বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারীতে বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকার পার্শ্ববর্তী কক্সবাজারের রামুর রাবার বাগানে চোরের তীব্র উপদ্রব দেখা দিয়েছে। চোরের দল রাবার চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। রাত নামলেই বাগানে ঢুকে রাবার চুরি এখন নিত্যদিনের ঘটনা। এতে গভীর সংকটে পড়েছে এই সম্ভাবনাময়ী শিল্পটি। বাগান মালিক ও খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ চক্র বিভিন্ন বাগান থেকে রাবার চুরি করে স্থানীয় ও বাইরের কিছু ক্রেতার কাছে বিক্রি করছে। চোরাই রাবারের বাজার থাকায় চক্রটি ব্যাপকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এতে বৈধভাবে ব্যবসা করা মালিকেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। একই সঙ্গে হুমকিতে পড়ছে বাগানের শ্রমিক পরিবহনকর্মী প্রক্রিয়াজাতকারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কর্মসংস্থানও।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাইশারীতে ৭৬৫টি ও রামুসহ সহস্রাধিক রাবারবাগান রয়েছে। এসব বাগানের আওতায় প্রায় ২০ হাজার শতক জমি রয়েছে এবং শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৬০ হাজার শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যুক্ত। প্রতিবছর এ খাত থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হয় বলেও দাবি তাঁদের। তবে চুরি, চোরাই রাবারের কেনাবেচা এবং প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতির অভিযোগে শিল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এরই মধ্যে গাজী গ্রুপ ও মেসার্স বায়েজিদ রাবার প্রসেসিং প্লান্ট বন্ধ হয়ে গেছে।
বাইশারীর রাবার বাগান মালিক আলী মো. মিনহাজ জানান, একটি বাগান থেকে রাবার চুরি হলে শুধু মালিকই ক্ষতিগ্রস্ত হন না। এর সঙ্গে শ্রমিক পরিবহনকর্মী স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রক্রিয়াজাতকারী ও বিপণনকারীরাও ক্ষতির মুখে পড়েন। চুরি অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব পুরো স্থানীয় অর্থনীতিতে পড়বে।
বাইশারী রাবার মালিক সমিতির সভাপতি মুহাম্মদ রফিক বশরী বললেন, বাইশারীর বিভিন্ন বাগান থেকে নিয়মিত রাবার চুরি হচ্ছে। চোরাই রাবার একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করা হচ্ছে। এতে বাগান মালিকেরা বড় ধরনের লোকসানে পড়ছেন।
তথ্য অনুযায়ী, বাইশারীতে ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বড় আকারের রাবারবাগান রয়েছে। এর মধ্যে পিএসপি গ্রুপ, প্রফেসর গ্রুপ, গাজী গ্রুপ, ফোর এইচ গ্রুপ, ডাক্তার গো হাউস, ডাক্তার গালিফ ও মেজর জেনারেল রাবারের বাগান রয়েছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
মেসার্স বায়েজিদ রাবার প্রসেসিং প্লান্টের মালিক আবদুর রহিম মনু বলেছেন, রাবার শিল্পের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে বহু শ্রমিক ও ব্যবসায়ী জড়িত। চুরি অব্যাহত থাকলে বাগান মালিকদের পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও সংকুচিত হবে। তার ভাষ্য, তাঁর কারখানাসহ দুটি কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্টরা উদ্বিগ্ন। তাঁর কারখানা থেকে ট্রাকে করে রাবার নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় মামলা করা হলেও এখনো কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। এতে চোরচক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে তাঁর অভিযোগ।
বাগান মালিক মো. কামরুল বলেন, স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি না থাকায় চোরচক্র সুযোগ পাচ্ছে। তাঁর দাবি, কোনো ব্যক্তি অভিযোগ করার পরই অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক উদ্যোগ দেখা যায়; নিয়মিত নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা থাকলে চুরির আগেই তা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বাইশারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আলম বলেন, বিভিন্ন রাবারবাগান থেকে বহিরাগতরা রাবার চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা চললেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। চুরির ঘটনায় কয়েকটি মামলাও হয়েছে। রাবারশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রশাসনের আরও কঠোর ভূমিকা প্রয়োজন। বাগান মালিকদের অভিযোগের বড় অংশজুড়ে রয়েছে চোরাই রাবারের ক্রেতা ও বিক্রেতাদের ভূমিকা। তাঁদের মতে, চুরি করা রাবারের বাজার না থাকলে চোরচক্র এতটা সক্রিয় হতে পারত না।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, বাইশারী ও রামুতে কিছু ছোট খুচরা রাবার ক্রেতা রয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ স্থানীয়ভাবে রাবার সংগ্রহ করে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করেন। তবে এসব ক্রেতার সবাই চোরাই রাবার কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত, এমন কোনো প্রমাণ তাঁরা দিতে পারেননি।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, চোরাই রাবারের সরবরাহ ব্যবস্থা শনাক্ত করতে শুধু চোর ধরলে হবে না। এর সঙ্গে জড়িত ক্রেতা, মজুতদার, পরিবহনকারী ও বড় পরিসরের বিক্রেতাদেরও শনাক্ত করা প্রয়োজন।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এনামুল হাসান বলেন, বিষয়টি তিনি গুরুত্ব সহকারে দেখবেন। বাইশারী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক মঞ্জুর আহসান বলেন, রাবার চুরির ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে ১৯৮০ সাল থেকে তিন দফায় বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় প্রায় ১৩ হাজার একর পাহাড়ি ভূমিকে রাবার চাষ প্রকল্পের আওতায় নেওয়া হয়। পরে বেসরকারি উদ্যোগেও রাবারবাগানের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ২০০০ সালের পর এ খাতের বিস্তার আরও দৃশ্যমান হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।












