজ কারো জন্যই শুভ এবং মঙ্গলজনক নয়।
সংবাদপত্রের স্বাধীন সত্তার উপর হস্তক্ষেপ একটি জাতির জন্য ক্ষেত্রবিশেষে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। যেমন নেতৃত্বের দুর্বলতা বা অদক্ষতা বা বিচ্যুতি সংবাদপত্র যদি গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে তুলে ধরতে পারে তবে সেখানে ঐ নেতৃত্ব তার দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে যেমন সুযোগ পাবে তেমনি রাষ্ট্র তথা জাতিও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবে।
রাষ্ট্র তথা সরকারের কর্ণধারদের অনেক ভুলভ্রান্তি অনেক সময় অনিচ্ছাকৃত বা অজান্তে ঘটতে পারে এরকম ক্ষেত্রে একটি সংবাদপত্র যদি নির্মোহভাবে সে ভুল ভ্রান্তি সংশ্লিষ্টদের মুখোমুখি তুলে ধরতে পারে তবে সেখানেই একটি সংবাদপত্রের সত্যিকার গঠনমূলক ভূমিকা পালন। তবে এখানে বিশেষভাবে যে বিষয়টি উল্লেখ্য তা হল আমাদের সাংবাদিকদের বিশ্লেষণধর্মী সেই জ্ঞান এবং সক্ষমতার বিষয়টি সামনে আসে। একটি সংবাদপত্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সংবাদকর্মীরা। এই কর্মীরা যতবেশি মননে মেধায়, দায়িত্ববোধ আর নির্ভীকতায় ঋদ্ধ হবেন সেই সংবাদপত্র ততবেশি একটি রাষ্ট্র এবং সমাজ বিনির্মাণে সক্ষম ভূমিকা পালনে সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারবে এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়।
সংবাদপত্রকে একটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। কারণ এটি রাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গের ভূমিকা জনগণের সামনে তুলে ধরে, ত্রুটি বিচ্যুতিকে প্রশ্ন করে এবং এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাঠামোসমূহকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করে, ক্ষেত্রবিশেষে বাধ্য করে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে আমাদের সংবাদপত্রের নিকট অতীতের ভূমিকা রাষ্ট্র এবং জাতি গঠনে মোটেও উল্লেখযোগ্য নয়। যেমন উদাহরণ হিসাবে বলা যায় আমাদের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান যখন ছাত্রদের রাজনৈতিক দল গঠনে ইন্ধন দিচ্ছিলেন তখন সংবাদপত্রসমূহ দৃঢ়তার সাথে এর বিরুদ্ধে দাঁড়ায়নি, জোরালোভাবে তুলে ধরেনি ছাত্রদের প্রথম কাজ লেখাপড়া, নিজেকে ভবিষ্যতে সকল ক্ষেত্রে যোগ্য নেতৃত্বের জন্য তৈরী করা। এক্ষেত্রে আমাদের সংবাদপত্রের ভূমিকা ছিল মিনমিনে, অনেকটা ধরি মাছ না ছুঁই পানি। এর কুফল এ সমাজ এখনও ভোগ করছে। এ কুফলের নামসমূহ শিক্ষাঙ্গনে অরাজকতা, মবোক্রেসি, চাঁদাবাজি, সত্যিকারের শিক্ষা বঞ্চিত এক র্স্বনাশা ছাত্র সমাজ। এ প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ দিচ্ছি– সদ্য এম বি এ করা এক লোক– তিনি আমার সামনে। একটি চাকরির মোখিক পরীক্ষা দিতে বসেছেন, আমি উনাকে “তিরিশের মহামন্দা” তথা “গ্রেট ডিপ্রেশন অব নাইটিন র্থাটি” এটি কিভাবে হয়েছিল এবং এটির উত্তরণে কোন্ অর্থনীতিবিদের অবদান ছিল, বলতে বললাম। তিনি বেশ কিছু সময় নিয়ে উত্তর দেন “হিটলার”। আমি উনাকে আর দ্বিতীয় প্রশ্ন করিনি, তবে আমাদের শিক্ষার নেমে যাওয়া বিষণ্ন বিবরে আমি অনেকক্ষণ ডুবে থাকি। তখন আমার কানে উপহাসের হাসি – বিখ্যাত ইংরেজ অর্থনীতিবিদ লড ময়নিয়ার্র্ড কিনস’এর, যার অর্থনীতির সূত্র ধরে পূঁিজবাদী বিশ্ব তিরিশের মহামন্দা থেকে পরিত্রাণ পায়, যিনি আধুনিক “ম্যাক্রো ইকনমিক্স এর জনক, তার সৃষ্ট “কিনসিয়ান ইকনমিক্স যা এখনও পূঁিজবাদী বিশ্বকে পথ দেখিয়ে যাচ্ছে, যার অর্থনীতির মূল সূত্র চাহিদা, সরবরাহ, উৎপাদন এবং কর্মসৃষ্টিতে সরকারকে অতিরিক্ত ব্যয়ের মাধ্যমে অর্থনীতিতে হস্তক্ষেপ করার পরামর্শ। যা হোক কিনসের হাসি কানে এখনও বাজে তবে হিটলার সাহেব কি করেছেন, জানিনা।
ফিরে আসি আরো কিছু অসংগতিতে যেখানে আমাদের সংবাদপত্র সমূহ যথাযথ আলোকপাতে ব্যর্থ অথবা অক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। অপরিকল্পিত শিক্ষা। আমাদের শহরগুলির আনাচে কানাচে, অলিতে গলিতে গড়ে উঠেছে বিশ্ব–বিদ্যালয়ের নামে শিক্ষা ব্যবসা।
আমাদের নিম্ন বিত্ত, মধ্যবিত্ত বাবা মা’রা জানেনা তার সন্তান কি নিয়ে পড়া লেখা করছে, যে বিষয়ে তার সন্তান পড়ালেখা করতে ভর্তি হয়েছে তার কোন প্রয়োজন বা কর্মসংস্থান এদেশে আছে কি না। তারা খেয়ে না খেয়ে, অনেক ক্ষেত্রে জীবনের সহায় সম্বল বিক্রি করে আদরের সন্তানের শিক্ষা ব্যয় বহন করে চলে। পড়া লেখা শেষ করে কর্মসংস্থানে গিয়ে ডিগ্রীধারী যখন দেখে তার বিষয়ের কোন কর্মসংস্থান কোথাও নাই তখন কর্মহীনতার হতাশা যেমন এই ডিগ্রীধারীকে পেয়ে বসে তেমনি আমাদের নিম্ন বিত্ত, মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা মা’দের আশাহীনতার এক চরম বির্পযয়ের মুখে পড়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়া উপায় থাকে না। এমতাবস্থায় কর্মক্ষম এক বিশাল যুবক শ্রেণির কর্মক্ষমতা কাজে লাগাতে জাতি হিসাবে আমরা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলেছি।
না শিক্ষা মন্ত্রণালয় না আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই অপরিকল্পিত, অনিষ্ট অকর্মণ্য, অকেজো শিক্ষা উৎপাদন বিবেচনা করছে কি কেউ? সংবাদপত্র রাষ্ট্রের চর্তুথ স্তম্ভ হিসাবে এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের ঘুম ভাঙাতে পারে।
আমাদের সাংবাদিকদের প্রসঙ্গে! ফরাসী একটি প্রচলিত প্রবাদ এখানে উল্লেখ করতে চাই। প্রবাদটি হল “তোমার কাপড় যততই সস্তা হউক না কেন, তুমি একজন ভাল টেইলারের কাছে যাও”। এর মর্মাথ সহজ সরল, ভালো টেইলারের কাছে গেলে সস্তা কাপড় দিয়েও ভালো জামা তৈরী করা সম্ভব, আর কাপড় যতই দামি হোক না কেন একজন খারাপ টেইলারের কাছে গেলে সে তা নষ্ট করবে। এই প্রবাদটিকে একটু ঘুরিয়ে বললে এভাবে বলা যায় আমাদের সংবাদপত্র যত আধুনিক প্রিন্টিং মেশিন সমৃদ্ধ হোক না কেন তার পিছনে যদি ভালো সৃষ্টিশীল, নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিকরা কাজ না করেন, সেখানে ভালো কিছু আশা করা বাতুলতা। এক্ষেত্রে সাংবাদিকদের উচ্চতর পেশাগত জ্ঞান অপরিহার্য। এটি তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। যোশেফ পুলিটজার, আমেরিকান বিখ্যাত প্রকাশক, সাংবাদিক যিনি আমেরিকান সংবাদপত্র জগৎকে আধুনিকতার ছোঁয়ায় উদ্ভাসিত করেছেন, তাঁর এই বাক্যটি সাংবাদিকতা এবং সংবাদপত্রের জন্য বেদবাক্য হওয়া উচিত -News papers should have no friends সংবাদপত্রের বন্ধু থাকতে নেই। এ কথার মর্মার্থ হল, সংবাদপত্র হবে নির্মোহ নিরপেক্ষ। সংবাদপত্র যে বার্তা বহন করবে তা হবে অনিস্কম্পহাতে রচিত নিগূঢ় সত্যের উপর রচিত।
দুর্ভাগ্য আমাদের সংবাদ মাধ্যম প্রিন্টিং ইলেট্রনিক উভয় ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক পালাবদলের সাথে রাতারাতি ভোলপাল্টানোর দোষে দূষিত। এটির কারণ অবশ্য এ লেখার শুরুতেই কিছুটা উল্লেখ করেছি। ক্ষমতাসীনদের দাপট যতদিন সংবাদপত্রের ওপর থেকে বিদূরিত না হবে ততদিন সংবাদপত্র ক্ষমতাসীনদের নানা ধরনের কার্যক্রম যেমন “উদ্বোধন” “ভ্রমণ” “বক্তৃতা” “বিবৃতি” ছাপানোতে সীমাবদ্ধ থাকবে। এমনকি আমাদের সংবাদপত্রসমূহ নেপোলিয়ন বর্ণিত সংবাদপত্র হাজারো উন্মুক্ত তরবারীর চেয়েও বিপজ্জনক হওয়া দূরের কথা, তরবারিও হতে পারবে না।
আমার প্রিয় কবি রুডিয়ার্ড কিপ্লং এর এই ছোট্ট উদ্বৃতি দিয়ে শেষ করছি –
Of all the lairs in the world the worst are our own fears. “পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যুক আমাদের মাঝে বাস করা ভয়”। এ ভয় থেকে আমাদের সংবাদপত্র–সংবাদপত্রের মালিক– সাংবাদিক সবাই মুক্ত থাকুন।
লেখক : প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।











