রাতভর অভিযান, আটকে পড়া জাহাজটি উদ্ধার

কর্ণফুলী মোহনা

আজাদী প্রতিবেদন | বুধবার , ৫ আগস্ট, ২০২৬ at ৯:৪৬ পূর্বাহ্ণ

রাতভর পরিচালিত সংগটিত ও নিখুঁত উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে আটকে পড়া কন্টেনার জাহাজ সিএনসি ইউরেনাসকে উদ্ধার করা হয়েছে। কর্ণফুলী নদীর মোহনায় স্টিয়ারিং বিকল হয়ে গত সোমবার দুপুরে মাল্টার পতাকাবাহী কন্টেনার জাহাজটি আটকা পড়েছিল। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের সমন্বিত অভিযানে গতকাল মঙ্গলবার ভোরে জাহাজটিকে গ্রাউন্ডেড অবস্থা থেকে মুক্ত করে নিরাপদে ‘বি’ অ্যাঙ্করেজে নোঙর করানো হয়।

বহির্নোঙরে থেকে সোমবার দুপুরে বন্দরের এনসিটিতে আসার সময় স্টিয়ারিং বিকল হয়ে জাহাজটি প্রথমে লাল বয়ায় ধাক্কা দেয় এবং পরে রিটেইনিং ওয়ালে ধাক্কা দিয়ে চরায় আটকা পড়ে। চ্যানেলের প্রবেশমুখে কোনো বড় জাহাজ আটকে পড়লে আমদানিরপ্তানি কার্যক্রম, জাহাজ চলাচল এবং বন্দরের সামগ্রিক অপারেশনে বিঘ্ন সৃষ্টির আশঙ্কা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ভালোয় ভালোয় জাহাজটিউদ্ধার হয়েছে।

বন্দর সূত্র জানায়, সোমবার দুপুর আনুমানিক ২টা ১৫ মিনিটে চীনের শিকৌ বন্দর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা কন্টেনার জাহাজ এমভি সিএনসি ইউরেনাস কর্ণফুলী নদীর চ্যানেলে প্রবেশের সময় হঠাৎ স্টিয়ারিং বিকল হয়ে নিয়ন্ত্রণ হারায়। জাহাজটি প্রথমে ২ নম্বর লাল বয়ার সঙ্গে ধাক্কা খায়। পরে স্রোতের টানে নদীর মোহনার কাছে রিটেইনিং ওয়ালে উঠে গিয়ে গ্রাউন্ডেড হয়।

২০১৭ সালে নির্মিত ১৭০ মিটার দীর্ঘ ৯ দশমিক ৫০ মিটার ড্রাফটের মাল্টার পতাকাবাহী জাহাজটিতে ১ হাজার ২৮২ টিইইউএস কন্টেনার রয়েছে। জাহাজটিতে ক্যাপ্টেনসহ ২৪ জন নাবিক রয়েছেন। জাহাজটির স্থানীয় এজেন্ট এপিএল (বাংলাদেশ)

দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জরুরি উদ্ধার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করে। ঘটনাস্থলে ছুটে যান বন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সিনিয়র পাইলটরা। উদ্ধার কাজে নিয়োজিত করা হয় বন্দরের টাগবোট কান্ডারী, কান্ডারী, কান্ডারী৬ ও কান্ডারী১১। পাশাপাশি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর টাগবোট শিবসা, কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের টাগবোট এবং কোস্ট গার্ডের টাগবোট প্রমত্ত অভিযানে অংশ নেয়। নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের সদস্যরা পুরো সময় দায়িত্ব পালন করেন।

উদ্ধার অভিযান ছিল জটিল। কারণ জাহাজটি চ্যানেলের এমন একটি স্থানে আটকে পড়েছিল, যেখানে জোয়ারভাটার সময় নদীর স্রোত, পানির গভীরতা, জাহাজের ভারসাম্য এবং চ্যানেলের নিরাপত্তা সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনায় রাখতে হয়েছে। প্রথম দিকে জাহাজের ওজন কমানোর জন্য কিছু কন্টেনার সাময়িকভাবে খালাস করার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। তবে পরিস্থিতি মূল্যায়নের পর টাগবোটগুলোর সম্মিলিত টানের মাধ্যমে জাহাজটি সরানোর কৌশল গ্রহণ করা হয়।

ঝুঁকি সত্ত্বেও উদ্ধারকারী দল দক্ষতা ও যৌথ সমন্বয়ের মাধ্যমে সোমবার বিকাল থেকে শুরু হওয়া অভিযান রাতভর চলে। জোয়ারের অনুকূল সময়কে কাজে লাগিয়ে একাধিক টাগবোট একযোগে জাহাজটিকে টেনে সরানোর চেষ্টা চালায়। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর গতকাল ভোরে জাহাজটি গ্রাউন্ডেড অবস্থা থেকে মুক্ত হয়। পরে সেটিকে নিরাপদে ব্রাভো অ্যাঙ্করেজে নিয়ে নোঙর করানো হয়। পুরো উদ্ধার অভিযান চলাকালীন বন্দর চ্যানেলটি নিরাপদ ও নৌ চলাচলের উপযোগী ছিল। এ ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

এই অর্জন আন্তর্জাতিক মানের সিম্যানশিপ, নেতৃত্ব, পেশাদারিত্ব, নিবিড় সমন্বয় এবং দায়িত্ববোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম বলেন, এমন সফল উদ্ধার অভিযান পরিচালনা জাতীয় বাণিজ্যকে রক্ষা করেছে এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সম্মান অক্ষুণ্ন রেখেছে। এই কঠিন অভিযানে অবদান রাখা প্রতিটি সদস্যকে নিয়ে দেশবাসী গর্বিত।

বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পুরো উদ্ধার অভিযান চলাকালে চ্যানেলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। একই সঙ্গে বড় ধরনের পরিবেশগত ক্ষতি বা পণ্যহানিরও তথ্য পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানিরপ্তানি পণ্য পরিবহন পরিচালনা করে। ফলে প্রবেশ চ্যানেলে যেকোনো দুর্ঘটনা দেশের সরবরাহ ব্যবস্থা ও বৈদেশিক বাণিজ্যে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সিএনসি ইউরেনাস দুর্ঘটনার পর দ্রুততম সময়ে সফল উদ্ধার অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখা সম্ভব হয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ‘বিএনপির ১৭ বছরের আন্দোলনই জুলাইয়ের ভিত্তি তৈরি করেছিল’
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামে দিনে ১৫০, সন্ধ্যায় ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং