বাঙালি জাতির ইতিহাস মূলত রক্তক্ষয়ী আন্দোলন, ত্যাগ ও বিজয়ের ইতিহাস; যেখানে প্রতিটি স্বাধিকার আন্দোলনই ছিল স্বাধীনতা অর্জনের একেকটি শক্তিশালী সোপান। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ের ২০২৪ এর গণ–অভ্যুত্থানসহ প্রতিটি আন্দোলন স্বৈরাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে জনগণের সুস্পষ্ট রায় ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, প্রতিবারই বিজয়ের পর রাজনৈতিক দলগুলোর অদূরদর্শিতা ও ক্ষমতার লোভের কারণে সেই ত্যাগের পূর্ণাঙ্গ সুফল রক্ষা করা যায়নি। যার ফলে সবচেয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় সাধারণ মানুষকে।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানসহ বাংলাদেশের ইতিহাসের মূল আন্দোলন–সংগ্রামের স্বাধিকার, স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন রাজনৈতিক বিশ্লেষণ যুক্ত করার চেষ্টা করেছি।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন: বাঙালি জাতিসত্তা ও স্বাধিকার আন্দোলনের প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় সালাম, বরকত, রফিকের রক্তদান পাকিস্তানের সামপ্রদায়িক ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। এটি রাজনৈতিক আন্দোলনকে সাংস্কৃতিক শক্তি জোগায়, যার চূড়ান্ত রূপ ছিল ১৯৭১।
১৯৬৯ সালের গণ–অভ্যুত্থান: আইয়ুব খানের সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ছাত্র–জনতার ঐতিহাসিক আন্দোলন। এই অভ্যুত্থানের ফলে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার এবং শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি ঘটে, যা ৭০–এর নির্বাচন ও ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতার পথ সুগম করে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ: দীর্ঘ ২৩ বছরের শোষণের অবসান ঘটিয়ে ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে ৩০ লাখ শহীদ ও ২ লাখ মা–বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীন–সার্বভৌম বাংলাদেশ। এটি ছিল বাঙালি জাতির ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ও চূড়ান্ত অর্জন।
২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান: কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র–জনতার এক অভূতপূর্ব গণ–জাগরণ। তীব্র দমন–পীড়ন উপেক্ষা করে ছাত্র–জনতার রাজপথ দখলের মুখে ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন।
কেন প্রতিটি মহান অর্জনের পর লক্ষ্য বিচ্যুত হয়েছে?
‘স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন’ এই সূত্রটি আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণে বারবার নির্মম সত্য হিসেবে সামনে এসেছে:
১. জাতীয় ঐক্যের অভাব ও বিভাজনের রাজনীতি : ৫২, ৭১ কিংবা ২৪ প্রতিটি আন্দোলনের মূল শক্তি ছিল সর্বস্তরের জনগণের ইস্পাতকঠিন ঐক্য। কিন্তু বিজয় অর্জিত হওয়ার পরপরই রাজনৈতিক দলগুলো সেই ঐক্য ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে তারা জাতিকে ‘পক্ষ–বিপক্ষ’ বা ‘আমরা–ওরা’ লাইনে বিভক্ত করে ফেলে। এই বিভাজনই স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সুফলকে নসাৎ করে দেয়।
২. মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ‘সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার’ থেকে বিচ্যুতি : ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলা। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তারা রাষ্ট্রকে একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে রূপান্তরের চেয়ে মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তৈরিতে মন দিয়েছে। ফলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা এলেও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি মেলেনি।
৩. ক্ষমতা কুক্ষিগত করার মনস্তত্ত্ব ও স্বৈরাচারী রূপান্তর : একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতনের পর যে দলগুলো ক্ষমতায় আসে, তারা রাষ্ট্রের পুলিশ, প্রশাসন এবং বিচার বিভাগকে সংস্কার করে স্বাধীন করার পরিবর্তে নিজেদের দলীয় লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। ফলে প্রতিবারই এক স্বৈরাচারের পতনের পর অন্য এক ছদ্মবেশী স্বৈরাচারের জন্ম হয়েছে। কেবল ‘শাসকের মুখ’ বদলেছে, ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি।
৪. গণ–আকাঙ্ক্ষাকে অগ্রাহ্য করে ক্ষমতার ভাগাভাগি : আন্দোলনে জীবন দেয় সাধারণ ছাত্র, শ্রমিক ও আমজনতা। অথচ আন্দোলন সফল হওয়ার পর ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে যান রাজনীতিকরা। তারা জনগণের মৌলিক দাবি (যেমন: ভোটাধিকার, সুশাসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ) ভুলে গিয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, যা বারবার গণ–হতাশার জন্ম দিয়েছে।
ইতিহাস প্রমাণ করে, বাঙালি জাতি অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়তে জানে এবং বুকের তাজা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা ও স্বাধিকার ছিনিয়ে আনতে পারে। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই রক্তস্নাত অর্জনের মর্যাদা ধরে রাখতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। তারা আন্দোলনকে কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছে।
বিগত ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ আজ এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। অতীত ভুলের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হলে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সংকীর্ণ দলীয় ও ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, মিডিয়া সেলের প্রধান সমন্বয়কারী, জাতীয় নাগরিক পার্টি–এনসিপি, চট্টগ্রাম মহানগর।












