এদেশে নানান কারণে একজন নারীকে তার প্রিয় কাজ থেকে বিরতি নিতে হয়; নিজের পেশা, নিজের অবস্থান থেকে পদত্যাগ করতে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, একবার নিজের কাজ বা পেশা থেকে সাময়িক বিরতি গ্রহণের পর অধিকাংশ নারীরই আর নিজ পেশায় ফিরে আসা হয় না। যে নারীরা এ ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হোন, তাদের বেশিরভাগই বিবাহ এবং সন্তান জন্মদান ও লালন–পালন সংক্রান্ত কারণে একরকম বাধ্য হয়েই নিজ পেশা ত্যাগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন।
আবার কেউ কেউ আছেন যারা স্বেচ্ছায় কর্মবিরতি বা নিজ পেশা থেকে অব্যহতি বরণ করে নেন। যারা পরিস্থিতির চাপে পেশাজীবী জীবন থেকে গৃহকর্ত্রীর জীবন বেছে নিতে বাধ্য হোন; তাদের সাথে যারা স্বেচ্ছায় ঘরনী হয়ে উঠতে চান তাদের মানসিকতায় এক ব্যাপক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়!
পরিস্থিতির চাপে গৃহকর্ত্রীর জীবন গ্রহণ করে নিতে বাধ্য হওয়া নারীদের অধিকাংশকেই দেখা যায় মানসিকভাবে হতাশায় ভুগছেন, কারো কারো মধ্যে আবার প্রচণ্ড অবদমন লক্ষ্য করা যায়। তাদের সেই অবদমন কখনও–কখনও নিজের অজান্তেই তাদের আচার–ব্যবহারে ‘আক্রমণ’ হয়ে প্রকাশ পেয়ে থাকে যখন তারা একই কারণে নিজ পেশা ত্যাগ করতে হয় নি এরকম কোনো নারীর মুখোমুখি হয়ে থাকেন।
তবে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়া বেশিরভাগ নারীর আচরণগত আক্রমণের শিকার হয় মূলত তার নিজ সন্তানেরা এবং ক্ষেত্রবিশেষে নারীর পরিবার! প্রতি মুহূর্তে তার মনে হতে থাকে, এই সন্তানের জন্যেই তাকে চাকরি ছাড়তে হয়েছে, গৃহিণী জীবন বেছে নিতে হয়েছে, আর সেই মনে হওয়া থেকে উক্ত নারীর সন্তানেরা তাদের মা কর্তৃক মৃদু বা চরম মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে দেখা যায়, হতাশাগ্রস্ত মা নিজেই নিজের এহেন আচরণ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন!
এদিকে, যে নারীরা সংসার ও সন্তানকে যথেষ্ট সময় প্রদানের ইচ্ছায় স্বেচ্ছায় নিজ পেশা ত্যাগ করেন, তারা হয়ত তুলনামূলকভাবে মানসিক প্রশান্তিতে থাকেন। আর এইখানেই পরিস্থিতি ‘মেনে নেওয়া আর মনে নেওয়া’ এ দু‘ধরনের নারীর মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
আবার গুটিকয়েক নারী আছেন যারা ‘বিবাহ’কে মূলত পেশা ও সামাজিক পদমর্যাদা হিসেবে গণ্য করেন এবং সে ধরনের জীবন বেছে নেন। সমাজ সম্ভবত সে ধরনের নারীর আচরণ দ্বারাই সবচাইতে বেশি আক্রমণের শিকার হয়। বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান, দপ্তর, কার্যালয়, আদালত, হাট–বাজার যেখানে যেই কাজেই সেই নারীরা যান না কেনো; খুব সামান্য বিষয়েও দেখা যায় তারা তাদের স্বামীর অসামান্য পদমর্যাদার বলে সকলকে মুহূর্তেই ভস্ম করে দিতে চাইছেন !
সে যাই হোক, এই যে পরিস্থিতির চাপে বাধ্য হয়ে হুট করে নিজ পেশা থেকে অসময়ে অবসর নেওয়া নারীরা অবদমনে ভুগছেন, এবং তাদের হতাশাগ্রস্ত মানসিকতার কারণে সন্তান, পরিবার ও ক্ষেত্রবিশেষে তার পরিবেশ–প্রতিবেশকেও ভোগাচ্ছেন, এই দায় মূলত কার? অবশ্যই সমাজের !
সমাজ নারীবান্ধব কার্যপরিবেশ ও পর্যাপ্ত সুযোগ–সুবিধা নিশ্চিত করতে পারছে না। আবার যখন কোনো উচ্চশিক্ষিত নারী চারদেয়ালের জীবনটাকে বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন, তখন সেই সমাজই সেই নারীর দিকে আঙ্গুল তুলে ধরছে!
যুগের পর যুগ, এ কেবলই এক সমাধানহীন আলোচনা! তারপরও যে নারীরা সংসার–সন্তান সামলে শত বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে নিজ পেশা আঁকড়ে ধরে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ শাখাগুলোতে শ্রমদানের মাধ্যমে সমাজকে সমৃদ্ধ করে যাচ্ছেন, তারা নিঃসন্দেহে প্রশংসা এবং উচ্চতর সম্মানের দাবীদার।
এই সমাজ তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ না হলেও কৃতঘ্ন না হোক, নিদেনপক্ষে সমাজ নারীর চলার পথটাকে কণ্টকাকীর্ণ করে গড়ে না তুলুক। আর যারা পরিস্থিতির কারণে নানান সময়ে নিজ পেশা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছেন, তাদেরও সমাজ স্বস্তি দিক। এক্ষেত্রে নারীদেরও নারীদের প্রতি কিছুটা সহনশীল হওয়াটা দারুণ জরুরি। স্বামীর পদমর্যাদায় অহংবাদী হয়ে অন্যকে ভস্মীভূত করার অবনমন চিত্তপ্রসাদ নারীর মানসকে তুষ্ট করার যে প্রবণতা, এহেন বমনেচ্ছা থেকে সেই সকল নারীর মানসতার মুক্তি মিলুক।
সমাজে সকল নারী সমস্ত আলোচনা–সমালোচনা–বাধা–বিপত্তির ঊর্ধে গিয়ে তার অভিলাষ অনুরূপতায় জীবন সরণি নির্বাচন করে ভালো থাকুক।












