রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে (৪৫) রাউজানে দিনেদুপুরে সড়কে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। সিসিটিভি ফুটেজ ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, একটি সিএনজি টেক্সিতে এসে ৬ জনের একটি দল অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে এই কিলিং মিশন সম্পন্ন করে এবং টেক্সিযোগে পালিয়ে যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘটনা দেখে বোঝা যাচ্ছে হত্যাকারীদের নিখুঁত পরিকল্পনা ছিল।
গতকাল শনিবার দুপুর দেড়টার দিকে রাউজান উপজেলার চুয়েট সংলগ্ন পাহাড়তলী বাজারের ব্যস্ত সড়কে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহত মাসুদের বাড়ি পাশের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বেতাগী ইউনিয়নে। তিনি ওই এলাকার মৃত খালেদ চৌধুরীর সন্তান এবং রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বেতাগী ইউনিয়ন থেকে তার চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা ছিল। তার বড় ভাই পেয়ারুল হক চৌধুরী স্বপন ছিলেন ওই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এবং তার বড় ভাই নিজামুল হক চৌধুরী তপন ছিলেন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক।

ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাল হওয়া ফুটেজে দেখা যায়, রাস্তার স্বাভাবিক চলাচলের মাঝে একটি সিএনজি টেক্সি এসে রাস্তার পাশে থামে। টেক্সি থেকে ৪ জন যুবক নেমে আসে। এদের মধ্যে দুজনের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়, যা দিয়ে তারা লক্ষ্যবস্তুর দিকে পজিশন নেয়। বাকি ২ জনের মধ্যে একজন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পেছনে পাহারায় থাকে এবং অন্যজন আক্রমণের উদ্দেশ্যে সামনে এগিয়ে যায়। বাজারে আগে থেকে ওত পেতে থাকা আরো ২ সহযোগীসহ মোট ৬ জন মিলে মাসুদকে খুন করে।
ফুটেজে দেখা যায়, দুপুরে মাকসুদুল হক পাহাড়তলী বাজারে একটি ওষুধের দোকানের সামনে অবস্থান করছিলেন। এ সময় একাধিক পিস্তল ও লং গান হাতে দুর্বৃত্তরা মাসুদের কাছে গিয়ে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে পরপর গুলি ছুড়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। ব্যস্ত রাস্তায় আগ্নেয়াস্ত্রের এমন মহড়া এবং অতর্কিত হামলায় মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রাণভয়ে সাধারণ পথচারী ও আশপাশের মানুষ দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করেন। পুরো ঘটনাটি ঘটাতে হামলাকারীরা মাত্র কয়েক মিনিট সময় নেয়। সিসিটিভি ফুটেজের শেষাংশে দেখা যায়, হামলা মিশন শেষ করে সশস্ত্র যুবকেরা নির্বিঘ্নে অস্ত্র উঁচিয়ে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে অপেক্ষমাণ টেক্সিতে করে পালিয়ে যায়।
হত্যাকাণ্ডের পরপর হত্যাকারীদের অস্ত্র হাতে ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর রাঙ্গুনিয়া ও রাউজানে ছড়িয়ে পড়লে দুই উপজেলার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঘটনাস্থলে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। মাথার মগজ বেরিয়ে গেছে। মাসুদের এমন খুনের ঘটনায় দুপুর দেড়টার দিকে বিক্ষুব্ধ জনতা লাঠিসোঁটা নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। ঘটনাস্থল পাহাড়তলী চৌমুহনী ছাড়াও রাঙ্গুনিয়ার শান্তিরহাট, গোচরা, ইছাখালী, রোয়াজারহাট এবং থানা পোস্ট অফিস মোড়সহ কাপ্তাই সড়কের একাধিক স্পটে টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করা হয়। সড়কে বসে, মিছিল করে এই হত্যার জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকেন। ফলে কাপ্তাই সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে হয়। আন্দোলনকারীরা জরুরি অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া আর কোনো গাড়ি চলতে দেননি।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিকাল ৩টার দিকে ঘটনাস্থলে আসেন চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মাসুদ আলম। তিনি বিক্ষুব্ধ জনতার সাথে কথা বলেন এবং সিসিটিভি ফুটেজ দেখে খুনিদের দ্রুততম সময়ে গ্রেপ্তারের আশ্বাস দেন। তার চেষ্টায় বিকাল সোয়া ৪টার দিকে আন্দোলনকারীরা রাস্তা ছেড়ে দিলে প্রায় ৩ ঘণ্টা পর কাপ্তাই সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
এ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, আমরা ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছি। কারা, কী উদ্দেশ্যে এই ঘটনা ঘটিয়েছে তার তদন্ত শুরু হয়েছে। আশা করি স্বল্প সময়ের মধ্যে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।
স্থানীয়রা জানান, নিহত মাসুদ এলাকায় বালুর ব্যবসাসহ বিভিন্ন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণেই তাকে টার্গেট করে খুন করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি এড়াতে রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ার সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।
রাত ৯টার দিকে রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর জড়িত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ, ডিবি ও র্যাবসহ আইনশৃক্সখলা বাহিনীর একাধিক টিম যৌথভাবে মাঠে নেমেছে। ইতিমধ্যে সিসিটিভি ফুটেজ ও বিভিন্ন তথ্য বিবেচনা করে ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের কিছু ছবি পাওয়া গেছে।
তিনি জানান, নিহতের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে এবং পরিবারের দায়ের করা মামলার ওপর ভিত্তি করে বাকি আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। কী কারণে এবং কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী। তার একান্ত সচিব মহিবুল কবির তমাল জানান, এমপি আইনশৃক্সখলা বাহিনীর সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে সার্বিক বিষয়ে তদারকি করছেন।










